চিত্রঃ সংগৃহীত
ড. রাম কৃষ্ণ সেন (লেখক— শিক্ষক এবং সাউথ এশিয়ান ইনস্টটিউট অফ অ্যাডভান্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এর ফেলো মেম্বার): উন্নয়ন যখন ধ্বংসের ভাষা হয়ে ওঠে
উন্নয়ন শব্দটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অথচ সবচেয়ে বিপজ্জনক ধারণাগুলির একটি। রাস্তা, বন্দর, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র-এই দৃশ্যমান অবকাঠামোই আজ উন্নয়নের প্রধান মাপকাঠি হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই উন্নয়নের খতিয়ানে প্রকৃতি, মানুষ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যে মূল্য চোকাতে হয়, তার হিসেব সচেতনভাবে আড়াল করা হয়। ভারতে এই প্রবণতা নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এটি আরও স্পষ্ট, আরও প্রাতিষ্ঠানিক এবং আরও প্রশ্নহীন হয়ে উঠেছে। আরাবল্লী পাহাড়ের সংজ্ঞা বদলে খননের পথ খুলে দেওয়া, হিমালয়ে পরিবেশগত সতর্কতা উপেক্ষা করে অবকাঠামো বিস্তার, পশ্চিমঘাটে পরিবেশ আইন শিখিল করা— এই সমস্ত সিদ্ধান্ত একত্রে একটি নির্দিষ্ট উন্নয়ন দর্শনের ইঙ্গিত দেয়। এই ধারাবাহিকতার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রকাশ আজ ঘটতে চলেছে গ্রেট নিকোবর দ্বীপে। মূল ভূখণ্ড থেকে বহু দূরে, গণমাধ্যমের আলো ও নাগরিক সমাজের নজরের বাইরে, উন্নয়নের নামে একটি সম্পূর্ণ দ্বীপের পরিবেশ, ভূগোল ও মানব সমাজকে আমূল বদলে দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে। এটি কেবল একটি প্রকল্প নয়; এটি রাষ্ট্র ও কর্পোরেট শক্তির যৌথ উদ্যোগে সংঘটিত একটি পরিকল্পিত পরিবেশগত ধ্বংস-একটি ইকোসাইড। ইকোসাইড বলতে পরিবেশের এমন ব্যাপক ও গুরুতর ধ্বংসকে বোঝায়, যার ফলে কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র দীর্ঘমেয়াদি বা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেখানে মানুষসহ অন্যান্য জীবের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত বা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। যেমনভাবে ‘জেনোসাইড’ মানুষের গণহত্যাকে নির্দেশ করে, তেমনি ‘ইকোসাইড’ শব্দটি প্রকৃতির ধ্বংস বা বাস্তুতন্ত্রের হত্যাকে বোঝায়। ব্যাপক বন উজাড়, শিল্প ও খনন কার্যকলাপের কারণে ভূমি ও জলসম্পদের ক্ষতি, নদী ও সমুদ্র দূষণ, পারমাণবিক পরীক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট পরিবেশগত বিপর্যয়— এ সবই ইকোসাইডের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ইকোসাইডের ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়, জীববৈচিত্র্য হ্রাস পায় এবং খাদ্য ও জল সংকটের মতো মানবজীবনকেন্দ্রিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। যদিও এখনও আন্তর্জাতিকভাবে ইকোসাইডকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে পূর্ণ স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, তবুও পরিবেশবিদ ও আন্তর্জাতিক মহলে এটিকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের মতোই গুরুত্ব দিয়ে দেখার দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।
গ্রেট নিকোবর দ্বীপ— ভৌগোলিক দূরত্ব ও নীরবতার রাজনীতি
গ্রেট নিকোবর দ্বীপ ভারতের দক্ষিণতম প্রান্তে অবস্থিত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ। ভৌগোলিকভাবে এটি বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের সংযোগস্থলের কাছে, প্রায় ৬০-৭ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ ও ৯৩০-৯৪ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। দ্বীপটি ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের খুব কাছাকাছি হওয়ায় এর ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গ্রেট নিকোবর দ্বীপ ঘন ক্রান্তীয় চিরসবুজ অরণ্যে আবৃত এবং এখানকার উপকূলভাগে ম্যানগ্রোভ বন, প্রবাল প্রাচীর ও সমৃদ্ধ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র দেখা যায়। ভূপ্রাকৃতিক দিক থেকে দ্বীপটি পাহাড়ি ও ঢেউ খেলানো ভূমির অধিকারী, যেখানে নিকোবর পর্বতমালা বিস্তৃত রয়েছে এবং মাউন্ট খুইলার দ্বীপটির সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হিসেবে পরিচিত। ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে গ্রেট নিকোবর দ্বীপ একটি সক্রিয় ভূকম্পনপ্রবণ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত, কারণ এটি ইন্দো-অস্ট্রেলীয় ও ইউরেশীয় টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থলের নিকটে অবস্থিত। দ্বীপটির শিলাস্তর প্রধানত, পাললিক শিলা দ্বারা গঠিত, যার মধ্যে বেলেপাথর, শেল ও চুনাপাথরের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এই ভূতাত্ত্বিক অবস্থানের কারণেই দ্বীপটি প্রায়ই ভূমিকম্প ও সুনামির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হয়; ২০০৪ সালের ভারত মহাসাগরীয় সুনামিতে গ্রেট নিকোবর দ্বীপ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। একই সঙ্গে এই ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য দ্বীপটিকে জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে সমৃদ্ধ করেছে। ঐতিহাসিকভাবে গ্রেট নিকোবর দ্বীপ দীর্ঘকাল ধরে নিকোবরি ও শোমপেন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি হিসেবে পরিচিত। এরা প্রাচীনকাল থেকেই দ্বীপের অরণ্য ও উপকূলনির্ভর জীবনযাত্রার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। ঔপনিবেশিক যুগে ডেনিশ ও পরে ব্রিটিশদের নজরে এলেও দ্বীপটি মূলত; প্রত্যন্ত ও স্বল্প জনবসতিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবেই রয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর গ্রেট নিকোবর দ্বীপ ভারতের অংশ হিসেবে কৌশলগত ও প্রশাসনিক গুরুত্ব লাভ করে। সাম্প্রতিক কালে দ্বীপটির ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে উন্নয়ন প্রকল্প ও পরিবেশ সংরক্ষণকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। গ্রেট নিকোবর দ্বীপটি আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণতম অংশ হওয়ায় ভারতের অন্যতম দূরবর্তী ভূখণ্ড। এই দূরত্ব কেবল ভৌগোলিক নয়; এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক দূরত্বও। দিল্লি, মুম্বই বা আরাবল্লীতে গাছ কাটলে ক্যামেরা পৌঁছয়, মামলা হয়, প্রতিবাদ গড়ে ওঠে। কিন্তু নিকোবরের গভীর অরণ্যে কী হচ্ছে, তার খবর মূল ভূখণ্ডে পৌঁছয় না। এই নীরবতাই এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি। ভৌগোলিকভাবে গ্রেট নিকোবর একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল দ্বীপ। পাহাড়ি অরণ্য, উপকূলীয় বন, ম্যানগ্রোভ, প্রবাল প্রাচীর ও গভীর সমুদ্র-সব মিলিয়ে এখানে একটি জটিল ও পারস্পরিক নির্ভরশীল বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠেছে। স্থলভাগ ও সমুদ্রের এই যোগসূত্র দ্বীপটিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে এবং জীববৈচিত্র্যের বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এই সমগ্র ব্যবস্থাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে গ্রেট নিকোবরের প্রকৃত মূল্য বোঝা যায় না।
জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার— একটি দ্বীপ, একটি জিনব্যাঙ্ক
গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে ভারতের অন্যতম সমৃদ্ধ ও সংবেদনশীল অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এখানকার উষ্ণ ও আর্দ্র ক্রান্তীয় জলবায়ু, প্রচুর বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘদিনের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা দ্বীপটিকে একটি স্বতন্ত্র বাস্তুতন্ত্রে রূপান্তরিত করেছে। দ্বীপটির অধিকাংশ অংশ ঘন চিরসবুজ ও অর্ধচিরসবুজ অরণ্যে আবৃত্ত, যেখানে বিশাল আকারের ডিপ্টেরোকার্প প্রজাতির বৃক্ষ, নানা ধরনের ফার্ন, লতা ও অর্কিড দেখা যায়। উপকূলবর্তী অঞ্চলে বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ বন রয়েছে, যা উপকূল ক্ষয় রোধের পাশাপাশি সামুদ্রিক ও স্থলজ প্রাণীর প্রজননক্ষেত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই বনাঞ্চল প্রাকৃতিক জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ ও কার্বন শোষণের ক্ষেত্রেও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রাণিজগতের দিক থেকে গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে বহু বিরল ও স্থানীয় প্রজাতির অস্তিত্ব রয়েছে। স্তন্যপায়ীদের মধ্যে নিকোবরের বন্য শূকর, উড়ুক্কু শিয়াল (ফ্রুট ব্যাট) এবং বিভিন্ন প্রজাতির ছোট স্তন্যপায়ী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পাখিজগতে এই দ্বীপপুঞ্জ অত্যন্ত সমৃদ্ধ; নিকোবর মেগাপোড, নিকোবর কবুতর এবং নানা প্রজাতির সমুদ্রপাখি ও পরিযায়ী পাখি এখানে বাস করে, যাদের অনেকেই ভারতের অন্য কোথাও দেখা যায় না। সরীসৃপ ও উভচর প্রাণীর মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির টিকটিকি, সাপ ও ব্যাঙ রয়েছে, যেগুলি দ্বীপের আর্দ্র অরণ্য পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজিত। কীটপতঙ্গের বৈচিত্র্যও অত্যন্ত বিস্তৃত, যা পুরো খাদ্যশৃঙ্খলকে সচল রাখে। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ক্ষেত্রেও গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের গুরুত্ব অপরিসীম। দ্বীপের চারপাশে বিস্তৃত প্রবাল প্রাচীর, সামুদ্রিক ঘাসের মাঠ এবং উপকূলীয় জলাভূমি রয়েছে, যা মাছ, কচ্ছপ, শামুক, প্রবাল ও নানা অমেরুদণ্ডী প্রাণীর আবাসস্থল। সবুজ কচ্ছপ ও লেদারব্যাক কচ্ছপের মতো বিপন্ন প্রজাতি এই অঞ্চলের সৈকতে ডিম পাড়ে, যা দ্বীপটির বৈশ্বিক সংরক্ষণমূল্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে। সামগ্রিকভাবে গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের জীববৈচিত্র্য শুধু ভারতের নয়, সমগ্র ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং তাই এই অনন্য বাস্তুতন্ত্রের সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।
পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন— কাগজে ঠিক, বাস্তবে ফাঁপা
গ্রেট নিকোবর আইল্যান্ড ডেভেলপমমেন্ট প্রজেক্টের প্রেক্ষাপটে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন প্রক্রিয়াটি কার্যত ‘কাগজে ঠিক, বাস্তবে ফাঁপা’ বলেই বহু বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদ মনে করেন। রিপোর্টে বন ধ্বংস, জীববৈচিত্র্য ক্ষয়, ভূমিকম্প ও সুনামির ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হলেও, সেগুলির গভীরতা ও পারস্পরিক সংযোগ যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি। ২০০৪ সালের সুনামিতে দ্বীপটির যে ভৌগোলিক রূপান্তর ঘটেছিল, তা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় গুরুত্ব পায়নি। আরও গুরুতর সমস্যা হল, রিপোর্টে প্রাথমিক চিরসবুজ অরণ্যকে সাধারণ বন হিসেবে দেখানো হয়েছে, ফলে তার প্রকৃত পরিবেশগত মূল্য কম করে উপস্থাপিত হয়েছে। আদিবাসী শোমপেন ও নিকোবরি জনগোষ্ঠীর উপর সম্ভাব্য সামাজিক-পরিবেশগত প্রভাবও মূলত আনুষ্ঠানিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, বাস্তব জীবিকা ও সাংস্কৃতিক ক্ষতির বিশ্লেষণ প্রায় অনুপস্থিত। বহু ক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে স্বল্প সময়ের মাঠসমীক্ষার মাধ্যমে, যা মৌসুমি জীববৈচিত্র্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত পরিবর্তন ধরতে অক্ষম।
আদিবাসী সমাজ— উন্নয়নের নামে দুটি গোষ্ঠীর অবলুপ্তির সম্ভাবনা
গ্রেট নিকোবর আইল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের বাস্তবায়ন আদিবাসী সমাজের ওপর বহুস্তরীয় ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষত শোমপেন ও নিকোবরি জনগোষ্ঠীর জীবনধারায়। এই জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস প্রায়শই দ্বীপের ঘন অরণ্য ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। বন উজাড়, নদী ও উপকূলের পরিবর্তন এবং অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ তাদের শিকারের এলাকা, মাছ ধরার স্থান এবং ফলমূল সংগ্রহের জায়গা হ্রাস করবে, যা সরাসরি তাদের খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অ্যানথ্রোপোলজিক্যাল দিক থেকে দেখা যায়, নিকোবরি ও শোমপেন আদিবাসীরা স্বনির্ভর ও ক্ষুদ্র জনসংখ্যার সমাজ, যেখানে সামাজিক কাঠামো, জ্ঞান পরম্পরা ও ভাষা প্রায়শই স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রকল্পের ফলে এই পরিবেশে হস্তক্ষেপ হলে তাদের পরম্পরাগত জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক অভ্যাস বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়বে। পুনর্বাসন বা নগরায়ন পরিকল্পনা থাকলেও এটি প্রায়ই তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বজায় রাখতে সক্ষম হয় না। বৈজ্ঞানিক এবং নৃবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে, গ্রেট নিকোবর প্রকল্প শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, বরং দ্বীপের আদিবাসী সমাজের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর হুমকি।
স্ট্র্যাটেজিক যুক্তি, কর্পোরেট স্বার্থ ও রাষ্ট্র
গ্রেট নিকোবর আইল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের প্রেক্ষাপটে স্ট্র্যাটেজিক যুক্তি, কর্পোরেট স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য একত্রিতভাবে প্রকল্পের মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে । স্ট্র্যাটেজিকভাবে, দ্বীপটি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে, যেখানে গভীর সমুদ্র বন্দর ও আধুনিক বিমানবন্দর স্থাপন ভারতের কৌশলগত উপস্থিতি বাড়াবে। কর্পোরেট স্বার্থের দিক থেকে, বহুজাতিক ও দেশীয় সংস্থাগুলি বন্দরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ট্রান্সশিপমেন্ট, লজিস্টিকস ও পর্যটন থেকে লাভবান হবে। রাষ্ট্রের লক্ষ্য হল, দ্বীপটিকে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর এবং ‘স্মার্ট আইল্যান্ড’ হিসেবে গড়ে তোলা, যা কৌশলগত শক্তি, বাণিজ্য ও স্থানীয় উন্নয়নের সমন্বয় ঘটাবে। তবে এই তিনটি দৃষ্টিকোণ পরিবেশ ও আদিবাসী সমাজের উপর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত।
আরাবল্লী থেকে নিকোবর— ধ্বংসের ধারাবাহিক রাজনীতি
ভারতের আরাবল্লী পর্বতমালা থেকে নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত ধ্বংসের ধারাবাহিক রাজনীতি মূলত প্রাকৃতিক সম্পদ, অর্থনীতি এবং কৌশলগত ক্ষমতার মধ্যে সমন্বিত একটি নীতিগত প্রবণতা হিসেবে দেখা যায়। আরাবল্লী পাহাড়ের খনি ও খনিজ উত্তোলন, যা সরকারের নীতি ও সুপ্রিম কোর্টের ২০২৫ সালের রায়ের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়েছে, সেটি যেমন স্থানীয় পরিবেশ ও নদী জলাধারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে, ঠিক তেমনই নিকোবরের উন্নয়ন প্রকল্পও প্রাকৃতিক বন, সমুদ্র ও জীববৈচিত্র্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করার সম্ভাবনা বহন করছে। এই ধারাবাহিকতা দেখায় যে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্প উন্নয়নের নামে ভারতীয় রাজনীতিতে পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিকোবর প্রকল্পে কৌশলগত এবং কর্পোরেট স্বার্থকে কেন্দ্রীয়ভাবে এগোনোর চেষ্টা চলছে। দ্বীপপুঞ্জে গভীর সমুদ্র বন্দর, বিমানবন্দর ও শিল্পকেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যা রাষ্ট্রের সামরিক ও বাণিজ্যিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে, তবে স্থানীয় আদিবাসী সমাজ ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর বিপুল চাপ তৈরি করবে। অতীতের আরাবল্লী খনিজ নীতি ও বন ধ্বংসের উদাহরণ প্রমাণ করে যে, পরিবেশগত ক্ষতি ও সামাজিক প্রভাবের দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়ন প্রায়শই ন্যূনতম গুরুত্ব পায়। ফলে ভারতের প্রকল্প-নির্ভর রাজনীতি প্রায়ই সংক্ষিপ্তমেয়াদী অর্থনৈতিক বা কৌশলগত লাভকে প্রধান করে পরিবেশ ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সমন্বয় করতে ব্যর্থ হয়। আরাবল্লী থেকে নিকোবর পর্যন্ত এই ধ্বংসের ধারাবাহিক রাজনীতি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও শিল্পস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ও সামাজিক ক্ষতির সম্ভাব্য পথ প্রশস্ত করছে।
গ্রেট নিকোবর— একটি দ্বীপ, একটি সতর্কবার্তা
গ্রেট নিকোবর আইল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট শুধু একটি দ্বীপের উন্নয়নের গল্প নয়, বরং এটি পরিবেশ, আদিবাসী সমাজ ও রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের মধ্যে সংঘর্ষের সতর্কবার্তা। প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভারতের অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব, কিন্তু ঘন বন, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব খুবই গুরুতর হতে পারে। বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ দেখায়, ক্ষতিপূরণমূলক বনায়ন বা আধুনিক অবকাঠামো প্রকৃত বন ও বাস্তুতন্ত্রের বিকল্প নয়। ভূমিকম্প, সুনামি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের যুগল ঝুঁকি আরও প্রকল্পের স্থায়িত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাই গ্রেট নিকোবর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়নের নামে পরিবেশ ও সামাজিক স্থিতিশীলতার উপেক্ষা দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, যা শুধু দ্বীপ নয়, সমগ্র ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।