চিত্রঃ সংগৃহীত
এমএ নাসের: উনবিংশ শতাব্দীর মহান জনহিতৈষী, দানবীর, শিক্ষানুরাগী হাজি মুহাম্মদ মহসিন সাহেব পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার হুগলি শহরের বণিক পরিবারে ১৭৩২ সালের ১ আগস্ট ধরাভূতিতে পদার্পণ করেন। পিতা হাজি ফৈজুল্লাহ পারসিক বণিক, মাতা জয়নাব খানম। শৈশবে প্রথমে কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা আরম্ভ হয়নি। ১৭৪২ সালে পারসিক পণ্ডিত সিরাজির সমীপে আরবি ও ফারসি ভাষাচর্চার সূচনা হয়। উল্লেখ্য, আগা মুহাম্মদ মোতাহার জীবিত অবস্থায় তার সমুদয় স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির মালিকানা তনয়া মন্নুজান খানমকে দানপত্র করে দেন। ভগ্নি মন্নুজান খানম মহসিন একত্রে বিদ্যাশিক্ষায় মনোযোগী ছিলেন। তিনি ইসলাম ধর্মের শিক্ষা অর্জন করেন (Haji Mohsin)।
সিতারা বাজানোর প্রশিক্ষক ছিলেন সঙ্গীতশিল্পী ভোলানাথ পণ্ডিত। এছাড়া আমির খসরুর চার তার যুক্ত বাদ্যযন্ত্র সিতারা বাজানোর তালিম নেন। তাঁর হস্তলিখিত মোট ৭২টি কুরআন শরিফের মধ্যে একটি হুগলি মহসিন কলেজের পাঠাগারে রক্ষিত আছে। ১৭৫৪ সালে ভগ্নি মন্নুজান খানমের স্বামী মির্জা সালাউদ্দিনের অকাল প্রয়াণে ভগ্নি বিধবা হন। নিঃসন্তান ভগ্নি মন্নুজান খানমের পিতা ও স্বামী কর্তৃক অর্জিত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ভ্রাতা মহসিনের নামে দানপত্র করে দেন। ১৭৬২ সালে মহসিন দেশ ভ্রমণে বেরিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে সফর করে মক্কা ও মদিনায় হজ্জব্রত পালন করে ‘হাজি’ উপাধি লাভে ধন্য হন। ১৭৮৯ সালে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৮০৩ সালে ভগ্নির অকালমৃত্যু হয়। ভগ্নির মৃত্যুর পর ১৮০৬ সালের ২০ এপ্রিল মহসিন সাহেব তাঁর সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সুনির্দিষ্ট দলিলের মাধ্যমে ওয়াকফ করে দেন। উক্ত সম্পত্তি হুগলি, দুই ২৪ পরগনা, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান এবং বর্তমান বাংলাদেশের যশোহর, খুলনা, চট্রগ্ৰাম, ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বিস্তৃত (Haji Mohsin)।
আরও পড়ুন: Monsoon Alert: তিন দিন টানা ঝড়বৃষ্টি! পাহাড় থেকে সমতলে জারি সতর্কতা
হুগলি ইমামবাড়া, যশোহরে মুরলি ইমামবাড়া, হুগলি কারবালা, বড়ো ইমামবাড়া, সৈয়দ কারামত আলির সমাধি, ঘোলঘাট, জুবিলি সেতু, পুলিশ লাইন, ইমামবাড়া, হুগলি মাদ্রাসা, হুগলি মহসিন কলেজ, কলেজ গ্ৰন্থাগার, হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুল, হুগলি কলেজিয়েট স্কুল, ইমামবাড়া সদর হাসপাতাল, জল সরবরাহ প্রকল্প। শিক্ষাব্রতী মানদণ্ডে বর্তমান বাংলাদেশের যশোহর শহরে মহসিন বালিকা বিদ্যালয়, মহসিন মহিলা কলেজ, হাজি মহসিন কলেজ, (চট্রগ্ৰাম), মহিপুর পাঁচবিবি মহসিন সরকারি স্কুল, হাজি মহসিন মহিলা কলেজ, হাজি মহসিন হল, (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), হাজি মহসিন রোড, (খুলনা), মহসিন রোড, (যশোহর), মহসিন দাতব্য চিকিৎসালয়, (দিখলিয়া), মন্নুজান হল, (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়), মন্নুজান ছাত্রী নিবাস, (খুলনা), মহসিন শিক্ষা তহবিল, (বাংলাদেশ), মহসিন বৃত্তি প্রভৃতি তাঁরই অর্থ সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত (Haji Mohsin)।
এই অমর দানবীর ১৮১২ সালের ২৯ নভেম্বর পরলোকে পাড়ি দেন। হাজি মুহাম্মদ মহসিন সাহেবের অকৃত্রিম দানের অন্যতম সেরা ফসল হুগলি মহসিন কলেজ। এটি ১৮৩৬ সালের ১ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা দানবীর ও শিক্ষা জগতের প্রাণপুরুষ মহসিন সাহেবের অকৃত্রিম প্রেরণায়। যাত্রা শুরু হয় নতুন হুগলি কলেজ নামে। দেশ-বিদেশের বহু বিখ্যাত ব্যক্তির নাম সংযুক্ত আছে-এই কলেজের প্রাক্তনী হিসেবে। হুগলি মহসিন কলেজের বিখ্যাত প্রাক্তনীরা হলেন কানাইলাল দত্ত, প্রমথনাথ মিত্র, গিরিশচন্দ্র বসু, ব্রক্ষবান্ধব উপাধ্যায়, হরচন্দ্র ঘোষ, মুজাফফর আহমদ, জ্যোতিষ চন্দ্র ঘোষ, দেবেন্দ্রনাথ মল্লিক, শিবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ভূপতি মজুমদার, চারুচন্দ্র রায়, শ্যামল মিত্র, বিজ্ঞানী উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী, রসময় মিত্র, বিভূতিভূষণ সেন-সহ আরও অনেকে। হুগলি মহসিন কলেজ, ল’ সেকশনের নয়া নামকরণ করা হয়েছে ‘গভর্নমেন্ট সেন্টার অফ লিগ্যাল এডুকেশন’। তিনি হুগলি জেলা কেবল নয়, দুই বাংলা তথা দেশের গর্ব। বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার গাইড লাইন হিসেবে এই সিদ্ধান্ত (Haji Mohsin)।
Bangla Jago fb page: https://www.facebook.com/share/1HiWhGmAnH/
সরকারি আইন শিক্ষা কেন্দ্রটি ২০২১ সালের ২৯ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র সরকারি ল’ কলেজটি পূর্বে হুগলি মহসিন কলেজ, আইন বিভাগ নামে বহুল পরিচিত ছিল। কলেজটি এখনও হুগলি জেলাশাসক দফতরের অদূরে চুঁচুড়ায়। ১৮৫৩ সালে নিউ হুগলি কলেজে আইন কোর্স চালু হয়েছিল। বর্তমানে হুগলি মহসিন কলেজ নামে কলেজের অভ্যন্তরে। অতীতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিগ্রি প্রদান করার ব্যবস্থা ছিল। ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এর সঙ্গে সংযুক্ত হয়। ১৯৬০ সালে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় জন্মলগ্নে কলেজটি এর অন্তভূক্ত হয়। যদিও আইন কোর্স সাময়িক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অতঃপর ১৯৭৮ সালে পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছিল। এশিয়ার প্রাচীন আইন কলেজ নামে ব্যাপক সমাদৃত। হুগলি মহসিন কলেজ, ল’ সেকশনের বিখ্যাত প্রাক্তনীরা হলেন সৈয়দ আমির আলি, বঙ্কিম চন্দ্র চট্রোপাধ্যায়। কলকাতা হাইকোর্ট-এর বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ, প্রসেনজিৎ বিশ্বাস, পার্থসারথি চ্যাটার্জী, সুগত মজুমদার, সুপ্রতিম ভট্রাচার্য, ড. অজয় মুখার্জী, বিভাস পট্টনায়েক, ওম নারায়ণ রায়-সহ আরও অনেকে (Haji Mohsin)।