ad
ad

Breaking News

Narendra Modi

কূটনীতিতে ফেল, লোকসভায় বিরোধীদের কাছে হার: ‘বিশ্বগুরু’র হলটা কী?

বাজপেয়ীর সময়ও, হ্যাঁ, অটল বিহারী বাজপেয়ী, যিনি বিজেপি-র থেকে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হতে পেরেছিলেন, তিনিও আমেরিকার চোখ রাঙানির সামনে মাথা নোয়াননি।

modi-politics-setbacks-global-challenges

চিত্র: সংগৃহীত

সুমন ভট্টাচার্য: ‘ডবল ইঞ্জিন’-এর রাজ্য ত্রিপুরায় এডিসি-র ভোটে প্রদ্যোৎ বিক্রম মাণিক্য দেববর্মার দল তিপ্রা মোথার কাছে শোচনীয় পরাজয়, লোকসভায় মহিলা বিল, ‘ডিলিমিটেশন’ বিল বিরোধীদের বাধায় আটকে যাওয়া, এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যখন পাকিস্তানের দাপাদাপি, তখন নরেন্দ্র মোদি কোথায়? ‘বিশ্বগুরু’কে কি একটু ফিকে দেখাচ্ছে? পশ্চিমবঙ্গের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদির ভাগ্যটা কি একটু খারাপ যাচ্ছে? বোধহয় তাই, তা না হলে একের পর এক হারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে যেভাবে উপেক্ষা করে চিরশত্রু পাকিস্তানের আসিফ মুনির আর প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে জড়িয়ে ধরছেন, তাতে অবশ্যই বিশ্বগুরুর একটু খারাপ লাগার কথা। জয়শঙ্কর পাকিস্তানকে ‘দালাল রাষ্ট্র’ বলেছিলেন। কিন্তু সেই ‘দালাল রাষ্ট্র’ যেভাবে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে হঠাৎ করেই সেন্টার স্টেজে চলে এসেছে, সেটা কি নরেন্দ্র মোদিকে একটু অসহায় করে দিল? যে নরেন্দ্র মোদি বলতেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধু, সেই ডোনাল্ড ট্রাম্প কি কোথাও নরেন্দ্র মোদির পিঠে খঞ্জর বসিয়ে আসিফ মুনিরকে কাছে ডেকে নিলেন? এই অপমান নরেন্দ্র মোদি রাখবেন কোথায়? তার উপরে লোকসভায় মহিলা বিল তথা ‘ডিলিমিটেশন’ বিল পাশ না করাতে পারা এবং পাশ না হওয়ার পর রাহুল গান্ধি ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজেদের মধ্যে কথোপকথন— সবই কি ২০২৯-এর আগে নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ-জয়শঙ্করদের রক্তচাপ বাড়িয়ে রাখল?

এটা অস্বীকার করে কোনও লাভ নেই যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পাকিস্তান যে গুরুত্ব পাচ্ছে, যেভাবে ইসলামাবাদে ইরান এবং আমেরিকার মধ্যে শান্তি বৈঠক হচ্ছে, কিংবা যেভাবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বা তাঁর সরকারের বিদেশমন্ত্রী সৌদি আরব বা কাতারে পৌঁছে যাচ্ছেন, তা পাকিস্তানের পক্ষে বড় প্রাপ্তি। এবং ভারতবর্ষ দু-টুকরো হয়ে ভারত ও পাকিস্তান তৈরি হওয়ার পর থেকে কোনওদিন নয়াদিল্লিকে পিছনে ফেলে ইসলামাবাদ এই গুরুত্ব অর্জন করতে পারেনি। নেহরু, ভারতের যে প্রধানমন্ত্রীকে সবসময় নরেন্দ্র মোদি নিশানা করেন, তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যে জায়গা অর্জন করেছিলেন, এখানে গোটা নির্জোট আন্দোলনের নেতা হিসাবে ধরা হতো। কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো থেকে প্যালেস্টাইনের নেতারা সকলে তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। পরবর্তীকালে ইন্দিরা গান্ধিও এসে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নয়াদিল্লিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। বিশেষ করে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রটির প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা এবং আমেরিকার চোখ-রাঙানির সামনে দাঁড়িয়ে যেভাবে তিনি বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমানকে নেতা হিসাবে তুলে ধরেছিলেন, তা ইতিহাসে লেখা আছে। সেই সময় ভিয়েতনাম যুদ্ধের ক্ষেত্রেও মার্কিন বিরোধী অবস্থান নিয়ে ভারত আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছিল।

বাজপেয়ীর সময়ও, হ্যাঁ, অটল বিহারী বাজপেয়ী, যিনি বিজেপি-র থেকে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হতে পেরেছিলেন, তিনিও আমেরিকার চোখ রাঙানির সামনে মাথা নোয়াননি। এমনকি পরমাণু পরীক্ষার পরে ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিলেও অটল বিহারী বাজপেয়ী তার সামনে নতিস্বীকার করেননি। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতে যে গুরুত্ব ছিল, দক্ষিণ এশিয়ার প্রধানতম শক্তি হিসাবে ভারত যেভাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল, ভারতের অর্থনৈতিক বাজার যতটা বড় ছিল, তা কূটনীতিতে গভীরভাবে প্রভাব ফেলত।

নরেন্দ্র মোদির সময় প্রথম বিজেপি বা কেন্দ্রের সরকার এত দিনের পুরোনো নীতিকে বিসর্জন দিয়ে দৃষ্টিকটুভাবে ইজরায়েল এবং আমেরিকার দিকে ঝুঁকে পড়ে। ইজরায়েল প্যালেস্টাইনে গণহত্যা চালালেও সেই দিকে কোনও নজরই দেয়নি নরেন্দ্র মোদির সরকার। বরং ভারতবর্ষের ‘ভক্তকুল’ নাচানাচি করেছে মুসলিমরা জব্দ হচ্ছে বলে। শেষ পর্যন্ত সোনিয়া গান্ধি চিঠি লিখে প্যালেস্টাইনের বিষয়ে ভারতের অবস্থান এবং ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার পর নরেন্দ্র মোদি-জয়শঙ্কররা একটু সংযত হন। ইরানের সঙ্গে আমেরিকা এবং ইজরায়েলের সংঘাত শুরু হওয়ার পরও নরেন্দ্র মোদি তার গুরুত্ব বুঝতে পারেননি। আমেরিকার বোমাবর্ষণে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খেমেইনির মৃত্যুর পরও পাঁচ দিন কেটে গিয়েছিল ভারতের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করবার জন্য। আসলে নরেন্দ্র মোদি ইজরায়েলে গিয়ে ‘ফাদারল্যান্ড’ বলে লাফালাফি করার পর এতটাই ইজরায়েল-আমেরিকা অক্ষের দিকে ঝুঁকে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন ছিল। পরবর্তীকালে যখন ইরানের সঙ্গে ইজরায়েল এবং আমেরিকার সংঘাত শুরু হল, তখন জয়শঙ্কররা ইরানের সঙ্গে আলোচনার রাস্তা খুললেন বটে, তাতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে ভারতের জন্য তেল এবং গ্যাস এল বটে, কিন্তু ভারত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজের গুরুত্ব জাহির করতে পারল না। যখন পাকিস্তান প্রথম সমঝোতার বা দু-পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেয়, তখন জয়শঙ্কর ব্যঙ্গ করে পাকিস্তানকে ‘দালাল রাষ্ট্র’ বলেছিলেন। পাকিস্তান, যারা সত্যি সত্যি অর্থনীতিতে ধুঁকতে থাকা একটা দেশ, সব দিক থেকে পিছিয়ে পড়া একটা দেশ, যাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ সন্ত্রাসবাদকে মদত দেওয়ার, তারা কিন্তু এই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মধ্যস্থতা করার সুযোগটি ছাড়েনি। অবাক করা বিষয়, যে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নরেন্দ্র মোদি নিজের ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ বলতেন, যে নরেন্দ্র মোদি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ে সবচেয়ে বেশি উল্লসিত হতেন, আমেরিকায় গিয়ে স্লোগান দিয়েছিলেন ‘আব কি বার, ট্রাম্প সরকার’, কিংবা শুভেন্দু অধিকারী পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ে পর উৎসাহিত হয়ে টুইট করেছিলেন- ‘এবার হিন্দুদের রক্ষাকর্তা এসে গিয়েছেন’, সেই ডোনাল্ড ট্রাম্পও নরেন্দ্র মোদিকে ছেড়ে পাকিস্তানের উপরই বেশি আস্থা রাখলেন। আমেরিকার এহেন বিশ্বাসঘাতকতা নিশ্চিতভাবে নরেন্দ্র মোদিকে যেমন হতাশ করেছে, তেমনই তাঁর বিশ্বগুরু হিসাবে নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টাকেও খানখান করে দিয়েছে।

আসলে হয়তো সময়টাই খারাপ যাচ্ছে নরেন্দ্র মোদির। সংসদে তিনি পাশ করাতে পারলেন না মহিলা সংরক্ষণ বিল, আসলে যা ‘ডিলিমিটেশন বিল’ ছিল, যে বিল পাশ হয়ে গেলে পরে তিনি সংসদের চেহারাটাই বদলে দিতে পারতেন। এবং যেটা বিরোধীদের অভিযোগ ৫৪৩ থেকে লোকসংখ্যা সদস্য সংখ্যাকে ৮০০-র উপরে নিয়ে গিয়ে এমন একটা ব্যবস্থা করতেন, যাতে উত্তর এবং মধ্য ভারতে আধিপত্যের জেরেই বিজেপি শিবির চিরকাল ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে। পূর্বের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ বা উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলি বা দক্ষিণের যেসব রাজ্যগুলি গেরুয়া শিবিরকে প্রতিরোধ করে, তাদের আর রাজনৈতিকভাবে কোনও গুরুত্ব থাকত না। কিন্তু বিজেপির সেই প্রচেষ্টাতেও জল ঢেলে দিয়ে রাহুল গান্ধি এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় হাতে হাত মিলিয়ে সংসদে মহিলা বিলকে হারিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ, সংবিধান অনুযায়ী বিল পাশ করানোর জন্য যে দুই তৃতীয়াংশের সমর্থন দরকার ছিল, তা বিজেপি জোগাড় করতে পারেনি। এই ব্যর্থতা নরেন্দ্র মোদির মুখ পুড়িয়েছে। বিজেপির ‘ভক্তকুল’ যতই একে নারী বিরোধিতা বলে প্রচার করতে চেষ্টা করুক, তা হালে পানি পাবে না। কারণ, মণিপুর থেকে গুজরাট বিজেপির বিরুদ্ধে নারীনিগ্রহের রেকর্ড এত পুরোনো এবং এতটাই মানুষের মনে দগদগে ঘা হিসাবে আছে, বিজেপি বিরোধীদের এই বিষয়ে ফাঁদে ফেলতে পারবে না। বরং নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহের যে অশ্বমেধের ঘোড়া কোথাও এত দিন মুখ থুবড়ে পড়ত না, তা যে এবার লোকসভাতেই হেরে গেল, সেটাই সকলের কাছে বড় হয়ে দেখা দেবে। অর্থাৎ, বিরোধীরা বিশ্বাস করতে শুরু করবে একজোট হলে বিজেপিকে হারানো যায়। বিজেপির যে সত্যি সত্যি ভাগ্য খারাপ যাচ্ছে, তার আর একটি উদাহরণ ত্রিপুরায় প্রদ্যোৎ বিক্রম মাণিক্য দেববর্মার দল তিপ্রা মোথার কাছে এডিসি-র ভোটে একেবারে ভরাডুবি। এটা ঠিক ওই ভোটটি শুধুমাত্র আদিবাসীদের মধ্যে হয়েছে। কিন্তু সেখানেও গেরুয়া শিবিরের এহেন পরাজয় সবাইকে বিস্মিত করেছে।

সময়টা বোধহয় নরেন্দ্র মোদির সত্যিই ভাল যাচ্ছে না। ‘ফাদারল্যান্ড’ থেকে ফিরে আসার পর একের পর এক ধাক্কা, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাঁকে টপকে পাকিস্তানের এতটা গুরুত্ব পাওয়া, নয়াদিল্লিকে তিনি ‘বিশ্বগুরু’র কোনও মর্যাদা দিতে পারলেন না, এইসবই প্রচারের আলোয় চলে আসাটা বোধহয় নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহের জন্য অশনি সংকেত। ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে হেরে গেলে বিরোধীরা কিন্তু ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি শুরু করে দেবেন।