চিত্র: সংগৃহীত
সত্যগোপাল দে (সাংবাদিক, শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ ও সাইকোলজিকাল কাউন্সেলর): এবারের খোলা চোখে বন্ধ চোখে একটু অন্যরকম। সেভেন সিস্টার্স-এর অন্যতম মণিপুর রাজ্য। ছবির মতো সুন্দর এই রাজ্য কিছুটা পাহাড়ে, কিছুটা সমতলে। পাহাড়ে বসবাস নাগা, কুকি সম্প্রদায়ের মানুষের আর সমতলের অধিকাংশই মেইতেই। দীর্ঘদিন ধরে মনিপুরে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আধিপত্য। যদিও সাধারণ মানুষ চান শান্তির সহাবস্থান। মণিপুরে রয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম জলাভূমি লোকটাক লেক, মহিলা পরিচালিত বিখ্যাত বাজার ইমা মার্কেট রাজধানী ইম্ফলের অন্যতম দ্রষ্টব্য। এই মণিপুরের মাটিতে আজাদ হিন্দ বাহিনীর বিজয় মার্চ সর্বজনবিদিত। মৈরাং-এর নেতাজি মিউজিয়াম সে সব কথা মনে করিয়ে দেয় (Manipur Child Rights)।
এমন একটি শান্তির রাজ্যে অশান্তির দাবানল প্রায়শই জ্বলে ওঠে এই সাম্প্রতিক সংযোজন জাতি দাঙ্গা। দীর্ঘকালীন রাষ্ট্রপতি শাসনের পর মণিপুরে গণতান্ত্রিক সরকার আবার ফিরে এসেছে। এইসব জাতিদাঙ্গা, বিচ্ছিন্নতাবাদের ঘেরাটোপে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিশু ও নারীরা। মণিপুরে দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ও জাতিগত উত্তেজনা রাজ্যের জনজীবনকে গভীরভাবে বিপর্যস্ত করেছে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও অসহায় অবস্থায় রয়েছে শিশুরা। বহু শিশু বাস্তুচ্যুত হয়েছে, তাদের পড়াশোনা বন্ধ হয়েছে এবং তারা হিংসা ও মানসিক ট্রমার সম্মুখীন হয়েছে। তাদের নিরাপত্তা, সুস্বাস্থ্য এবং শিক্ষা নিশ্চিত করা এখন এক গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে, মণিপুর শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশন শিশু আইন বাস্তবায়ন এবং শিশুদের অধিকার রক্ষায় এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কমিশনের ম্যান্ডেট, সাফল্য এবং সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রভাব মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপ নিয়ে কমিশনের চেয়ারম্যান শ্রী কেইসাম প্রদীপ কুমারের সঙ্গে কিছু কথা (Manipur Child Rights)।
প্রশ্ন: মণিপুর শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কমিশনের মূল দায়িত্ব বা ‘ম্যান্ডেট’ আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
উত্তর: আমাদের মূল লক্ষ্য হল রাজ্যের প্রতিটি শিশুর সাংবিধানিক, আইনি এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করা। এর মধ্যে রয়েছে শিশুদের প্রতি হিংসা, অবহেলা এবং হিংসা থেকে সুরক্ষা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সুযোগ পৌঁছে দেওয়া। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের ভূমিকা আরও বিস্তৃত হয়েছে। সামাজিক অস্থিরতা এবং বাস্তুচ্যুতির ফলে তৈরি হওয়া শূন্যতা পূরণ করা এবং প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন আমাদের প্রধান কাজ (Manipur Child Rights)।
প্রশ্ন: আপনার নেতৃত্বে কমিশনের উল্লেখযোগ্য সাফল্য বা মাইলফলক কোনগুলো?
উত্তর: একে মাইলফলক বলা যাবে কি না তা অন্যরা বিচার করবেন, আমি জানাতে পেরে আনন্দিত যে, কমিশন সম্প্রতি ‘মণিপুর রাজ্য শিশু নীতি ২০২৫’-এর খসড়া সম্পন্ন করেছে, যা এখন সরকারি বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষায়। এছাড়া, বাস্তুচ্যুত শিশুদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘অ্যাকশন প্ল্যান ২০২৬’ প্রস্তুত করা হয়েছে।
এই উদ্যোগগুলো একটি কাঠামোগত ভিত্তি তৈরি করবে। আমরা উপত্যকা এবং পাহাড়ি অঞ্চল— উভয় জায়গার বাস্তুচ্যুত শিশুদের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করেছি। তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে এবং ‘মিশন বাৎসল্য’ প্রকল্পের সুবিধা যাতে তারা পায়, তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে (Manipur Child Rights)।
প্রশ্ন: বর্তমানে মণিপুরে শিশুদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলো কী কী?
উত্তর: শিশু পাচার, শিশুশ্রম, স্কুলছুট, মাদকাসক্তি এবং শিশুদের বিরুদ্ধে হিংসা— এগুলোই এখন প্রধান উদ্বেগ। আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া এবং সামাজিক প্রান্তিক স্তরের শিশুরা বেশি ঝুঁকির মুখে। এই সমস্যাগুলো মোকাবিলায় পরিবার, সমাজ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
প্রশ্ন: জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্ট, পকসো এবং শিক্ষার অধিকার আইন বাস্তবায়নে আপনারা কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন?
উত্তর: চ্যালেঞ্জগুলো বহুমুখী। পর্যাপ্ত বাজেটের অভাব, প্রশিক্ষিত কর্মীর ঘাটতি, দুর্বল পরিকাঠামো এবং দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান বড় বাধা। তবে এর বাইরেও বড় চ্যালেঞ্জ হল দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার অভাব। যেখানে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকে, সেখানে সীমিত সম্পদেও উন্নতি সম্ভব। আমাদের শুধু পরিকাঠামো নয়, মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। শিশু অধিকার-ভিত্তিক শাসনব্যবস্থাই আসল সমাধান (Manipur Child Rights)।
প্রশ্ন: সরকারি দফতর এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গে আপনারা কীভাবে সমন্বয় রক্ষা করেন?
উত্তর: আমরা নারী ও শিশু উন্নয়ন দফতর, পুলিশ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিভাগ এবং জেলা প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করি। যৌথ পরিদর্শন, নিয়মিত সমন্বয় সভা এবং সুপারিশ প্রদানের মাধ্যমে আমরা একটি বহুমুখী ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করি।
প্রশ্ন: সাম্প্রতিক জাতিগত সংঘাত শিশুদের ওপর কতটা প্রভাব ফেলেছে?
উত্তর: এই সংঘাত শিশুদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। বাস্তুচ্যুত হওয়া এবং চোখের সামনে হিংসা দেখা শিশুদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে। ত্রাণ শিবিরে থাকা শিশুরা স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও নিরাপত্তার অভাবে ভুগছে। মণিপুর সরকার তাদের সাধ্যমতো সহায়তা দিচ্ছে, তবে শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে আরও দীর্ঘমেয়াদি কাজের প্রয়োজন।
প্রশ্ন: ঝুকি ও অস্থিরতার কবলে পড়া শিশুদের জন্য কমিশন বিশেষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
উত্তর: আমরা জেলা প্রশাসনকে ত্রাণ শিবিরগুলোতে শিশুদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ এবং শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে নির্দেশ দিয়েছি। এছাড়া কাউন্সেলিং বা মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার জন্য অ্যাডভাইজরি জারি করা হয়েছে যাতে সঙ্কটের সময়েও সুরক্ষা ব্যবস্থা সচল থাকে (Manipur Child Rights)।
প্রশ্ন: মণিপুরের শিশু সুরক্ষা কাঠামোয় কী কী খামতি রয়ে গেছে বলে আপনি মনে করেন?
উত্তর: তৃণমূল স্তরে সুরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। আমাদের সঠিক তথ্যভাণ্ডার এবং ফ্রন্টলাইন কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। এছাড়া শিশু সুরক্ষায় সমাজের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বা ‘কমিউনিটি ওনারশিপ’-এর অভাব একটি বড় ঘাটতি।
প্রশ্ন: শিশুদের সুরক্ষায় পরিবার, সমাজ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
উত্তর: পরিবার এবং সমাজই হল শিশুদের প্রথম সুরক্ষা কবচ। তাদের সচেতন এবং সজাগ থাকতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল পাঠদানের কেন্দ্র হলে চলবে না, তাদের এমন নিরাপদ জায়গা হতে হবে যেখানে কোনও শিশু কষ্টে থাকলে বা নিগৃহীত হলে তা দ্রুত শনাক্ত করা যায়।
প্রশ্ন: সবশেষে, নীতিনির্ধারক এবং মণিপুরের সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে আপনার বার্তা কী?
উত্তর: আমাদের বুঝতে হবে যে শিশুরা কেবল করুণার পাত্র বা সহানুভূতির প্রাপক নয়। তারা অধিকারের অধিকারী। তাদের সম্মান ও মর্যাদা আছে। শিশুরা কেবল দেশের ভবিষ্যৎ নয়, তারা বর্তমানও। তাদের মতামত এবং অভিজ্ঞতাকে আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে (Manipur Child Rights)।
শিশুর অধিকার রক্ষা কোনও বিচ্ছিন্ন কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, সুসংগত সহায়তা ব্যবস্থা এবং সামাজিক পুনর্বাসন। রাষ্ট্র তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবে, কিন্তু পরিবার ও সমাজকেও তাদের নৈতিক দায়বদ্ধতা পালন করতে হবে। তবেই আমরা শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারব।