চিত্র - সংগৃহীত
নোটন কর: সরকারি সূত্র অনুসারে, গত ৭ ফেব্রুয়ারি, ভারত-মার্কিন অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যে প্রথমে মূল রফতানি শুল্কের উপরে ২৫ শতাংশ বাড়তি শুল্ক চাপিয়েছিলেন। তার পরে রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্য আরও ২৫ শতাংশ জরিমানা চাপিয়েছিলেন। এই ৫০ শতাংশ শুল্ক-জরিমানা চাপিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দর কষাকষি শুরু করেছিল। চুক্তি অনুযায়ী, ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করে দেবে, এই শর্তে ট্রাম্প ২৫ শতাংশ জরিমানা তুলে নিচ্ছেন। তবে ভারত ঘুরপথে হলেও রাশিয়া থেকে তেল কিনছে কি না, সে দিকে নজর রাখবে। ভারত আবার রুশ তেল কিনলেই ফের জরিমানা চাপবে। ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের পণ্যের উপরে চাপানো ২৫ শতাংশ বাড়তি শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশ করছে। অর্থাৎ, প্রথমে ট্রাম্প ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দরদাম করে তা কমিয়ে ১৮ শতাংশ করলেন।
ভারত-আমেরিকার যে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয় তাতে দেখা যাচ্ছে, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে যে প্রধান বিষয়গুলি এই সমঝোতা কাঠামোয় রয়েছে তা হল আমেরিকার সমস্ত শিল্পপণ্য, বিরাট পরিসরের আমেরিকার খাদ্য এবং কৃষিপণ্যের ওপর শুল্ক বাতিল বা হ্রাস করবে ভারত। যার মধ্যে আছে শুকনো শস্য, সয়াবিন তেল, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, পশু খাদ্য, স্পিরিটস ইত্যাদি। যেগুলির ক্ষেত্রে ভারত শুল্ক কমিয়ে দেবে বা পুরো শূন্য করবে। এছাড়া শুল্ক কমাবে জোয়ার, ড্রাই ফ্রুটস, তাজা এবং প্রক্রিয়াজাত ফল, সয়াবিন তেল, ওয়াইনের ক্ষেত্রে। কিন্তু আমেরিকা বলেছে, অন্তর্বর্তী চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন হলে তারা কিছু ভারতীয় পণ্যের উপর থেকে সম্পূর্ণভাবে শুল্ক প্রত্যাহার করবে। এরমধ্যে রয়েছে রত্ন ও হিরে, বিমানের যন্ত্রাংশ, জেনেরিক ওষুধ। মনে রাখা দরকার, ট্রাম্প রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে ভারতীয় ওষুধ রফতানির ওপরে আমেরিকা কোনও শুল্ক চাপাতো না। একইভাবে বিমানের যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রেও এক অঙ্কের শুল্ক বা শুল্কমুক্ত ভাবেই আমেরিকায় প্রবেশ করতো। ফলে আমেরিকা ভারতকে এই চুক্তির মাধ্যমে নতুন করে কোনও ‘ছাড়’ দিল, বিষয়টি তেমন নয়। চুক্তি অনুযায়ী আমেরিকা ভারতে উৎপদিত বস্ত্র ও পোশাক, চামড়া ও জুতো, প্লাস্টিক ও রাবার, জৈব রাসায়নিক, গৃহসজ্জা সামগ্রী, হস্তশিল্প পণ্য এবং কিছু যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমিয়ে ৫০ শতাংশ থেকে ১৮ শতাংশ করবে। এটা নিয়েই কেন্দ্র সরকার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে। কিন্তু আদতে এটাও করা হচ্ছে চুক্তির আগে ৫০ শতাংশ শুল্ক হারকে ধরে। কিন্তু ট্রাম্পের আগে যা প্রায় নামমাত্র ছিল, সেটার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে না। উল্লেখ্য, দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের সময়ে ভারতের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গড় শুল্ক ছিল ২.৯৩ শতাংশ।
ভারত কোন দেশ থেকে তেল কিনবে তার উপরে আমেরিকার নজরদারির শর্ত সরকার মেনে নিল। বিরোধী দল ও কৃষক সংগঠনগুলির যৌথ মঞ্চ সংযুক্ত কিসান মোর্চা চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করেছে। কৃষক সংগঠনের অভিযোগ, কেন্দ্র সরকার পশুখাদ্য হিসেবে আমেরিকার ভুট্টা থেকে সোয়াবিন, তেল, জোয়ার সহ অন্যান্য পণ্য আমদানির দরজা খুলছে। এর ফলে দেশের চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কারণ আমেরিকার কৃষিপণ্য আমদানি হলে চাষিরা দাম পাবেন না। এমনিতেই গত কয়েক বছর ধরে দেশের বাজারে সয়াবিন সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ন্যূনতম সহায়ক মূল্যেরও কম। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সয়াবিন রফতানি ছিল ৩৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন (৩ হাজার ৪৪০ কোটি) ডলার, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন (২ হাজার ৪৫০ কোটি) ডলারে। একই সময়ে ভুট্টা রফতানি ১৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন (১ হাজার ৮৬০ কোটি) ডলার থেকে কমে ১৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন (১ হাজার ৩৯০ কোটি) ডলারে নেমে এসেছে। হিমাচল প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের আপেল চাষিরা ইতিমধ্যেই নিউজিল্যান্ডের মতো দেশের সঙ্গে পূর্ববর্তী বাণিজ্য চুক্তির প্রভাব সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। নতুন এই চুক্তি তাঁদের সঙ্কট আরও বাড়াবে। একইভাবে, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও গ্রামীণ ঋণের চাপে থাকা ভুট্টা, তুলো ও সয়াবিন চাষিরা গভীর সঙ্কটে পড়বেন।
যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, ভারত আগামী পাঁচ বছরে আমেরিকা থেকে ৫০ হাজার কোটি ডলার (৪৫ লক্ষ কোটি টাকা) মূল্যের জ্বালানি, বিমান, বিমানের যন্ত্রাংশ, সোনা, প্রযুক্তি, কয়লা কিনবে।
এই চুক্তির ফলে ভারতের পুরো কৃষি ব্যবস্থা ও কৃষক এখন বিপদের মুখে। কারণ ভারতের কৃষকরা বছরে সম্মাননিধি হিসেবে মাত্র ৬০০০ টাকা পান। তাও সবাই পান না। আর আমেরিকার কৃষকরা বছরে অন্তত ৬৬,০০০ ডলার ভর্তুকি পান। তাই তাদের সাথে ভারতের কৃষকদের কোনও তুলনাই হয় না। ভারতের কৃষকরা তাদের সাথে পাল্লা দিতে পারবেন না। ভারতের কৃষকদের এখন আমেরিকার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে, সমস্ত সুরক্ষা সরিয়ে দিয়ে। দেশের কৃষকদের জন্য এটা একদম মৃত্যু পরোয়ানার সমান। চুক্তি অনুযায়ী আমেরিকা থেকে ভারতের আমদানি তিন গুণ বেড়ে যাবে। কিন্তু ভারত থেকে আমেরিকায় তথ্য-প্রযুক্তি পরিষেবা সহ পণ্য রফতানি নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে যাবে।
কৃষক সংগঠনগুলির যৌথ মঞ্চ সংযুক্ত কিসান মোর্চা এই ব্যাপারে আগেই কৃষিমন্ত্রীকে আগাম চিঠি দিয়ে সবধান করেছিল। মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রী আরও বলেন, এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আরও বেশি বৃষিপণ্য ভারতের বিশাল বাজারে রফতানি হবে, যা পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করতে এবং মার্কিন গ্রামীণ অঞ্চলে অর্থ প্রবাহ বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে। ভারতের ক্রমবর্ধমান জনসসংখ্যা মার্কিন পণ্যের জন্য একটি বড় বাজার।
আমেরিকার কথায় আমরা কোথা থেকে তেল কিনব, কতটা কিনব, চুক্তির শর্ত মানা হচ্ছে কি না তা নজরদারির ব্যবস্থা রাখা এবং বিচ্যুতি ঘটলে শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ ও ব্যবস্থার হুমকি, এই ধরনের শর্ত মেনে নেওয়া আমেরিকার কাছে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘লজ্জাজনক আত্মসমর্পণ’। এই চুক্তি দেশের সার্বভৌমত্বের সম্পূর্ণ বিসর্জন। ভারতের উপর একটা বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয় আগামী দিনে আসতে চলেছে।