ad
ad

Breaking News

Moon

চাঁদের মাটিতে ভারতের জল আবিষ্কার হতে চলেছে মানবসভ্যতার নতুন অধ্যায়

দেখা গেছে, চাঁদের দক্ষিণ মেরুর এমন কিছু অঞ্চল রয়েছে যেখানে সূর্যের আলো কখনও পৌঁছয় না।

lunar-water-isro-chandrayaan-future-missions

চিত্র- সংগৃহীত

ড. রাম কৃষ্ণ সেন: মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা শুধু বৈজ্ঞানিক সাফল্য নয়— সমগ্র মানবজাতির ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ করে। চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে স্থায়ী বরফের ভাণ্ডারের নতুন প্রমাণ ঠিক তেমনই এক সন্ধিক্ষণ। চন্দ্রযান ২-সহ আন্তর্জাতিক গবেষণার সাম্প্রতিক ফলাফল আমাদের সামনে এক নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে— চাঁদ কি তবে আগামী দিনের মানব বসতির কেন্দ্র হতে চলেছে? বিগত কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা অনুমান করে আসছিলেন যে চাঁদের মেরু অঞ্চলে জলবরফের উপস্থিতি থাকতে পারে। কিন্তু সেই বরফ কতটা স্থায়ী, কতটা ব্যবহারযোগ্য— এই প্রশ্নগুলিই ছিল মূল। সাম্প্রতিক গবেষণা সেই সন্দেহের অনেকটাই দূর করেছে। দেখা গেছে, চাঁদের দক্ষিণ মেরুর এমন কিছু অঞ্চল রয়েছে যেখানে সূর্যের আলো কখনও পৌঁছয় না। এই ‘চির-অন্ধকার’ ক্রেটারগুলিতে তাপমাত্রা নেমে যায় মাইনাস ১৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে। ফলে সেখানে থাকা বরফ কোটি কোটি বছর ধরে প্রায় অপরিবর্তিত অবস্থায় টিকে রয়েছে। এই আবিষ্কারের গুরুত্ব বোঝার জন্য আমাদের একটু বিস্তৃতভাবে ভাবতে হবে। জল মানে শুধু পানীয় নয়; জল মানেই জীবন, শক্তি এবং টিকে থাকার মৌলিক উপাদান। মহাকাশ গবেষণায় জলকে ‘লিকুইড গোল্ড’ বলা হয়, কারণ এটি থেকে উৎপন্ন করা যায় অক্সিজেন (শ্বাস নেওয়ার জন্য) এবং হাইড্রোজেন (রকেট জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য)। অর্থাৎ, চাঁদের এই বরফ যদি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, তা হলে মহাকাশ অভিযানের খরচ ও জটিলতা অনেকটাই কমে যেতে পারে।

এখানেই প্রশ্ন উঠছে-এই আবিষ্কার কি শুধুই বৈজ্ঞানিক কৌতূহল মেটানোর জন্য, নাকি এর বাস্তব প্রয়োগ আছে? উত্তরটি স্পষ্ট— এর বাস্তব প্রয়োগ অত্যন্ত গভীর। নাসার আর্টেমিস কর্মসূচি ইতিমধ্যেই চাঁদের দক্ষিণ মেরুকে লক্ষ্য করে এগোচ্ছে। ভবিষ্যতে সেখানে মানুষের স্থায়ী বা অস্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, স্থায়ী জলভাণ্ডারের উপস্থিতি পুরো পরিকল্পনাকেই বাস্তবসম্মত করে তুলছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল— এই বরফ কতটা স্থিতিশীল? পূর্বে ধারণা করা হতো, চাঁদের পৃষ্ঠে ঘনঘন উল্কাপিণ্ডের আঘাতে এই বরফ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু নতুন গবেষণা দেখাচ্ছে, বাস্তব চিত্র ভিন্ন। চাঁদের প্রায় ৭৪ শতাংশ অন্ধকার অঞ্চল ছোটখাটো আঘাতে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে এই আঘাত বরফকে উপরিভাগে তুলে আনতেও সাহায্য করে। ফলে ভবিষ্যতের অভিযানে বরফের অবস্থান নির্ধারণ করা আরও সহজ হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চন্দ্রযান-২-এর অরবিটার থেকে পাওয়া তথ্য এই গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো ইতিমধ্যেই চাঁদের দক্ষিণ মেরু নিয়ে একাধিক পরিকল্পনা করছে। চন্দ্রযান-৩-এর সাফল্যের পর চন্দ্রযান-৪-এর পরিকল্পনাও সেই দিকেই এগোচ্ছে। ফলে, এই আবিষ্কার শুধু বৈশ্বিক বিজ্ঞান নয়, ভারতের মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রেও এক বড় প্রাপ্তি।

তবে এই সাফল্যের মধ্যেও কিছু প্রশ্ন এবং সতর্কতার জায়গা রয়েছে। প্রথমত, মহাকাশে সম্পদ আহরণ এবং ব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন এখনও পুরোপুরি সুসংহত নয়। চাঁদের জলকে ব্যবহার করবে? কীভাবে ব্যবহার করবে? এর ওপর কি কোনও একক দেশের অধিকার থাকবে, নাকি এটি হবে সমগ্র মানবজাতির সম্পদ? এই প্রশ্নগুলির স্পষ্ট উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জও কম নয়। চাঁদের কঠিন পরিবেশে অবতরণ, দীর্ঘমেয়াদি বসবাস এবং সম্পদ আহরণ-সবই অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল। তৃতীয়ত, পরিবেশগত প্রশ্নও উঠে আসছে। পৃথিবীর মতোই কি আমরা চাঁদেও সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার শুরু করব? মহাকাশে মানব সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে কি নতুন ধরনের পরিবেশ সঙ্কট তৈরি হবে?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজা জরুরি, কারণ মানবসভ্যতা এখন এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে— ‘স্পেস এজ ২.০’। এই যুগে মহাকাশ আর শুধু গবেষণার ক্ষেত্র নয়, বরং সম্ভাব্য অর্থনীতি, রাজনীতি এবং বসতির ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। তবে সবকিছুর শেষে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হল— এই আবিষ্কার আমাদের কল্পনাশক্তিকে নতুন করে উজ্জীবিত করছে। একসময় যে চাঁদ ছিল কবিতা, পুরাণ এবং রোম্যান্সের বিষয়, আজ তা হয়ে উঠছে বাস্তব বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ক্ষেত্র। ‘চাঁদের দেশে ঘর বাঁধা’— যা একসময় কল্পবিজ্ঞান ছিল, তা এখন আর পুরোপুরি অবাস্তব নয়।

অতএব, চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে জলবরফের এই আবিষ্কার নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে এটিকে শুধুমাত্র সাফল্যের উল্লাসে সীমাবদ্ধ না রেখে, আমাদের উচিত এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা। বিজ্ঞান আমাদের পথ দেখায়, কিন্তু সেই পথে কীভাবে এগোব তার দায়িত্ব আমাদের সবার। চাঁদের বুকে জমে থাকা সেই বরফ হয়তো শুধু জল নয়— তা ভবিষ্যতের এক নতুন সভ্যতার বীজ।

চন্দ্রযান-২ থেকে চাঁদের মাটিতে ভারতের আগামী পদক্ষেপ— এক সুসংহত মহাকাশ কৌশলের রূপরেখা

ভারতের মহাকাশ অভিযাত্রা গত এক দশকে যে দ্রুততা ও পরিণতিতে এগিয়েছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিঃসন্দেহে চন্দ্রযান-২। ২০১৯ সালে উৎক্ষেপিত এই মিশন আংশিক ব্যর্থতা সত্ত্বেও ভারতের মহাকাশ গবেষণাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। বিশেষ করে এর অরবিটার অংশ আজও চাঁদের কক্ষপথে ঘুরে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য পাঠাচ্ছে। এই তথ্যের ভিত্তিতেই সাম্প্রতিক গবেষণায় চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে স্থায়ী জলবরফের উপস্থিতি সম্পর্কে আরও সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেছে। ফলে চন্দ্রযান-২ শুধু একটি মিশন নয়— এটি ভারতের ভবিষ্যৎ চন্দ্র অভিযানের ভিত্তিপ্রস্তর। চন্দ্রযান-২-এর মূল লক্ষ্য ছিল চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে অবতরণ করে সেখানে অনুসন্ধান চালানো। যদিও ‘বিক্রম’ ল্যান্ডারের সফট ল্যান্ডিং সফল হয়নি, তবুও অরবিটারের বিভিন্ন যন্ত্র যেমন সিন্থেটিক অ্যাপারচার রাডার, ইমেজিং ইনফ্রারেড স্পেকট্রোমিটার ইত্যাদি চাঁদের পৃষ্ঠ, খনিজ গঠন এবং জলবরফের উপস্থিতি সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য সংগ্রহ করেছে। এই তথ্যই আজ আন্তর্জাতিক গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে চাঁদের ‘চির-অন্ধকার’ অঞ্চলগুলিতে বরফের স্থায়িত্ব ও বিস্তৃতি সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে বিজ্ঞানীদের। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৩ সালের চন্দ্রযান-৩ মিশনের সাফল্য ভারতের মহাকাশ ইতিহাসে এক মাইলফলক।

এটি শুধু চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সফল অবতরণই নয়, বরং ভারতের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রমাণ। ‘বিক্রম’ ল্যান্ডার ও ‘প্রজ্ঞন’ রোভার চাঁদের মাটিতে রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে সালফার, অ্যালুমিনিয়াম, ক্যালসিয়াম সহ বিভিন্ন উপাদানের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। এর ফলে চাঁদের ভূ-তাত্ত্বিক গঠন সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে, যা ভবিষ্যতের খনিজ সম্পদ ব্যবহারের সম্ভাবনাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। এখন প্রশ্ন, এরপর কী? ভারতের পরবর্তী লক্ষ্য চন্দ্রযান-৪ এবং তারও পরবর্তী মানবসহ চন্দ্র অভিযান। ইসরো ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে যে ভবিষ্যতের মিশনগুলি আরও জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদি হবে। চন্দ্রযান-৪-এর সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে নমুনা সংগ্রহ। যেখানে চাঁদের মাটি বা বরফ পৃথিবীতে এনে বিশ্লেষণ করা হবে। এই ধরনের মিশন প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, কিন্তু সফল হলে তা ভারতের গবেষণাকে এক নতুন স্তরে নিয়ে যাবে। এর পাশাপাশি, ভারতের মানব মহাকাশ মিশন ‘গগনযান’-এর সাফল্য ভবিষ্যতে চাঁদে মানুষ পাঠানোর পথও সুগম করবে। যদিও আপাতত ভারতের পরিকল্পনা স্বতন্ত্রভাবে চাঁদে মানুষ পাঠানো নয়, তবুও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে। নাসা-র আর্টেমিস প্রোগ্রাম বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক উদ্যোগে ভারতের অংশগ্রহণ ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। চাঁদের মাটিতে গবেষণার ক্ষেত্রে ভারতের কৌশল ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গির দিকে এগোচ্ছে। শুধু বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান নয়, বরং সম্পদ ব্যবহার, স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণ এবং মহাকাশ অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ— এই সবই এখন ভারতের পরিকল্পনার অংশ। চাঁদের জলবরফ থেকে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন উৎপাদন, সৌরশক্তির ব্যবহার, এবং স্থানীয় উপাদান দিয়ে নির্মাণ— এই ধারণাগুলি আর কল্পনা নয়, বরং বাস্তব পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠছে। তবে এই পথ একেবারেই মসৃণ নয়। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, বিপুল ব্যয়, এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিলতা— সবই বড় চ্যালেঞ্জ। মহাকাশ এখন শুধু বিজ্ঞানীদের ক্ষেত্র নয়; এটি হয়ে উঠছে ভূ-রাজনীতির নতুন মঞ্চ। চাঁদের সম্পদ নিয়ে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, চিন, রাশিয়া-সহ অন্যান্য শক্তিধর দেশগুলির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা ভারতের জন্য জরুরি।