ad
ad

Breaking News

Narayana Debnath

তুলির জাদুতে রঙিন বানাতেন বাঙালির বিষন্ন বিকেল, কে এই শৈশব শিল্পী?

পিতা হেমচন্দ্র দেবনাথ চেয়েছিলেন ছেলে পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত হোক, কিন্তু ছোট্ট নারায়ণের মন পড়ে থাকত গয়নার নকশা আর অলঙ্করণে। সেই নকশা আঁকার ঝোঁক থেকেই বাংলা সাহিত্য পেল তার সর্বকালের শ্রেষ্ঠ রেখাশিল্পীকে।

Narayana Debnath at 100: Legacy, Comics, Dystopia

চিত্র: সংগৃহীত

ড. নীলাঞ্জন হালদার (নাট্যকর্মী ও গবেষক): আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে, ১৯২৫ সালে হাওড়ার শিবপুরে এক স্বর্ণকার পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন এমন এক জাদুকর, যিনি কোনও জাদুদণ্ড ছাড়াই, কেবল তুলি আর কালির আঁচড়ে কয়েক প্রজন্মের বাঙালির বিষন্ন বিকেলগুলোকে রঙিন করে তুলেছিলেন। তিনি নারায়ণ দেবনাথ। পিতা হেমচন্দ্র দেবনাথ চেয়েছিলেন ছেলে পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত হোক, কিন্তু ছোট্ট নারায়ণের মন পড়ে থাকত গয়নার নকশা আর অলঙ্করণে। সেই নকশা আঁকার ঝোঁক থেকেই বাংলা সাহিত্য পেল তার সর্বকালের শ্রেষ্ঠ রেখাশিল্পীকে (Narayana Debnath)।

বাস্তব এবং কল্পনার মধ্যবর্তী এক ধূসর অলিন্দে, যেখানে জীবনের কঠোর সত্য আর সম্ভাবনাময় ফ্যান্টাসি ‘মুখোমুখি বসিবার’ ফুরসতটুকু পায়, ঠিক সেখানেই নারায়ণ দেবনাথ নির্মাণ করেছিলেন এক অনন্য ব্রহ্মাণ্ড। গত ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে লক্ষ লক্ষ বাঙালি শিশু সেই ব্রহ্মাণ্ডে বিচরণ করেছে। তাঁর সৃষ্টি কেবল পলায়নবাদী বিনোদন ছিল না; বরং ছিল এমন এক চশমা, যা দিয়ে কঠিন পৃথিবীকে দেখা যায়, বোঝা যায় এবং হয়তো কিছুটা সুন্দর করে তোলার স্বপ্নও দেখা যায়। আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর যুগে দাঁড়িয়ে, যখন প্রযুক্তি আমাদের কল্পনাশক্তিকে গ্রাস করতে উদ্যত, তখন নারায়ণ দেবনাথের প্রাসঙ্গিকতা বিচার করতে গেলে আমাদের ডুব দিতে হবে তাঁর সৃষ্টির সেই ডিস্টোপিয়া, কমিক ও ফ্যান্টাসির মায়াবী রসায়নে।

নারায়ণ দেবনাথের চরিত্ররা যে ভারত ও বাংলায় জন্ম নিয়েছিল, সেই স্বদেশ ছিল স্ববিরোধিতায় পূর্ণ। ষাটের দশকের ভারত একদিকে গণতান্ত্রিক আদর্শে উজ্জীবিত, অন্যদিকে চরম দারিদ্র্য ও অশিক্ষায় জর্জরিত। বাংলা তখন সবে দেশভাগের ক্ষত, মন্বন্তরের স্মৃতি এবং দ্রুত নগরায়ণের চাপে পিষ্ট। এই জটিল বাস্তবতার মধ্যেই নারায়ণ দেবনাথ এমন সব চরিত্রকে নিয়ে এলেন যারা না পুরোপুরি ফ্যান্টাসি, না পুরোপুরি সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। ১৯৬২ সালে যখন ভারত তার উত্তর-ঔপনিবেশিক অস্তিত্ব খুঁজছে, তখন জন্ম হল ‘হাঁদা-ভোঁদা’র (Narayana Debnath)।

শিবপুরের গলি থেকে উঠে আসা এই দুই কিশোর— একজন চতুর ও দুষ্টু, অন্যজন সরল ও সর্বদা ভুক্তভোগী— কোনও আদর্শায়িত গোপালের মতো সুবোধ বালক ছিল না। তাদের জগতে কোনও জাদু ছিল না, ছিল না কোনও অলৌকিক শক্তি যা তাদের কাজের পরিণাম থেকে বাঁচাবে। হাঁদা যখনই কোনও ফন্দি আঁটত, তার ফল তাকে ভুগতে হতো। এই সাধারণ দুষ্টুমি ও তার পরিণতির মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক গভীর আশাবাদ; শৈশব তার সমস্ত বিশৃঙ্খলা, নিষ্ঠুরতা, হাসি এবং কান্না নিয়েই উদযাপনের যোগ্য। যে সমাজে শিশুদের প্রায়শই ‘বড়দের অনুগত’ বা ‘ভবিষ্যৎ নাগরিক’ হিসেবে দেখা হতো, সেখানে নারায়ণ বাবুর কমিক্স সোচ্চারে দাবি করল— শিশুর নিজস্ব জগৎ, তার ছোট ছোট লড়াই এবং টিকে থাকার আনন্দও সাহিত্যের বিষয় হতে পারে। একে আমরা বলতে পারি না কী ‘আদর্শবাদী বাস্তবতা’— যা আমাদের চেনা জগৎ, কিন্তু সেখানে শৈশবকে রক্ষা করা ও বিকশিত হতে দেওয়ার এক প্রচ্ছন্ন আকুতি রয়েছে।

নারায়ণ দেবনাথের সৃষ্টিতে ‘ডিস্টোপিয়া’ বা কঠিন বাস্তবতার ছাপ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন আমরা তাঁর চরিত্রদের সামাজিক প্রেক্ষাপট বিচার করি। ১৯৬৯ সালে শুরু হওয়া ‘নন্টে-ফন্টে’ সিরিজের দিকে তাকালে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় এটি নিছকই দুটি ছেলের হস্টেল জীবনের গল্প। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, এই হস্টেল আসলে আমাদের সমাজ বা রাষ্ট্রব্যবস্থারই এক অণুবিশ্ব। এখানে বয়োজ্যেষ্ঠ কেল্টুদা ক্ষমতার অপব্যবহার করে, মিথ্যে বলে সুবিধা আদায় করে। আর সুপারিনটেনডেন্ট স্যার বা হাতি স্যার হলেন সেই প্রশাসন, যিনি তোষামোদপ্রিয়, ভোজনরসিক এবং অবিবেচক (Narayana Debnath)।

এই কর্তৃত্বপরায়ণ কাঠামোর বিরুদ্ধে নন্টে ও ফন্টের লড়াই— তাদের ফন্দিফিকির এবং কেল্টুদাকে জব্দ করার কৌশল— আসলে এক ধরনের ‘দৈনন্দিন নৈরাজ্যবাদ’ বা ‘কমিক ডিস্টোপিয়া’। এখানে শোষিত (ছাত্ররা) শোষকের (কর্তৃপক্ষ) বিরুদ্ধে তাদের একমাত্র অস্ত্র ‘রসবোধ’ ব্যবহার করে একধরণের গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যায়। আজকের কর্পোরেট বা রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে তাকালে আমরা অহরহ কেল্টুদাদের দেখতে পাই, আর তাই নন্টে-ফন্টের এই প্রতিরোধ আজও আমাদের এত গভীরভাবে নাড়া দেয়। এই প্রতিরোধ কেবল মজার নয়, এটি অন্যায্য ও অযৌক্তিক কাঠামোর বিরুদ্ধে শিশুদের সহজাত বিদ্রোহের প্রতীক।

প্রযুক্তির অন্ধ আরাধনার যুগে নারায়ণ দেবনাথের ‘ডানপিটে খাঁদু আর তার কেমিক্যাল দাদু’ চরিত্রটি এক বিস্ময়কর দূরদর্শিতার পরিচয় দেয়। এমন এক জগৎ যেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি— যা প্রগতি ও উন্নয়নের চাবিকাঠি হওয়ার কথা— তা কেবল অদ্ভুত ও হাস্যকর বিপত্তি ডেকে আনে। কেমিক্যাল দাদুর প্রতিটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, যা কোনও না কোনও সামাজিক সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে করা হতো, তা শেষমেশ ব্যুমেরাং হয়ে ফিরে আসত। সিলিকন ভ্যালি বা আধুনিক টেক জায়ান্টরা আজ যে ‘টেকনোলজিক্যাল সলিউশনিজম’ বা প্রযুক্তির মাধ্যমে সব সমস্যা সমাধানের মতাদর্শ প্রচার করে, দেবনাথ বহু আগেই হাস্যরসের মোড়কে তার সীমাবদ্ধতা দেখিয়ে গেছেন। তাঁর এই কমিক ছিল আধুনিকতার প্রতি এক ধরনের স্নিগ্ধ সৃজনশীল বিদ্রূপ, যা শিশুদের শিখিয়েছিল প্রগতির বড় বড় বুলি বা গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের প্রতিও মাঝে মাঝে সন্দেহপোষণ করতে হয় (Narayana Debnath)।

তবে ডিস্টোপিয়া, ফ্যান্টাসি এবং বাস্তবতার সবথেকে জটিল ও আকর্ষণীয় সংশ্লেষণ ঘটে ‘বাঁটুল দি গ্রেট’-এর মাধ্যমে। ১৯৬৫ সালে বডি-বিল্ডার মনোহর আইচের অনুপ্রেরণায় সৃষ্ট বাঁটুল শুরুতে ছিল এক সাধারণ শক্তিশালী মানুষ, যার পেশিশক্তি ছিল, কিন্তু কোনও অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা ছিল না। এটি ছিল সম্ভবপর ফ্যান্টাসি— শিশুরা বিশ্বাস করত শরীরচর্চা করলে তারাও বাঁটুল হতে পারবে। কিন্তু ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাঁটুল রূপান্তরিত হল এক অজেয় সুপারহিরোতে। কামানের গোলা বুক দিয়ে ঠেকানো বা প্যাটন ট্যাঙ্ক চিবিয়ে খাওয়ার দৃশ্যগুলো কেবল জাতীয়তাবাদী প্রচার ছিল না, এর মধ্যে ছিল এক গভীর ও দ্বান্দ্বিক বার্তা।

একদিকে এটি ছিল বাঙালির এক চরম সঙ্কটময় মুহূর্তে ক্ষমতায়নের ফ্যান্টাসি— যখন বাস্তবে বাঙালি শরীর ছিল বিপন্ন ও আক্রান্ত, তখন কল্পনায় এক অপরাজেয় বাঙালি সত্তার উত্থান প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অন্যদিকে, এই সুপারহিরোর প্রয়োজনীয়তা এক ডিস্টোপিয়ান সত্যকেও উন্মোচিত করে। যখন সাধারণ মানুষ বা রাষ্ট্রযন্ত্র দুর্বলদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখনই প্রয়োজন পড়ে অলৌকিক উদ্ধারকর্তার। বাঁটুলের এই রূপান্তর একইসঙ্গে আশার (আমরা জিতব) এবং হতাশার (অলৌকিক কিছু ছাড়া উপায় নেই) দোলাচল। কিন্তু দেবনাথ কখনোই এই জগতকে পুরোপুরি ফ্যান্টাসি বা পুরোপুরি হতাশার হতে দেননি। তিনি অবস্থান করেছিলেন এক ‘সঙ্কটময় আদর্শবাদ’-এর স্তরে— যেখানে তিনি দেখিয়েছেন পৃথিবীটা কেমন, এবং কেমন হওয়া উচিত, তার মধ্যেকার ব্যবধানটুকু মানুষের প্রচেষ্টা, সাহস এবং সংহতি দিয়ে মেটানো সম্ভব (Narayana Debnath)।

নারায়ণ দেবনাথ শিশুদের জন্য যে শৈশব নির্মাণ করেছিলেন, তা কোনও অবাস্তব স্বর্গের স্বপ্ন ছিল না। তাঁর পাঠকরা কমিক্সের পাতায় ঘুসখোর পুলিশ, অলস শিক্ষক, পাড়ার মাস্তান এবং সুবিধাবাদী নেতাদের চিনতে শিখেছিল। কিন্তু তারা এও শিখেছিল যে, এদের বুদ্ধি দিয়ে পরাস্ত করা যায়, প্রতিরোধ করা যায় এবং কখনও কখনও শুধরানোও যায়। তাঁর নায়করা অলিম্পাস পাহাড় থেকে নেমে আসা দেবতা ছিল না; তারা ছিল আমাদেরই মতো রক্ত-মাংসের মানুষ— যারা তাদের বুদ্ধি, শারীরিক শক্তি, বন্ধুত্ব এবং রসবোধ দিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করত। সবচেয়ে বড় কথা, নারায়ণ দেবনাথের চরিত্ররা এক ‘নৈতিক মহাবিশ্বে’ বাস করত। হাঁদার দুষ্টুমি ছিল নিছকই কৌতুক, আক্রোশ নয়। নন্টে-ফন্টের ফন্দি ছিল মুক্তির আনন্দ, প্রতিশোধ নয়। এমনকী মহাশক্তিধর বাঁটুলও তার শক্তি কেবল আত্মরক্ষা বা অন্যায়ের দমনে ব্যবহার করত, আক্রমণের জন্য নয়। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই নৈতিক কাঠামো শিশুদের মনের গভীরে এক আদর্শবোধ বুনে দিয়েছে, যা কোনও নীতিশিক্ষার ক্লাসে শেখানো সম্ভব নয়।

অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে বিচার করলে দেখা যায়, নারায়ণ দেবনাথের চরিত্ররা কখনওই বিত্তবান ছিল না। তারা ছিল মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত, যেখানে সম্পদের সীমাবদ্ধতা ছিল নিত্যসঙ্গী। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা কখনোই তাদের অভিযান বা আনন্দকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। দারিদ্র্যকে তিনি মহিমান্বিতও করেননি আবার লজ্জার কারণও বানাননি; বরং দেখিয়েছেন এটি জীবনেরই একটি অংশ যাকে অতিক্রম করা যায়। লিঙ্গ-রাজনীতির ক্ষেত্রেও, যদিও তাঁর জগৎ ছিল পুরুষপ্রধান, তবু ‘শুটকি-মুটকি’র মতো চরিত্রের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছিলেন যে দুষ্টুমি বা প্রতিরোধের অধিকার মেয়েদেরও আছে। তাঁর আঁকার শৈলী ছিল ‘হাইটেন্ড রিয়ালিজম’— যেখানে চরিত্রদের শারীরিক গঠন কিছুটা অতিরঞ্জিত হলেও, তাদের বিচরণের স্থান— উত্তর কলকাতার গলি, রোয়াক, বা স্কুলবাড়ি ছিল একেবারে চেনা। এই চেনা পরিবেশই ফ্যান্টাসিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল (Narayana Debnath)।

নারায়ণ দেবনাথের সাফল্য এখানেই যে, তিনি ডিস্টোপিয়া বা হতাশার জগতকে চিনিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানে শিশুদের বন্দি করেননি। তিনি কমিক বা হাস্যরসের মাধ্যমে সেই হতাশার মোকাবিলা করার পথ দেখিয়েছিলেন এবং ফ্যান্টাসির মাধ্যমে এক উন্নততর সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। দার্শনিক আর্নস্ট ব্লখ যাকে বলেছিলেন ‘মূর্ত ইউটোপিয়া’।

বাস্তব পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এক উন্নত ভবিষ্যতের সম্ভাবনা—দেবনাথের কাজ ছিল ঠিক তাই। তাঁর চরিত্ররা নিখুঁত পৃথিবীতে বাস করত না, কিন্তু তারা প্রমাণ করত যে বুদ্ধিমত্তা, সাহস এবং সংহতি থাকলে এই অসম্পূর্ণ পৃথিবীতেও মাথা উঁচু করে বাঁচা যায়। আজকের ভোগবাদী সংস্কৃতিতে, যেখানে শৈশবকে পণ্যায়ন করা হচ্ছে এবং শিশুদের ওপর অকল্পনীয় চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, সেখানে নারায়ণ দেবনাথের এই দর্শন অত্যন্ত জরুরি। তিনি শিখিয়েছিলেন শৈশব কেবল বড় হওয়ার প্রস্তুতি নয়, এটি নিজেই একটি সম্পূর্ণ এবং অর্থবহ অস্তিত্ব (Narayana Debnath)।

একজন শিল্পী হিসেবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও ছিল এই দর্শনেরই প্রতিফলন। আর্ট কলেজের ডিগ্রি শেষ করতে না পারা, স্বর্ণকারের দোকান থেকে উঠে এসে একক প্রচেষ্টায় বাংলা কমিক্সের সাম্রাজ্য গড়ে তোলা— এই সবই ছিল এক নীরব বিপ্লব। তিনি ছিলেন এক আদ্যপান্ত ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’। মুদ্রণ প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা বা আর্থিক অসচ্ছলতা তাঁকে দমাতে পারেনি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পদ্মশ্রী (২০২১) বা ডি’লিট (২০১৫) সম্মান হয়তো তাঁর প্রতিভার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, কিন্তু তাঁর আসল পুরস্কার হল সেই ‘কালেক্টিভ মেমোরি’ বা যৌথ স্মৃতি, যা তিনি উপহার দিয়েছেন। হাঁদা-ভোঁদার ৫৩ বছরের বিশ্বরেকর্ড কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি প্রমাণ করে যে সত্য ও খাঁটি শিল্পের আবেদন চিরন্তন।

নারায়ণ দেবনাথ আজ আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট জগৎ আজও অমলিন। তিনি শিখিয়েছেন, সুপারহিরো হতে গেলে ভিনগ্রহ থেকে আসার প্রয়োজন নেই, হাওড়া বা শিবপুরের গলিতেই সুপারহিরোরা ঘুরে বেড়ায়। তিনি আমাদের দিয়েছেন এক ‘ইনফর্মড আইডিয়ালিজম’ বা সচেতন আদর্শবাদ— যা পৃথিবীর ত্রুটিগুলো জেনেই তাকে ভালবাসতে শেখায়। যেখানে ডিস্টোপিয়া, কমিক এবং ফ্যান্টাসি বাস্তবে এসে মিলিত হয়েছে, সেখানেই নারায়ণ দেবনাথ শিশুদের জন্য এক শাশ্বত আশ্রয়স্থল গড়ে তুলেছেন। শতবর্ষে দাঁড়িয়ে এই কিংবদন্তি শিল্পীকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। তাঁর সৃষ্টি বেঁচে থাকুক বাঙালির মননে, বেঁচে থাকুক আমাদের আগামী প্রজন্মের সরল, সাহসী ও স্বপ্নমাখা হাসিতে (Narayana Debnath)।