চিত্রঃ সংগৃহীত
রাজাগোপাল ধর চক্রবর্ত্তী: ইরানে শুরু হয়েছে অর্থনৈতিক প্রতিবাদ থেকে শাসন পরিবর্তনের এক সমন্বিত দেশব্যাপী আন্দোলন। আন্দোলন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে এক অভ্যুত্থানে। নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভির রাত দখলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে গত ২০২৬ সালের ৮ ও ৯ জানুয়ারী রাত আটটায়, হাজার হাজার ইরানি সম্মিলিত ভাবে স্লোগান দেয় সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির বিরুদ্ধে। ‘গাজা নয়, নয় লেবানন, ইরানের জন্য আমার জীবন’ স্লোগানে মুখরিত সমগ্র ইরান। সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের ব্যপক ক্ষোভ চারিদিকে প্রতিফলিত। সমগ্র একত্রিশটা প্রদেশেই বিক্ষোভ চলছে। এখনও পর্যন্ত কমপক্ষে ৫৪৪টি মৃত্যুর নিশ্চিত খবর এসেছে, এদের মধ্যে প্রায় ৫০ জন নিরাপত্তা কর্মী। আটক ষোল হাজারেরও বেশি। চারিদিকে এলিট সেনা, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী মোতায়েন। ইরান ইন্টারনেট সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউটের মধ্যে রয়েছে। সুপ্রিম লিডার আলি খামেনি, অস্থিরতার জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দায়ী করছেন। বিক্ষোভকারীরা তার মতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের ‘ভাড়াটে সৈনিক’। অ্যাটর্নি জেনারেল ঘোষণা করেছেন, বিক্ষোভকারীরা মোহারেবেহ বা ‘ঈশ্বরের শত্রু’। তাদের অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তেহরানকে একাধিক হুঁশিয়ারিতে বলেছেন, ইরান সরকার যদি নিজের জনগণকে হত্যা অব্যাহত রাখে তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ‘খুব কঠোর’ জবাব দেবে।
আন্দোলনের নেতৃত্ব
ইরানের এই ‘শীতকালীন অভ্যুত্থান’ বিস্তৃতভাবে নেতৃত্বহীন। আন্দোলনটি কোনও রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে নয়, একটি ‘ঘৃণার জোট’ হিসাবে উঠে এসেছে। সবাই ইসলামিক প্রজাতন্ত্র বা মোল্লাতন্ত্র থেকে মুক্তির পথ খুঁজছে। তবে ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি নির্বাসন থেকে এই আন্দোলনের সবচেয়ে বিশিষ্ট প্রতীকী এবং সংগঠিত ব্যক্তিত্ব হিসাবে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির জ্যেষ্ঠ পুত্র, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে আমেরিকায় নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন। রেজা পাহলভি ইরানে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের একজন শীর্ষস্থানীয় সমর্থক। তিনি চান বর্তমান মোল্লাতান্ত্রিক সরকার থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তর। তিনি তেল, গ্যাস এবং পরিবহণ শ্রমিকদের সঙ্গে সরাসরি ইরানি সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীকে এই আন্দোলনে শামিল হওয়ার আহ্বান করেন। ইরানি জনগণের ওপর গুলি চালানোর পরিবর্তে তাদের সুরক্ষায় তাদের অস্ত্র ব্যবহার করতে বলেন তিনি। পাহলভি বলেছিলেন যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন এখন আর ‘যদি’ নয়, বরং ‘কখন’-এর প্রশ্ন।
ইসরায়েল যুদ্ধই চরম বিপর্যয়ের কারণ
২০২৫ সালের জুনের বারো দিনের যুদ্ধে ইরানের সামরিক, পারমাণবিক এবং অর্থনৈতিক অবকাঠামো মারাত্মকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়ে। ২০২৬ সালের বিদ্রোহের সূত্রপাত এই ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে ঘিরেই। ইসরায়েল ২০২৫ সালের জুন মাসের যুদ্ধে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস হাইকমান্ডের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এক বড় অংশকে নির্মূল করে দিয়েছিল। বারো দিনের যুদ্ধে ইরানের সব চেয়ে বড় ক্ষতি, ইরানের বিরুদ্ধে জাতি সঙ্গের লাগু করা সমস্ত পুরানো নিষেধাজ্ঞা ফিরে আসা। ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তিতে একটা ‘মারণ সুইচ’ লাগানো ছিল। ইরানের চুক্তি লঙ্ঘন ধরা পড়লে জাতিসংঘের সমস্ত নিষেধাজ্ঞা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেটো-প্রুফ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাবে।
চিন বা রাশিয়ার বাইরের কোনও ব্যাঙ্কের পক্ষে ইরানের অর্থ স্পর্শ করা প্রায় অসম্ভব হয়েছে এই নিষেধাজ্ঞায়। ইরানি পরমাণু ইস্যু অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে। এইসব ঘটনায় বাজারে চূড়ান্ত মানসিক আঘাত এসেছে। বিনিয়োগকারী এবং ইরানি জনগণ বুঝেছে কূটনীতির আর সুযোগ নেই। অদূর ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা ওঠার জায়গাও নেই। এই দুশ্চিন্তা ডলারের ‘আতঙ্কিত চাহিদা’ বাড়িয়ে তোলে, ধস নামে রিয়ালের আন্তর্জাতিক মূল্যে। ইরানি রিয়াল একটি বিপর্যয়কর ঐতিহাসিক সর্বনিম্নে। সরকার দ্বারা নির্ধারিত ১ ডলার ৪২,০০০ রিয়ালের সমান হলেও মুক্ত বাজার হার অনেক বেশি। ২০২৫ সালের ১ জুন খোলা বাজারে এক ডলারের মুল্য ছিল ৬১০,০০ রিয়াল। ১০ জানুয়ারি ২০২৬ এই রেট যাচ্ছে ডলারে ১৪ লক্ষ ৭০ হাজার রিয়াল। অফিসিয়াল রেট মূলত নির্দিষ্ট সরকারি অ্যাকাউন্টিংয়ের জন্য ব্যবহৃত একটি ‘কাগজ হার’। বেশিরভাগ ইরানি এবং ব্যবসায়ীদের অবশ্যই বাজার হারে কাজ করতে হয়। গত সাত মাসে ১৪০ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে রিয়ালের আন্তর্জাতিক মূল্যে। রান্নার তেল এবং ওষুধের মতো মৌলিক পণ্য আমদানির জন্য ভর্তুকিযুক্ত ডলার বন্ধ করার সরকারের সিদ্ধান্ত রিয়ালের অস্বাভাবিক পতন শুরু হয়।
প্রতিরোধ অক্ষের জন্য ইরানের খরচ
ইরানের ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ অংশীদারদের যাবতীয় বরাদ্দ ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য এবং অ্যাকাউন্ট বহির্ভূত ভাবেই হয়েছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ ইরানের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অংশীদার। মার্কিন ট্রেজারি ডেটা জানাচ্ছে, ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সঙ্কট সত্ত্বেও প্রতি মাসে ১০ কোটি মার্কিন ডলারে পায় তারা। ২০২৫ সালে ৭০ থেকে ১০০ কোটি ডলার খরচ হয়েছে, এদের পেছনে। গাজার হামাস বছরে ১০ থেকে ৫ কোটি ডলার পেয়ে এসেছে। ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ প্রাথমিকভাবে সামরিক সরবরাহ এবং যোদ্ধা উপবৃত্তির উপর পেট বছরে ৭ থেকে ১০ কোটি। ইরাকি মিলিশিয়াদের বরাদ্দ ছিল ১৫ থেকে ১০০ কোটি ডলার। ইয়েমেনের হুথি বিশুদ্ধ নগদ অর্থের পরিবর্তে উন্নত অস্ত্রশস্ত্র (ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন) পেয়েছে। ২০১২ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ক্রেডিট লাইন, তেল স্থানান্তর এবং সামরিক সহায়তার মাধ্যমে সিরিয়ার আসাদ সরকার পেয়েছে আনুমানিক তিন থেকে ৫ হাজার কোটি ডলার। আসাদ সরকারের পতনে পুরো অর্থই গচ্ছা গেছে। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের ধারণা, ২০১২ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ইরান তার প্রক্সি নেটওয়ার্ক এবং সিরিয়ার সংঘাতের জন্য বিশেষত মোট ১৬০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে।
ইরানে মুদ্রাস্ফীতি
মুদ্রাস্ফীতি কার্যকরভাবে ইরানকে এক মারাত্মক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিস্ফোরণের দিকে নিয়ে এসেছে। যদিও ‘অফিসিয়াল’ বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার প্রায় ৪২.২ শতাংশ, সাধারণ প্রয়োজনীয় পণ্যগুলির দাম গড়ের চেয়ে অনেক দ্রুত হারে বাড়ছে। মজুরি জীবনযাত্রার ব্যয় থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন, ইরানে গড় মাসিক মজুরি প্রায় ১০০ মার্কিন ডলারের সমতুল্য। সাধারণ ভাবে বেঁচে থাকতে এখন একাধিক চাকরি প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে, এমনকি একটি পূর্ণকালীন পেশাদার বেতনও একটি ছোট পরিবারের খরচ মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। যদিও সাধারণ মুদ্রাস্ফীতির হার প্রবল, খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি ৭৫ শতাংশ ছড়িয়ে গেছে। যে খাবার দাবার যেমন মাছ, মাংস, ডিম এবং ভোজ্য তেল একসময় মৌলিক পর্যায়ে ছিল আজ তা ‘বিলাসবহুল পণ্য’ হয়ে উঠেছে। প্রোটিন সমৃদ্ধ ডায়েট থেকে সাধারণ কার্বোহাইড্রেটে স্যুইচ করার ফলে জনসংখ্যার অর্ধেক এখন কিছুটা অপুষ্টির মুখোমুখি।
ভারতের অবস্থান
ভারত এই বিক্ষোভকে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইরানি নেতৃত্ব বা নিরাপত্তা বাহিনীর অস্থিরতা পরিচালনার সমালোচনা করে কোনও বিবৃতি প্রকাশ করেনি। ইরানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা আঞ্চলিক জ্বালানির দাম এবং পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তাকে ব্যাহত করতে পারে বলে ভারত মনে করে। একই সঙ্গে ভারতের উদ্বেগ সেখানে বসাবাসকারী প্রায় দশ হাজার ভারতীয় নাগরিক নিয়ে। ইরানে ব্যাপক বিনিয়োগের কারণেও ভারত সূক্ষ্ম ভারসাম্য মেনে চলতে হচ্ছে। যে কোনও শাসন পরিবর্তন বা বিশৃঙ্খলা ভারতের চাবাহর বন্দর পরিচালনায় বিপর্যয় আসতে পারে, সে ব্যপারে ভারত সতর্ক।
এই কৌশলগত করার জন্য ভারতের ১০ বছরের চুক্তি রয়েছে, যা মধ্য এশিয়া এবং আফগানিস্তানের প্রবেশদ্বার হিসাবে কাজ করে। ভারত সম্পর্কে সতর্ক যা এই প্রকল্পকে বিপন্ন করতে পারে। সম্প্রতি, ভারতকে কেবল বিক্ষোভের ক্ষেত্রেই নয়, আঞ্চলিক সামুদ্রিক উত্তেজনার মধ্যে ট্যাঙ্কারে আটক ভারতীয় ক্রু সদস্যদের সুরক্ষার ব্যাপারে ইরানি কর্তৃপক্ষের সহায়তা চাইতে হয়েছিল।
সমাপ্তি মন্তব্য
সরকারের ‘বেঁচে থাকার সূচক’ কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন এবং ২০২৪- ২০২৫ সালে হিজবুল্লাহ এবং হামাসের অবক্ষয়ের পরে ইরানের আঞ্চলিক ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ তার দুর্বলতম পর্যায়ে রয়েছে। সুপ্রিম লিডার আলি খামেনি অসুস্থ। ক্ষমতার লড়াই সিদ্ধান্তহীনতাকে আরও বাড়াবে, সন্দেহ নেই। নিরাপত্তারক্ষীরা জনতার ওপর গুলি চালানোর আদেশ প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। যদি এ খবর সত্যি হয় ও বাড়তে থাকে, তবে শাসন ক্ষমতা ধরে রাখা মুশকিল হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যাকাণ্ড অব্যাহত থাকলে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা হবে। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বন্দি করার পরে ইরানি নেতৃত্ব এই ট্রাম্পকে কাগুজে বাঘ ভাবে না।
প্রথমবারের মতো একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বিকল্প উঠে আসছে। নির্বাসিত ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভির আহ্বানে সর্বাত্মক সাধারণ ধর্মঘট এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ চলছে, তারা প্রকাশ্যে প্রাক-বিপ্লব-সিংহ এবং সূর্যের পতাকা উড়াচ্ছে। বাজার ও তেল শিল্পের শ্রমিকরা যদি দীর্ঘদিন দীর্ঘ দিন ধর্মঘট বজায় রাখে, তা হলে রাষ্ট্র তার আর্থিক সক্ষমতা হারাবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা রক্ষা করার জায়গা থাকবে না। আইআরজিসি যদি অনুগত থাকে এবং প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ অব্যাহত রাখে, তবে বিদ্রোহটি রাস্তায় বিক্ষোভ থেকে বিকেন্দ্রীভূত সশস্ত্র বিদ্রোহে রূপান্তরিত হতে পারে। সরকার ইতোমধ্যে পশ্চিম (কুর্দি) এবং দক্ষিণ-পূর্ব (বালুচ) অঞ্চলকে সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্র হিসাবে বিবেচনা করা শুরু করেছে। ইরানে রাস্তার বিক্ষোভ সরকার সাময়িকভাবে পরিষ্কার করতে পারে, তবে ভগ্নপ্রায় সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধ পরবর্তী অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার সহজ পথ নেই।