ad
ad

Breaking News

Human memory

একমাত্র ইন্দ্রিয় অনুশীলনেই উন্নত হতে পারে মানুষের স্মৃতি, চিন্তা ও বুদ্ধিমত্তা

শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত বহির্বিশ্ব সম্পর্কে কোনও ধারণাই তার থাকে না। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর এক এক করে বাইরের জগৎ থেকে সে তথ্য আহরণ করা শুরু করে।

Human memory, thinking and intelligence can be improved by exercising only one sense

Bangla Jago Desk,কাজল ব্যানার্জি: শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত বহির্বিশ্ব সম্পর্কে কোনও ধারণাই তার থাকে না। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর এক এক করে বাইরের জগৎ থেকে সে তথ্য আহরণ করা শুরু করে। এ কাজে তাকে সঙ্গ দেয় তার ইন্দ্রিয়। চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক– এই পঞ্চেন্দ্রিয়ের সাহায্যেই সে তথ্য সংগ্রহ করে এবং মস্তিষ্কের স্মৃতিভাণ্ডারে জমা রাখে। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী স্মৃতি ভাণ্ডার থেকে সেই তথ্যকে মস্তিষ্কের সক্রিয় বা সচেতন অংশে তুলে এনে সেই সব তথ্যের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করে। কম্পিউটারের ক্ষেত্রে যেমন কিছু ইনপুট ডিভাইসের (কিবোর্ড, মাউস, স্ক্যানার, পেন ড্রাইভ, ডিস্ক ইত্যাদি) মাধ্যমে কম্পিউটারের মধ্যে বহির্জগতের তথ্য প্রবেশ করার পর তথ্য ভাণ্ডার বা ডিস্কে জমা থাকে এবং প্রয়োজন অনুসারে সেই তথ্যকে ডিস্ক থেকে RAM-এ নিয়ে আসা হয় এবং প্রসেসর সেই তথ্যের প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে ফলাফলকে আউটপুট ডিভাইসে (প্রিন্টার, মনিটর, পেন ড্রাইভ, ডিস্ক ইত্যাদি) পাঠিয়ে দেয়–ঠিক তেমনই মানব মস্তিষ্কের ক্ষেত্রেও এই প্রক্রিয়ার অন্যথা ঘটে না। তাই আমাদের এই পঞ্চেন্দ্রিয়কে আমরা তথ্য আহরণের ক্ষেত্রে আমাদের ইনপুট অর্গান বলতেই পারি। কারণ এগুলি ব্যতিরেকে অন্য কোনও পথে বহির্জগতের কোনওপ্রকার তথ্য আমাদের মস্তিষ্কে প্রবেশ করা সম্ভব নয়।

[আরও পড়ুনঃ Howrah: হাওড়ায় গুলিবিদ্ধ যুব তৃণমূল নেতা! কী ঘটেছিল শিবপুরে দলীয় কার্যালয়ের সামনে?

একটি কম্পিউটারকে আমরা তখন উচ্চমানের বলে থাকি যখন সেটির দ্বারা খুব দ্রুত কাজকর্ম সম্পাদন করা যায়। এক্ষেত্রে কাজকর্ম বলতে তথ্যগ্রহণ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ ও ফলাফল প্রদানকেই বলা হয়ে থাকে। তাই স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে, আমাদের জীবনকে উন্নত করতে করতে হলে অনেক বেশি পরিমাণে প্রাসঙ্গিক এবং প্রয়োজনীয় তথ্যকে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে আহরণ করতে হবেস্মৃতিভাণ্ডারে সংরক্ষণ করতে হবে এবং সঠিক সময়ে দ্রুত সেগুলিকে মস্তিষ্কের সক্রিয় অংশে পুনরুদ্রেকের মাধ্যমে দ্রুত প্রক্রিয়াকরণের দ্বারা পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

আমরা শৈশব থেকে যে শিক্ষা গ্রহণ করি তাতেও একই প্রক্রিয়া কার্যকর হয়। বিখ্যাত দার্শনিক ফ্রয়েবল তাই শিক্ষা এবং স্মৃতিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য শিক্ষার কথা বলেছেন। এক্ষেত্রে যদি কেউ শুধু শ্রবণেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে শুনে তথ্য আহরণ করেন তার থেকেও দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি তৈরি হবে যদি বিষয়টি শোনার পাশাপাশি দেখে, ঘ্রাণ গ্রহণ করে, স্পর্শ করে বা সম্ভব হলে স্বাদ গ্রহণ করে বিষয়টি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। অর্থাৎ, যত বেশি সংখ্যক ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তথ্য আমাদের মধ্যে প্রবেশ করবে সেটি তত বেশি স্থায়ী হবে। ফ্রয়েবলের এই তত্ত্ব থেকেই পরবর্তী সময়েটিচিংলার্নিংমেটেরিয়ালবা শিক্ষা সহায়ক উপকরণের ধারণা এসেছে। তবে তথ্য সংগ্রহ এবং সেটিকে যথাস্থানে সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে মস্তিষ্কেরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নতুন গৃহিত তথ্যটি পূর্বের কোনও তথ্যের অনুরূপ বা সাদৃশ্যযুক্ত সেটির সঙ্গে সংযোগ সাধন করে অথবা একটিকে গ্রহণ করে অন্যটিকে বর্জন করে তথ্যটিকে যথাস্থানে সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই পারস্পারিক আদান প্রদানের মাধ্যমেযে শিক্ষা সম্পন্ন হয় তা দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং দ্রুত পুনরুদ্রেকের ক্ষেত্রে অন্য মাত্রা পায়।

[আরও পড়ুনঃ ভুয়ো কলে অতিষ্ট? প্রতিরোধে নতুন ব্যবস্থা চালু করলো ভারত সরকার

এক্ষেত্রে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে মানুষের ‘মেধাশক্তি’-কে আজ পর্যন্ত সঠিক ভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়নি। কেউ খুব বেশি স্মৃতিধর হলেই তাঁকে মেধাবী বলা যায় না। আবার নির্দিষ্ট কোনও কাজবামানসিক প্রক্রিয়া খুব সম্পন্ন করতে পারলেও তাঁকে মেধাবী বলা যায় না। যেমন বীজগাণিতিক সমস্যাকে দ্রুত সাফল্যের সঙ্গে সমাধান করতে পারাটা অবশ্যই একটি দক্ষতা কিন্তু এটিও মেধার পরিচয় নয়। তাই অধিকাংশ চাকরির পরীক্ষায় মেধা যাচাইকালে বীজগাণিতিক সমস্যা দেওয়া হয় না। আসলে পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে তথ্যভাণ্ডার বা স্মৃতিতে রক্ষিত কোটি কোটি তথ্যের মধ্যে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় তথ্যটিকে বা তথ্যাবলিকে দ্রুত পুনুরুদ্রেক করে, দ্রুত প্রক্রিয়াকরণের দক্ষতাকে মেধার অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলা যেতে পারে।

তবে এই সংজ্ঞানুযায়ী দ্রুত গতির কম্পিউটার বা রোবটকেও মেধাবী বলতে হয়। তাই এই সংজ্ঞাতেও মেধাকে সঠিকভাবে প্রকাশ করা যায় না। আসলে এসবের পাশাপাশি রয়েছে মানুষের কল্পনা শক্তি এবং আবেগ যা মেশিনের নেই। আর কল্পনা শক্তিই এবং আবেগই হল সৃষ্টিশীলতার চাবিকাঠি। নতুন যেকোনও উদ্ভাবন কল্পনাশক্তি ও আবেগ ছাড়া হতে পারে না। কল্পনার দ্বারা মানুষ নিজের মস্তিষ্কে যে মডেলবাপ্রকল্প তৈরি করে সেটিকে আবেগতাড়িত শক্তিতে যৌক্তিক বোধের আলোতে পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বারংবার যাচাই করতে করতে যখন সেটি সঠিক প্রতিপন্ন হয় তখন সেটি সফল উদ্ভাবন হিসাবে বিবেচিত হয়। আবার এই কল্পনা হল বহির্জগৎ থেকে সংগৃহীত ধারণাগুলির ছোট ছোট কিছু টুকরো, ধারণার বর্জিত বা পরিত্যক্ত অংশ ও অবদমিত অংশের এলোমেলো বিন্যাস ও সমবায়ে তৈরি কিছু অবাস্তব অথবা নতুন ধারণার মণ্ড। অন্য প্রক্রিয়াগুলির মধ্যে কিছু যান্ত্রিকতা থাকলেও এই কল্পনাশক্তি প্রতিটি মানুষের একান্তই ব্যক্তিগত। কোনও ধরনের উদ্দীপক বা রাসায়নিকের দ্বারা মস্তিষ্কের কল্পনার গতিপ্রকৃতিকে প্রভাববিত করা গেলেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই পূর্বোক্ত সকল বিষয়গুলিকে মেধার ক্ষেত্রে এক-একটি উপাদান বলা যেতে পারে মাত্র।

আবার লাইব্রেরিতে অনেক বই থাকলে লাইব্রেরিটি একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি হিসাবে বিবেচিত হয় কিন্তু সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকলে বইটি খুঁজে পেতে বিলম্ব হতে পারে। ঠিক একই ভাবে যাঁরা অনেক বিষয়ের চর্চা করে থাকেন তাঁদের ক্ষেত্রেও মস্তিষ্কের স্মৃতিভাণ্ডার থেকে প্রয়োজনীয় যথাযথ তথ্যটিকে পুনরুদ্রেক করতে সময় লাগতে পারে যদি এর জন্য মস্তিষ্কের অ্যালগরিদম যথাযথ না থাকে। সেই অ্যালগরিদম আবার তৈরি হয় যৌক্তিক বোধ থেকে। পাশাপাশি সময়ের সঙ্গে কিছু তথ্য বর্জন এবং নতুন তথ্য গ্রহণ করে সেই স্থলে সংরক্ষণ করাটাই জরুরি। কারণ মানব মস্তিষ্কের ধারণ ক্ষমতার একটি সীমা রয়েছে। মানব মস্তিষ্কের তথ্য ধারণ ক্ষমতা হল২.৫ পেটাবাইট বা ২.৫ মিলিয়ান জিগাবাইট। একটানা আট বছর নিরবচ্ছিন্ন ভাবে চলবে এমন একটিফুলএইচডিভিডিয়োস্টোর করতে হলে যেমন জায়গার প্রয়োজন, ঠিক ততটা স্মৃতিভাণ্ডারই হল ২.৫ পেটাবাইটের সমতুল।

যাইহোক, বহির্জগতের তথ্যই মানুষের স্মৃতিভাণ্ডার গঠন করে তারই আদানপ্রদান ও বিন্যাস-সমবায়ে তৈরি হয় নতুন ধারণা। আবার ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই এইসকল তথ্য আমাদের মস্তিষ্কে প্রবেশ করার সুযোগ পায়। উন্নত মানুষ তৈরিতে তাই ইন্দ্রিয়ের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এবং এই কারণেই কারও একটি ইন্দ্রিয় না থাকলে অপর ইন্দ্রিয়গুলি আরও বেশি সচল হয়ে সেই খামতি পূরণ করে দেয়। অতএব আত্মোন্নয়নের জন্য প্রতিদিন সকালে অন্তত কিছুটা সময় অন্তত ইন্দ্রিয়ের অনুশীলন প্রয়োজন। যা আমাদের পূর্বের সাধক ও মহাপুরুষেরা ধ্যানের মাধ্যমে সম্পন্ন করতেন। জীবনের দৈনন্দিন কাজকর্মে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কিছু ইন্দ্রিয়ের অনুশীলন হয়েই যায়।

কিন্তু সব ইন্দ্রিয়ের অনুশীলন ঘটে না। আপনি বিভিন্ন ঘটনাকে স্মরণ করেন কিন্তু কোনও গন্ধ বা স্বাদকে স্মরণ করেন খুব কম সময়েই। তাই যদি ইন্দ্রিয়ের প্রকৃতি অনুশীলন করতে চান, তাহলে ধ্যানস্থ হয়ে প্রথমেমনে মনে একটি দৃশ্যকে স্মরণ করুন। ঘরে বসেই চোখবুজে সমুদ্র দর্শন করতে পারেন। সেই দৃশ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলুন। এরপর স্মরণে আনুন কারও কণ্ঠস্বর, পাখির ডাক বা কোনও গানকে। গানটিকে স্মরণ করে প্রতিটি যন্ত্রের শব্দকে আলাদা ভাবে শুনতে চেষ্টা করুন। কল্পনায় না পারলে আগে গান চালিয়ে প্রতিটি সহযোগী যন্ত্রের শব্দকে আলাদাভাবে চিনতে শিখুন।

এরপর কল্পনায় একটু সুগন্ধী দ্রব্যের ঘ্রাণকে স্মরণে এনে তা গ্রহণ করুন অতঃপর একটি দুর্গন্ধী দ্রব্যের ঘ্রাণও একই ভাবে অনুশীলন করুন। এরপর জিহ্বায় বিভিন্ন স্বাদকে(মিষ্টি, টক, ঝাল, নোনতা, তেতো) স্মরণ করুন উপভোগ করুন। সবশেষে আপনার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষত নিম্নভাগের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের চামড়ায় কাতুকুতু, সুচফোটানো,ম্যাসাজ ইত্যাদি নানা স্পর্শজনিত অনুভুতিকে স্মরণ করুন। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে অনুভুতি দিয়ে রক্ত সঞ্চালন করুন। সঠিকভাবে প্রতিদিন ইন্দ্রিয় অনুশীলন করতে পারলে কিন্তু আপনার জীবনের উত্তরণ অবশ্যম্ভাবী।