চিত্রঃ প্রতীকী
সত্যগোপাল দে (লেখক— সাংবাদিক, শিশু, নারী সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং সাইকোলজিকাল কাউন্সেলর): ওবেসিটি শব্দটি আমাদের কাছে অচেনা নয়, কিন্ত ইনফোবেসিটি? একুশ শতকের আধুনিক জীবনে আমাদের সকাল শুরু হয় খবরের কাগজের পাতায় চোখ বুলিয়ে নয়, বরং স্মার্টফোনের নীল আলোয়। ঘুম ভাঙার মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় তথ্যের অবিরাম বর্ষণ। হোয়াটসঅ্যাপের নোটিফিকেশন, ফেসবুকের নিউজ ফিড, ই-মেলের ইনবক্স আর অন্তহীন নিউজ পোর্টালের অ্যালার্ট— সব মিলিয়ে আমরা এখন এক ডিজিটাল গোলকধাঁধায় কিংবা ভুলভুলাইয়ায় বন্দি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে শরীরে অতিরিক্ত মেদ জমলে তাকে আমরা বলি ‘ওবেসিটি’। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের মগজে যে তথ্যের পাহাড় জমছে, তাকে সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন ‘ইনফোবেসিটি’।
ইনফোবেসিটি কী?
‘ইনফরমেশন’ এবং ‘ওবেসিটি’ এই দুই শব্দের মেল বন্ধনে তৈরি হয়েছে ‘ইনফোবেসিটি’। সহজ বাংলায় একে বলা যেতে পারে ‘তথ্য-স্থূলতা’। যখন একজন মানুষ তার গ্রহণ ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি তথ্যের সম্মুখীন হন এবং সেই তথ্যের চাপে সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম হয়ে পড়েন, তখনই সেই অবস্থাকে ইনফোবেসিটি বলা হয়। একে অনেক সময় ‘ইনফক্সিকেশন’ বা তথ্যের বিষক্রিয়া এবং ‘ইনফরমেশন ফ্যাটিগ সিনড্রোম’ও বলা হয়ে থাকে।
অতীত বনাম বর্তমান: তথ্যের বিবর্তন
সেকাল: খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন তথ্যের আকাল ছিল। একটি খবরের জন্য আমাদের পরদিন সকালের খবরের কাগজ বা রাতে আকাশবাণীর সংবাদের ওপর নির্ভর করতে হতো। তথ্যের উৎস ছিল সীমিত এবং যাচাইকৃত। মস্তিষ্ক সেই সীমিত তথ্যকে বিশ্লেষণ করার এবং তা থেকে জ্ঞান আহরণ করার পর্যাপ্ত সময় পেত। তখন মানুষের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা ছিল গভীর।
একাল: আজ আমরা তথ্যের মহাসমুদ্রে বাস করছি। ২৪/৭ ডিজিটাল কানেক্টিভিটি আমাদের হাতের মুঠোয় তথ্যের জোগান দিচ্ছে। কিন্তু এই তথ্য প্রাচুর্যই এখন অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্যের প্রবাহ এখন এতটাই তীব্র যে, মস্তিষ্ক তা ফিল্টার করার সময় পাচ্ছে না। আগে আমরা তথ্য খুঁজতাম, আর এখন তথ্য আমাদের খুঁজে বের করে আক্রমণ করে। এই রূপান্তরই আমাদের ঠেলে দিচ্ছে ‘ডেটা স্মগ’ বা তথ্যের কুয়াশার দিকে।
আমাদের চারপাশে ইনফোবেসিটির রূপ
তথ্য-স্থূলতা আজ আমাদের জীবনের প্রতিটি স্তরে থাবা বসিয়েছে। এর কিছু সাধারণ উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে—
কর্মক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা: একজন ম্যানেজার হয়তো একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবেন, কিন্তু তার আগে তাকে শত শত ইমেল, ডেটা অ্যানালিটিক্স রিপোর্ট এবং রিয়েল-টাইম মেসেজের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। ফলাফল? তথ্যের ভিড়ে খেই হারিয়ে ফেলা এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারা।
ব্যক্তিগত জীবনে উদ্বেগ: সারাদিন ফোনের নোটিফিকেশন আমাদের মস্তিষ্ককে শান্ত হতে দেয় না। যুদ্ধের খবর থেকে শুরু করে বিনোদনের গসিপ— সবই যেন এক সঙ্গে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই অতিরিক্ত ডিজিটাল খোরাক আমাদের ভেতরে এক ধরনের অজানা ভয় বা ‘প্যারালাইসিস’ তৈরি করে।
শিক্ষাক্ষেত্রে ক্লান্তি: আজকের একজন ছাত্র বা ছাত্রীর কাছে ইন্টারনেটের দৌলতে পড়াশোনার উপকরণের অভাব নেই। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট বিষয় শিখতে গিয়ে যখন সে ডজনখানেক পিডিএফ, ইউটিউব ভিডিও আর ব্লগ পড়তে শুরু করে, তখন তার মস্তিষ্ক সেই ভার বইতে পারে না। একেই বলা হচ্ছে ‘কগনিটিভ ওভারলোড’।
রিচার্ড নিসবেটের তত্ত্ব ও আধুনিক মনস্তত্ত্ব
বিখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক রিচার্ড নিসবেট-এর ‘জিওগ্রাফি অফ থট’ তত্ত্বটি আজকের এই সঙ্কটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। নিসবেট দেখিয়েছেন যে, মানুষের মস্তিষ্ক সব তথ্যকে একইভাবে গ্রহণ করে না। তাঁর মতে, অতিরিক্ত তথ্যের ভিড়ে আমরা যখন দিশাহারা হয়ে পড়ি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক ‘হিউরিস্টিকস’ বা এক ধরনের মানসিক শর্টকাট খোঁজার চেষ্টা করে।
নিসবেটের তত্ত্ব অনুযায়ী, তথ্যের এই অতি-প্রাচুর্য আমাদের ‘অ্যানালিটিক্যাল’ বা বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। আমরা গভীরে না গিয়ে কেবল ওপর ওপর তথ্য দেখে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। একে তিনি ‘টেলিং মোর দ্যান উই ক্যান নো’ বলে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ, আমরা তথ্যের চাপে এতটাই বিভ্রান্ত যে, আমাদের সিদ্ধান্তের পেছনের প্রকৃত যুক্তিগুলো আমরা নিজেরাই হারিয়ে ফেলছি। অতিরিক্ত তথ্য আমাদের মগজকে অলস করে দিচ্ছে এবং আমরা ঠিক-ভুলের পার্থক্য করার ক্ষমতা হারাচ্ছি।
লক্ষণ ও প্রভাব
আমরা কি সত্যিই ইনফোবেসিটির শিকার? নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারেন এই লক্ষণগুলি—
মনসংযোগের অভাব: কোনও একটি কাজ বা বইয়ে বেশিক্ষণ মন দিতে না পারা। বারবার ফোনের দিকে হাত চলে যাওয়া।
মানসিক অবসাদ ও বিভ্রান্তি: অতিরিক্ত তথ্যের চাপে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়ে, যার ফলে ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নিতেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
উদ্বেগ ও অনিদ্রা: সারাক্ষণ ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত থাকার ফলে এক ধরনের ‘বার্নআউট’ তৈরি হয়। মনে হয়, আমি বোধহয় অনেক কিছু জানি না বা পিছিয়ে পড়ছি।
প্রতিকারের পথ: ডিজিটাল ডায়েট
শরীরের ওবেসিটি কমাতে যেমন ডায়েট করতে হয়, ইনফোবেসিটি রুখতে প্রয়োজন ‘ডিজিটাল ডায়েট’।
তথ্যের উৎস সীমিত করা: সব নোটিফিকেশন অন রাখার প্রয়োজন নেই। গুরুত্বপূর্ণ ইমেল বা খবর দেখার জন্য দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করুন।
কয়েক ডজন পোর্টাল না পড়ে একটি নির্ভরযোগ্য সংবাদপত্র বা ম্যাগাজিন পড়ুন। নিসবেটের তত্ত্ব অনুযায়ী, খণ্ড খণ্ড তথ্যের চেয়ে সামগ্রিক বা ‘হোলিস্টিক’ জ্ঞান মস্তিষ্কের জন্য বেশি আরামদায়ক।
ডিজিটাল ডিটক্স: সপ্তাহে অন্তত একদিন বা দিনের কয়েক ঘণ্টা ফোন এবং ইন্টারনেট থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকুন। বই পড়া, বাগান করা বা প্রিয়জনদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা, সঙ্গী কিংবা সঙ্গীনির সঙ্গে একান্তে সময় কাটান মস্তিষ্ককে রিচার্জ করতে সাহায্য করে।
তথ্য মানেই জ্ঞান নয়। কে বলেছে সবাইকে সর্বজ্ঞ পণ্ডিত হতে হবে? অতিকথন যেমন সুরুচির লক্ষণ নয়, তেমনই অতি-তথ্যও সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ নয়। আমরা তথ্যের মহাসমুদ্রে বাস করছি ঠিকই, কিন্তু তৃষ্ণার্ত থাকার চেয়ে লোনা জল খেয়ে পেট ভরানো অনেক বেশি ক্ষতিকারক। মনে রাখবেন, মস্তিষ্ক একটি পেশির মতো, তাকে বিশ্রাম দেওয়া এবং অপ্রয়োজনীয় আবর্জনা থেকে মুক্ত রাখা আমাদেরই দায়িত্ব। সুস্থ থাকতে হলে আজ থেকেই তথ্যের রাশ টানুন, না হলে এই ‘ইনফোবেসিটি’ একদিন আমাদের চিন্তা করার মৌলিক ক্ষমতাকেই গিলে খাবে।