চিত্রঃ সংগৃহীত
Bangla Jago Desk: জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ এই নিয়েই সুন্দরবনবাসীর জীবন। গত কয়েক মাসে সুন্দরবনের লোকালয়ে বাঘ-মানুষ সংঘাত দেখা গিয়েছে বারবার। গত তিন মাসে ১২ বার সুন্দরবন সংলগ্ন গ্রামে হানা দিয়েছে দক্ষিণ রায়।
ফেব্রুয়ারি মাসে মৈপীঠ-এর নগেনাবাদ গ্রামে ঢুকে পড়া বাঘ কীভাবে গ্রামবাসী ও বনকর্মীদের নাকাল করে ছেড়েছিল তা আমরা সংবাদ মাধ্যমে দেখেছি ও পড়েছি। পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে যেখানে জঙ্গলের খুব কাছে মানুষ বসবাস করে, সেখানেই মানুষ-পশু সংঘাত কমবেশি ঘটে থাকে। তেমনই বাঘ ও মানুষের লড়াই সুন্দরবন এলাকায় নিত্যদিনের ঘটনা।
সুন্দরবনের নামখানা, পাথরপ্রতিমা, কুলতলি, কানিং ১, বাসন্তী, গোসাবা ব্লকগুলি একদম জঙ্গল লাগোয়া এলাকা। এই ব্লকগুলিতে বসবাসকারী বেশিরভাগ মানুষকে প্রতিদিন জীবিকার তাগিদে জঙ্গলে প্রবেশ করতে হয়। একেবারে জঙ্গল লাগোয়া না হলেও সাগর, কাকদ্বীপ, মথুরাপুর ২, জয়নগর ২, হাসনাবাদ, সন্দেশখালি ১ ও ২ নম্বর ব্লকের মানুষকে আজও জঙ্গলের ওপরেই নির্ভর করতে হয়।
এই রোজকার জঙ্গল নির্ভরতাই সুন্দরবনে বাঘ-মানুষ সংঘাতের প্রধান কারণ। মাঝে মধ্যে শোনা যায়, কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বাঘের কামড়ে মৎস্যজীবীর মৃত্যু বা বাঘ জঙ্গলে টেনে নিয়ে গেল মৎসজীবীকে। এদের মধ্যে অধিকাংশ মৎস্যজীবীরই জঙ্গলে ঢোকার বৈধ অনুমতি পত্র থাকে না। এরা অবৈধভাবে জঙ্গলে প্রবেশ করে।
সুন্দরবনের অসংখ্য ছোট বড় খাঁড়ি পথে ছোট নৌকা নিয়ে মানুষ মাছ বা কাঁকড়া ধরতে গভীর জঙ্গল বা তার আশেপাশে চলে যাচ্ছে, এদের ওপর নজরদারি করার মতো সরকারি পরিকাঠামো নেই। যারা সরকারি অনুমতি নিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করেন, তাঁদেরকেও অনেক সময় বিপদের মুখোমুখি হতে হয়।
মৎস্যজীবীর পেশা ছাড়াও সুন্দরবনের বহু মানুষ মধু সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এদের স্থানীয় ভাষায় মৌলি বলে। অত্যন্ত দরিদ্র এই মানুষগুলি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করে মধু ও মোম সংগ্রহ করেন।
বহু মৌলি প্রতি বছর বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান। আর এক ধরনের কাজের মাধ্যমে সুন্দরবনের জঙ্গল সংলগ্ন দ্বীপগুলির দরিদ্র মানুষ জীবিকা অর্জন করেন, তা হল জঙ্গল থেকে কাঠ সংগ্রহ করা। এদের স্থানীয় ভাষায় বাউলে বলা হয়। তবে যেহেতু এখন জঙ্গলে গাছ কাটা নিষিদ্ধ তাই এই পেশায় যুক্ত মানুষের সংখ্যা অনেক কমে গেছে।
সুন্দরবন এলাকার বহু মানুষ এখন কাজের খোঁজে ভিন রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছে। নিজের গ্রামে কাজ না পেয়ে পরিণত হচ্ছে পরিযায়ী শ্রমিকে। সম্প্রতি একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের ৮ লক্ষ মানুষ এখন কর্মসূত্রে রাজ্যের বাইরে রয়েছেন। লকডাউনের সময় বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত এই পরিযায়ী শ্রমিকরা কাজ হারিয়ে দলে দলে গ্রামে ফিরে আসে ও পেটের দায়ে মাছ ধরতে অথবা মধু সংগ্রহ করতে অবৈধভাবে জঙ্গলে প্রবেশ করতে শুরু করে।
অথচ এদের কারও জঙ্গলে ঢুকে মাছ ধরা, মধু সংগ্রহ বা কাঠ সংগ্রহ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। তাই এদের অনেককেই বাঘের হামলায় প্রাণ হারাতে হয়েছে। সুন্দরবনে মানুষ-পশু সংঘাতের অন্য একটি দিক হল, অনেক জায়গাতেই মানুষের বসতিযুক্ত দ্বীপগুলিতে জঙ্গলের পশুর ঢুকে পড়ার প্রসঙ্গ। এক্ষেত্রে বাঘের কথাটি সর্বাধিক গুরুত্ব সহকারে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত ও আলোচিত হয়।
তবে সুন্দরবনের বাঘ লোকালয়ে ঢুকে প্রায় মানুষ মারে, এমন ধারণা অতি সরলীকরণের যাবে। গত ৩০ বছরে ঘটা ১০০টি ঘটনার মধ্যে মাত্র ৪ বার সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে গ্রামের মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই ৪ টি ঘটনার ঘটেছে ১৯৯০ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে সামশেরনগর গ্রামে।
তবে সাম্প্রতিক কালে সুন্দরবন সংলগ্ন গ্রামগুলিতে বাঘ ঢুকে পড়ার ঘটনা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। কিন্তু এর কারণ কী? শুধুই কি খাবারের খোঁজে বাঘ লোকালয়ে প্রবেশ করছে? নাকি জঙ্গলে তার থাকার জায়গা ক্রমশ কমে আসছে। পরিবেশবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক প্রাণী সুন্দরবনের জঙ্গল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।
যার ফলে খাবারের খোঁজে বাঘকে জঙ্গলের বাইরে আসতে হচ্ছে। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য আমাদের রাজ্যকে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে আগলে রাখে। গত কয়েক বছরে আয়লা, বুলবুল, ইয়াস, আমফানের মতো ঘূর্ণিঝড় নাড়িয়ে দিয়ে গেছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্যকে।
সুন্দরবনের সাধারণ মানুষের দাবি, শুধু ঘূর্ণিঝড় নয়, জঙ্গল কেটে মাছের ভেড়ি তৈরি এবং বেলাগাম কাঠ পাচার ক্ষতিগ্রস্ত করছে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যকে। সুন্দরবন অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ বেহাত হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। একসময় ইংরেজরা সুন্দরবন অঞ্চলকে মানুষের বসবাসযোগ্য করে তুলতে যথেচ্ছ বন্যপ্রাণী নিধন ও অরণ্যছেদন করেছে। ১৮৫২ সালে সুন্দরবনে যারা বাঘ শিকার করতো, তাদের পুরস্কার মূল্য ৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা করা হয়েছিল।
[আরও পড়ুন: প্রেমিকের সঙ্গে মিলে স্বামীকে হত্যার পরিকল্পনা! ভাগ্যের পরিহাসে খুন তরুণী]
১৮৬০ সালে পুরস্কারের মূল্য বাড়িয়ে করা হয়েছিল বাঘ প্রতি ২০ টাকা। পরিষ্কারভাবে বোঝা দরকার, মানুষের বসবাসের আগে পুরো সুন্দরবন অঞ্চল জুড়েই ছিল পশুদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। তাই আজকের এই মানুষ-পশু সংঘাতের প্রধান কারণ মানুষই। পশুদের ভূমিকা এখানে শুধুমাত্র অস্তিত্ব রক্ষার।
সুন্দরবনকে বাঁচাতে হলে পশুদের নিরাপত্তা যেমন সুনিশ্চিত করতে হবে, তেমন সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষেরও নিরাপত্তা সুনিচিত করতে হবে। সুন্দরবনবাসীর জীবন-জীবিকা সুরক্ষিত রাখতে যা যা জনকল্যাণমূলক প্রকল্প আছে, তা যাতে তাদের কাছে ঠিকমতো পৌঁছয়, সেদিকে নজর দিতে হবে।
যাতে ভবিষ্যতে সুন্দরবন এলাকার মানুষকে জীবিকার প্রয়োজনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর জঙ্গলে মাছ বা কাঁকড়া ধরতে যেতে না হয়। প্রয়োজনে এ বিষয়ে সরকারি ভাবে অতিরিক্ত উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তা হলেই বাঁচবে সুন্দরবন, বাঁচবে সুন্দরবনের জৈব সম্ভার ও সুন্দরবনের মানুষ।