ad
ad

Breaking News

Kadambini Gangopadhyay

Kadambini Gangopadhyay: এক কঠিন লড়াইয়ের পথিকৃৎ ডাঃ কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়

শহরের কোনও অলিতে গলিতেও বসেনি তাঁর কোন ছোট মূর্তি। এটাই কি তাঁর প্রাপ্য ছিল? সার্ধ শতবর্ষের পর কেটে গেছে আরও অনেকগুলি বছর। তবে এখনও তিনি প্রাসঙ্গিক।

Kadambini Gangopadhyay: India’s First Woman Doctor & Pioneer

চিত্র: সংগৃহীত

রাজু পারাল: ব্রিটিশ ভারতের প্রথম মহিলা স্নাতক (Kadambini Gangopadhyay)। তখনকার সময় চিকিৎসাশাস্ত্রে ছিল তাঁর একাধিক বিদেশি ডিগ্রি। মানব সেবার পাশাপাশি অংশ নিয়েছিলেন ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনেও। তিনি ভারত তথা দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মহিলা চিকিৎসক ডাঃ কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়। আজ তাঁর ১৬৪ তম জন্মদিন। আজ যে হাজার হাজার মেয়ে চিকিৎসক হয়েছেন বা হবেন তাঁর নেপথ্যে কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টা ও প্রেরণা অবশ্যই স্মরণীয়। অথচ আজও তিনি রয়ে গেছেন বিস্মৃতির অন্ধকারে। তাঁর নামে হয়নি কোনও মেডিক্যাল কলেজ, হয়নি কোনও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। এমনকী শহরের কোনও অলিতে গলিতেও বসেনি তাঁর কোন ছোট মূর্তি। এটাই কি তাঁর প্রাপ্য ছিল? সার্ধ শতবর্ষের পর কেটে গেছে আরও অনেকগুলি বছর। তবে এখনও তিনি প্রাসঙ্গিক।

রক্ষণশীল সমাজ রীতিমতো ঘৃণার চোখে দেখত তাঁকে। তাঁর অপরাধ একটাই তিনি মহিলা চিকিৎসক। তার ওপর আবার নারীদের শিক্ষা, নারীদের সাবলম্বী করতে উঠে পড়ে লেগেছিলেন তিনি। তবে তিনি যা চেয়েছিলেন, তাই হয়েছে। সে সময়ে বিবিধ কুৎসার মুখোমুখি হলেও সরে আসেননি নিজের প্রতিজ্ঞা থেকে। তৎকালীন ‘বঙ্গবাসী’ পত্রিকায় রসিয়ে রসিয়ে তাঁর সম্পর্কে লেখা হয়েছিল, ‘ফিজ দিলেই শহরে মিলবে যুবতী ডাক্তারের সেবা।’ তার সঙ্গে ছাপা হয়েছিল কুৎসিত এক কার্টুন।

দ্বারকানাথ রূপী একটি ভেড়াকে দড়ি বেঁধে ঘোরাচ্ছেন কাদম্বিনী। কুরুচিকর এই আক্রমণের কারণ কী? কারণ একটাই, ১৮৮৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম মহিলা স্নাতকের ডিগ্রি লাভের পর তিনি ডাক্তার হতে চেয়েছিলেন। বাধা পেলেন পদে পদে। তাঁকে সাহায্য করতে সেদিন এগিয়ে এসেছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের নেতা, সমাজ সংস্কারক দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়। এমন একজন মানবীকে হয়তো আমরা পেতাম না, যদি না দ্বারকানাথের মতো যুগপুরুষের সান্নিধ্য কাদম্বিনী (Kadambini Gangopadhyay) পেতেন।

দ্বারকানাথের মতো বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ তৎকালে নারী শিক্ষার বিস্তারকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলার সম্মানকে সর্বোচ্চ স্থানে তুলে ধরেছিলেন। এর আগে অবশ্য ঠাকুরবাড়ির প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর বাংলার সম্মানকে একেবারে আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়েছিলেন। মহিলারা যদি শিক্ষিত হতে পারে তা হলে সমাজ থেকে কুসংস্কার অচিরেই দূর হতে পারে বলে বিশ্বাস করতেন তিনি। প্রিন্স দ্বারকানাথের মতো একই মত পোষণ করতেন দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ও।

তবে বাংলার নারী জাগরণের ইতিহাসে কাদম্বিনীর নাম স্ববিশেষ উল্লেখযোগ্য। তৎকালে হিন্দু রক্ষনশীল সমাজের দ্বারা একাধিকবার বাধা পেলেও যে প্রচণ্ড প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে কাদম্বিনী প্রথম মহিলা চিকিৎসকের গৌরব অর্জন করেছিলেন, তা বাস্তবিকই বিস্ময়কর। প্রতি বছরই ১৮ জুলাই দিনটি নিঃশব্দে পার হয়, আর সেই সঙ্গে বিস্মরণে রয়ে যান ওই দিনটিতে জন্মানো বাংলার অন্যতম নারী চিকিৎসক কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়।

যে সময়ে ভারতীয় মহিলাদের কর্মজগতের রেখচিত্র তেমনভাবে তৈরিই হয়নি। ঘরের আঙিনা পেরিয়ে বহির্জগতে পা রাখতে ইতস্তত করছেন অনেক মহিলা। সেই সময়ে তিনি নির্ধিদ্বায় প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেছেন কলকাতায়। কলকাতায় তাঁর চেম্বারটি ছিল কলেজ স্কোয়ারের বেনিয়াটোলা লেনে। পরে অবশ্য ৫৭ নম্বর সুকিয়া স্ট্রিটে নতুন চেম্বার খোলেন (Kadambini Gangopadhyay)।

‘বেঙ্গলী’ বা ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’র মতো কাগজে নিয়মিত তাঁর বিজ্ঞাপন বেরোত। অর্থ উপার্জন যে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না, তা ওই সমস্ত কাগজের বিজ্ঞাপন দেখলেই বোঝা যেত। প্রতিদিনই তিনি বিনা পারিশ্রমিকে দরিদ্র নারী ও শিশুদের চিকিৎসা করতেন। তবে শুধু সাধারণ চিকিৎসা নয়, শল্য ও ধাত্রী’র চিকিৎসাও করতেন। রাত বিরেতে ফিটন চেপে রোগী দেখতে যেতেন। মৃত্যুর পরে তাঁর ব্যাগ থেকে পাওয়া গিয়েছিল শেষ ভিজিটের ৫০ টাকা। ইতিহাস সৃষ্টিকারী চিকিৎসকের সম্মানে সেই টাকা খরচ করা হয়েছিল তাঁর শেষকৃত্যে।

কাদম্বিনী ছিলেন তাঁর সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা এক আশ্চর্য রমণী। তাঁর জন্ম বছরেই ভারতে জন্মেছিলেন কালোত্তীর্ণ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রখ্যাত রসায়নবিদ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও স্বনামধন্য চিকিৎসক নীলরতন সরকারের মতো দিকপাল মানুষরা। কাদম্বিনীর জন্ম ১৮৬১ সালের ১৮ জুলাই বিহারের ভাগলপুরের এক ব্রাহ্ম পরিবারে। পরিবারের আদি বাসস্থান ওপার বাংলার বরিশালের চাঁদশিতে। কাদম্বিনীর বাবা ব্রজকিশোর বসু ছিলেন ভাগলপুর স্কুলের শিক্ষক এবং সেখানকার নারীমুক্তি আন্দোলনের পুরোধা। ভারতের প্রথম মহিলা সমিতি ব্রজকিশোরই স্থাপন করেছিলেন। ফলে সেই নারীমুক্তি আর স্বাধীনতার স্বাদ শৈশবেই পেয়েছিলেন কন্যা কাদম্বিনী (Kadambini Gangopadhyay)।

পড়াশুনোয় কাদম্বিনীর আগ্রহ ছিল ভীষণ। মাত্র চোদ্দো বছর বয়সে বাবা তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসেন। ভর্তি করেন মেয়েদের একটি বোর্ডিং স্কুলে, যার নাম ‘হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়’। ২২ নং বেনিয়াপুকুর লেনের এই বোর্ডিং স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম এবং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়। যিনি পরবর্তীতে কাদম্বিনীর জীবনসঙ্গী হন। এছাড়া স্কুলটিতে যুক্ত ছিলেন শিবনাথ শাস্ত্রী, আনন্দমোহন বসু, ভগবানচন্দ্র বসু, দুর্গামোহন দাস প্রমুখ সমাজ সংস্কারক এবং নারীশিক্ষা আন্দোলনের অগ্রণী ব্যক্তিরা।

ভাবলে অবাক লাগে এখানেই কাদম্বিনী শুরু করেছিলেন তাঁর শিক্ষাজীবন। আবাসিক এই স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি গান, সেলাই এবং নানা বিলিতি আদব-কায়দা রপ্ত করে নিয়েছিলেন কাদম্বিনী। এখানে মেয়েদের স্কুলের হিসাবপত্র রাখা থেকে শুরু করে রান্না করা, পালা করে রান্নাঘরের ভার নেওয়া, নিয়মিত বনভোজন ও ভ্রমণ যাওয়া সবই একটি নিয়মের মধ্যে দিয়ে চলত। এই বহুমুখী শিক্ষা কিশোরী কাদম্বিনীর ব্যক্তিত্ব গঠন ও পরবর্তী জীবনে খুবই কাজে লেগেছিল।

ব্রিটিশ শাসিত দেশগুলি থেকে প্রথম যে দু’জন নারী স্নাতক হয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন তাঁদের একজন হলেন কাদম্বিনী অন্যজন চন্দ্রমুখী বসু। ১৮৮৩ সালে কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে দু’জনেই স্নাতক হন। যা ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে গণ্য হয়। ওই বছরের ফ্রেবুয়ারি সংখ্যায় ‘বামাবোধিনী’ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, ‘…বেথুন  মহাবিদ্যালয় হইতে কুমারী কাদম্বিনী বসু এবং কুমারী চন্দ্রমুখী বসু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছেন। এই সংবাদে ভারত হিতৈষী মাত্রেই যারপরনাই উল্লাসিত ও উৎসাহিত হইবেন সন্দেহ নাই। শিক্ষা সম্বন্ধে পুরুষদিগের সহিত স্ত্রীলোকদিগের যে সমান অধিকার ইহা প্রমাণ করিবার জন্য আর আমাদিগকে দূরবর্তী দেশে বা সময়ে ভ্রমণ করিতে হইবে না, দেশবাসীগণ এক্ষণে তাহার প্রত্যক্ষ প্রমাণ দর্শন করিলেন। স্ত্রী শিক্ষার যে পথ উন্মুক্ত হইয়াছে তাহা ক্রমশ অবারিত হউক এবং ইহার সকল অসম্পূর্ণতা দূর হউক, ঈশ্বরের নিকট আমাদের এই মাত্র প্রার্থনা (Kadambini Gangopadhyay)।’

কাদম্বিনী স্নাতক পাশ করার পর ডাক্তারি পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনিই ছিলেন ইউরোপীয় চিকিৎসাশাস্ত্রে শিক্ষিত দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম পেশাজীবী নারী চিকিৎসক। মেডিক্যাল কলেজে পড়াকালীনই কাদম্বিনী সরকারের থেকে মাসে ২০ টাকা করে স্কলারশিপ পেতেন। সেই সময়ের তুলনায় টাকাটা ছিল যথেষ্টই লোভনীয়। মেডিক্যাল কলেজের প্রফেসররা তাঁকে মেনে নিতে পারছিলেন না। লিখিত পরীক্ষায় পাশ করলেও প্র্যাকটিক্যালে অকৃতকার্য হন কাদম্বিনী।

কারণ ঈর্ষাকাতর, প্রাচীনপন্থী বিরুদ্ধবাদীরা প্রবল কলকাঠি নেড়ে তাঁর কাছ থেকে প্রথম বাঙালি মহিলা চিকিৎসকের আসন কেড়ে নিতে চেয়েছিলেন। ১৮৮৬ সালে তাঁকে জিবিএমএস ( গ্র্যাজুয়েট অফ বেঙ্গল মেডিক্যাল কলেজ ) উপাধি দেওয়া হয়। এরপর কিছুদিন তিনি লেডি ডাফরিন মহিলা হাসপাতালে তিনশো টাকা মাইনেতে ডাক্তারি করেন। অদম্য এই নারীর অবিস্মরণীয় উত্থানে কোনও বাধাই টিকতে পারেনি শেষপর্যন্ত। প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসেবে পাশ্চাত্য রীতিতে চিকিৎসা করার অনুমতি পান।

কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের বিরুদ্ধবাদীদের যোগ্য জবাব দিতে আট সন্তানকে সেই যুগে বাড়িতে রেখে তিনি বিলেতে যান ডাক্তারির ডিগ্রি নিতে। ১৮৯৩ সালের ২৬ ফ্রেবুয়ারি মিস প্যাশ নামে এক মহিলার সঙ্গিনী হয়ে জাহাজে একা বিদেশযাত্রা করেন। লন্ডন পৌঁছন ২৩ মার্চ। তারপরে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় মাত্র তিন মাসে তিনটি ডিপ্লোমা সংগ্রহ করে দেশে ফেরেন। যদিও তাঁর সেই যাওয়ার প্রস্তুতির সময়টা মোটেও মসৃণ ছিল না। ব্যঙ্গচিত্র এবং কার্টুনের মাধ্যমে কাদম্বিনীকে উপহাস করা হয়েছিল। তাঁকে একজন ‘পতিতামহিলা’ এবং তাঁর স্বামীকে ‘স্ত্রৈণ’ চিত্রিত করা হয়েছিল। দেশে ফিরে তিনি নিয়মিত ডাক্তারি প্র্যাক্টিস করতেন।

কাদম্বিনী তাঁর সমগ্র জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন কর্মই জীবন। প্রাণের উৎসাহ ও পরিশ্রমই জীবনে সাফল্য আনে। অতীতের সেই অন্ধকার যুগ পেরিয়ে এলেও এখনও নারীজাতির সম্পূর্ণ মুক্তি ঘটেনি, শিক্ষার আলো সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়া যায়নি। ১৯২৩ সালের ৩ অক্টোবর মাত্র ৬২ বছর বয়সে কাদম্বিনীর মৃত্যু হয়। কাদম্বিনী কেবল চিকিৎসক নন, এক কঠিন লড়াইয়ের পথিকৃৎ, এক সংস্কারক, এক প্রেরণা (Kadambini Gangopadhyay)।