ad
ad

Breaking News

India Diplomacy

মোদিজিও শেষ পর্যন্ত নেহরুর ভক্ত হয়ে গেলেন?

এবার দেখার মোদি তাঁর আরএসএসের শিক্ষা এবং সমস্ত ধরনের সীমাবদ্ধতা নিয়ে এই পথে হাঁটতে পারবেন কিনা।

India Diplomacy: Modi–Putin Meeting Sparks Debate

চিত্র: সংগৃহীত

সুমন ভট্টাচার্য: মাননীয় নরেন্দ্র মোদিজি, আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, শেষ পর্যন্ত আপনিও আমেরিকার হাত ছেড়ে রাশিয়ার হাত ধরলেন? এই শীতে আপনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, যাঁর কাছ থেকে তেল কেনার জন্য রোজ ট্রাম্প বাবু ধমক দিচ্ছেন, মার্কিন বাণিজ্য দফতরের কর্তা হুমকি দিচ্ছেন, সেই পুতিনকে একেবারে গাড়িতে পাশে বসিয়ে লাল কার্পেট পেতে অভ্যর্থনা জানালেন? এ তো আপনি নেহরু-ইন্দিরা গান্ধীর পথে হাঁটলেন। তাহলে আপনার ‘ভক্তকুল’ কী বলবে (India Diplomacy)?

আপনি যে ‘আব কি বার ট্রাম্প সরকার’ কিংবা নেতানিয়াহুর গলা জড়িয়ে ‘ইয়ে দোস্তি হাম নাহি তোড়েঙ্গে’ গাইছিলেন, সেই গানেরই বা কী হবে? তাহলে কি আপনিও জয় আর বীরুর মতো একজনকে ছেড়ে বাইক আলাদা হয়ে গেল? এবার আপনার বাইকের সঙ্গে রুশ ইঞ্জিন জুড়ে দিতে হবে? নরেন্দ্র মোদিজি, আপনার এরকম দিক পরিবর্তনে ‘ভক্তকুল’ দিশেহারা। হিন্দুদের রক্ষাকর্তা হিসেবে ট্রাম্পকে ভজনা করতে অভ্যস্ত শুভেন্দু অধিকারী হতাশ। এবারে যে আপনি কী করবেন, আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না!

এরপর যদি আপনি প্যালেস্তাইনের সমর্থনে একটা কড়া বিবৃতি দেন, তাহলে ভারতবর্ষের ইজরায়েল ভক্তকুল তো একেবারের শোকে ভেঙে পড়বে। পুতিনের পরে কি আপনি ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানকেও এভাবে নয়াদিল্লিতে এনে জাপটে ধরে ছবি তুলবেন? আমার খুব চিন্তা হচ্ছে, নরেন্দ্র মোদিজি। আমি এবং আরও অনেকে তো আপনার কথা মতো ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি রেখেই মাঝে পুজো করতে অভ্যস্ত হয়েছিলাম, কিন্তু দেখলাম বারাণসীতে, খোদ আপনার নির্বাচনী কেন্দ্রে পুতিনের ছবিতে মালা-ধূপ দিচ্ছে। তাহলে কি আমাদের ‘ঈশ্বর’ ট্রাম্প ছেড়ে পুতিন হয়ে গেলেন (India Diplomacy)?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, নরেন্দ্র মোদিজি, একজন প্রাক্তন রুশ পোল ভল্টার ছিলেন, যাঁর নাম সের্গেই বুবকা। আমরা আগে সাংবাদিকতার জীবনে কেও ডিগবাজি খেলে বলতাম, তিনি বুবকার চাইতেও বড় ডিগবাজি খেয়েছেন। কিন্তু আপনি যে ডিগবাজি খেলেন, এ তো বুবকার বিশ্বরেকর্ডকে ভেঙে দেবে। ছিলেন ‘ট্রাম্প ভক্ত’, হলেন ‘পুতিন ভক্ত’! এর আগে আপনি কত কথা বলেছিলেন দেখলাম। তারপরে আফগানিস্তানের তালিবানদের ডেকে দিল্লিতে সাংবাদিক সম্মেলন করালেন, এমনকি দেওবন্দেও পাঠিয়ে দিলেন মুসলিম শিক্ষা সংস্কৃতি জগতের জন্য (India Diplomacy)।

আপনি যে এইরকম ‘পোল ভল্ট’ মারবেন বা ‘ডিগবাজি’ মারবেন, তা কে জানত? আপনার ডিগবাজির জেরে ডলারের দাম অবশ্য বেড়েই চলেছে। কিন্তু আপনার পুরোনো বন্ধু, মানে যিনি আপনাকে ছেড়ে চলে গিয়েছেন, যাঁর বিরহে আপনি ‘দোস্ত দোস্ত না রাহা’, ‘সঙ্গম’-এর রাজ কাপুরের সেই বিখ্যাত গানটি গাইতে পারেন, সেই ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি এবার আবার ফোঁস করেন, তাহলে আপনি কী করবেন? চারদিকে এত কথা, যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেশ আমেরিকায় আপনার ‘বন্ধু’, মানে আপনার ‘ঘনিষ্ঠ সুহৃদ’ আদানিদের নামে এত মামলা চলছে, সেইসব মামলারই বা কী হবে?

বাংলার নির্বাচনের আগে আপনার এইরকম ডিগবাজি দেখে অনেকেরই ভয় করছে, এরপর না আপনি ‘সার’ বাতিল করে দেন। বলেন, জ্ঞানেশ কুমারকে আমি রাশিয়াতে বিশেষ দূত করে পাঠাচ্ছি। ভারতবর্ষের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে মস্কোতে পাঠালে আপনি ভালোই করবেন। পুতিন তাঁর দেশে নির্বাচন তুলে দিয়েছেন, ফলে ওখানে গিয়ে অন্তত জ্ঞানেশ কুমারের কোনও নির্বাচন তালিকা সংশোধন বা এইরকম কোনও বিষয়ে রুশ কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। কিন্তু আমাদের বিদেশনীতির কী হল, সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।

আপনার এহেন ডিগবাজির জেরে এখন তো আর দেশে আমেরিকা নিয়ে বিশেষ কথাবার্তাও বলা যাচ্ছে না, শুনলাম নাকি আরএসএসের সদর দফতরে রুশ ভাষা শেখানোর জন্য আলাদা লোকজন জোগাড় করতে হচ্ছে। এরকম গুজব রটা-টা কি ঠিক (India Diplomacy)?

রসিকতা ছাড়লেও এটা অস্বীকার করে লাভ নেই, নরেন্দ্র মোদি এবং জয়শঙ্কর, আপনারা গত ১১ বছরে ভারতের বিদেশনীতি যেদিকে ঝুঁকিয়েছিলেন, অর্থাৎ, যেদিকে ওয়াশিংটনের হুকুমে সকাল-বিকেল ওঠবোস করতেন এবং ইজরায়েলকেই জীবনের ধ্রুবতারা বলে বেছে নিয়েছিলেন, তাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ‘খঞ্জর’, মানে আসিফ মুনিরকে হোয়াইট হাউজে ডেকে দাওয়াত দেওয়ার পর একেবারে নরেন্দ্র মোদির পিঠে যে ছুরি ঢুকে গিয়েছিল, সেটা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এভাবে ভ্লাদিমির পুতিনকে আমন্ত্রণ না জানিয়ে হয়তো উপায় ছিল না।

আমাদের বিদেশনীতি যে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়েছে, সেটা বোঝাই গিয়েছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চিনে শীর্ষবৈঠকে যাওয়ায়, তারপরে ব্রাজিলে ‘ব্রিকস’-এর বৈঠকে চলে যাওয়ায়। এই দুটি বৈঠকে ভারতবর্ষ যোগ দেওয়ার পর থেকেই ওয়াশিংটন বিভিন্ন হুড়ুম-হাড়ুম করছিল। এই সপ্তাহে পুতিনের ভারত সফরের পর নিশ্চয়ই ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও কিছু হুমকি ছাড়বেন। আমেরিকার ‘বন্ধু’ বলে পরিচিত সুব্রহ্মানিয়াম স্বামী ইতিমধ্যেই মার্কিন মুলুকের এপস্টাইন কেলেঙ্কারির সঙ্গে মোদি সরকারের প্রাক্তন মন্ত্রী জড়িয়ে বলে যথেষ্ট জল ঘোলা করে দিয়েছেন। আমেরিকা কী করবে (India Diplomacy)?

ওয়াশিংটনের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক কতটা তিক্ত হবে, তা হয়তো ভবিষ্যৎ বলবে, কিন্তু ওয়াশিংটন যে আমাদের পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান এবং পুবের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ বা পূর্ব পাকিস্তান হতে চাওয়া ইউনুসকে জোর কদমে মদত দিয়ে চলেছে, সেই বিষয়েও কোনও সংশয় নেই। বা পুবের প্রতিবেশ দেশ, বাংলাদেশে নির্বাচন আসার আগে সেদেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপির টিকিট প্রত্যাশীরা প্রকাশ্যেই সাংবাদিক সম্মেলন করে ভারতবর্ষকে টুকরো টুকরো করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন।

আমাদের পুবের ‘সেভেন সিস্টারস’, অর্থাৎ, সাত রাজ্যকে ভাগ করে দেওয়ার হুঙ্কারও দিয়ে রেখেছে। এই পরিস্থিতি দাঁড়িয়ে হয়তো নরেন্দ্র মোদির পক্ষে সত্যিই আমেরিকার প্রতি বিশ্বাস রাখা কঠিন হয়ে হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ, কে না জানে দক্ষিণ এশিয়ায় অশান্তি তৈরি করতে আমেরিকা বা সিআইএ সদাই তৎপর।
যদি নরেন্দ্র মোদি এবং জয়শঙ্কর এটা বুঝে থাকেন, যে মস্কো আমাদের ‘পরীক্ষিত বন্ধু’, তাহলে অবশ্য ভারতের বিদেশনীতির জন্য মঙ্গল (India Diplomacy)।

যখন পুবের প্রতিবেশী দেশ, ইউনুসের দেশে মৌলবাদের উত্থান হচ্ছে, তখন আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৯৭১-এ বাংলাদেশকে স্বাধীন করার ক্ষেত্রে বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয় করার ঘটনাতেও ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। ইন্দিরা গান্ধি মস্কোকে পাশে নিয়ে সেদিন যেভাবে নিক্সন, কিসিঞ্জারদের রুখে দিয়েছিলেন, তাঁদের চোখে চোখ রেখে কথা বলেছিলেন, অবশ্যই সেই সাহস নরেন্দ্র মোদি বা জয়শঙ্কররা এখনও দেখাতে পারেননি।

সেই না দেখানোর পিছনে মার্কিন মুলুকে চলতে থাকা আদানিদের বিরুদ্ধে মামলা বা এপস্টাইন বিতর্কে মোদি সরকারের প্রাক্তন মন্ত্রীর নাম জড়িয়ে যাওয়া কতটা তাৎপর্যপূর্ণ, তা আমরা জানি না। কিন্তু আমেরিকার উপর নির্ভর করতে গিয়ে নরেন্দ্র মোদি-জয়শঙ্কররা ভারতের বিদেশনীতিকে যতটা ডুবিয়ে ছিলেন, প্যালেস্তাইন প্রশ্নে যতটা ইজরায়েলের যতটা নির্লজ্জ সমর্থন করেছিলেন, তা ইতিহাসে লেখা রয়েছে এবং থাকবেও (India Diplomacy)।

সেই ভূমিকা থেকে সরে এসে ইরানের সঙ্গে বন্ধুত্ব বাড়ানোর জন্য খোলা চিঠি লিখেছিলেন স্বয়ং সোনিয়া গান্ধি। সেই চিঠির পরে ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনেও কথা বলেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। মোদি-জয়শঙ্কররা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন ওয়াশিংটনের দিকে অন্ধভাবে ঝুঁকে থাকলে কী হতে পারে? সেই কারণেই গত ছয় মাসে ভারতবর্ষের বিদেশনীতি বদলেছে। সেই বিদেশনীতির বদল ঘটিয়ে যদি এখন দেশের রাজনীতিতেও মোদি-অমিত শাহরা মুসলিম বিদ্বেষ কমান এবং বিরোধীদেরকে রাজনৈতিক পরিসর দিতে থাকেন, তাহলে ভারতবর্ষের গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে।

নেহরু সোভিয়েত ইউনিয়নের বন্ধু ছিলেন, ইন্দিরা গান্ধিও মস্কোর সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করতেন। কিন্তু তাঁরা কোনওদিন ভারতবর্ষের গণতন্ত্রকে ফ্যাসিবাদে পরিণত হয়ে যেতে দেননি। ইন্দিরার ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করাকে সবসময়ই সমালোচনা করা হয়ে থাকে। কিন্তু আজকের ভারতবর্ষে মোদি-জয়শঙ্কর-অমিত শাহরা যে একনায়কতন্ত্র বা ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চাইছেন, সেটা কাম্য নয়। যদি তাঁরা সত্যি সত্যি নেহরুর রাজনীতিতে ফেরেন, তাহলে মস্কোর বন্ধু হওয়া আর আমেরিকার মতো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করাটাই দেশের লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে। এবার দেখার মোদি তাঁর আরএসএসের শিক্ষা এবং সমস্ত ধরনের সীমাবদ্ধতা নিয়ে এই পথে হাঁটতে পারবেন কিনা (India Diplomacy)।