চিত্র: সংগৃহীত
শ্রীমৎ ভক্তি সুন্দর সন্ন্যাসী মহারাজ (আচার্য্য ও সভাপতি, গৌড়ীয় মিশন, বাগবাজার): ফাল্গুনের শেষপ্রহরে যখন বাংলার আকাশে রঙের উল্লাস, তখন গঙ্গাতীরবর্তী নবদ্বীপ যেন অন্য এক আবহে জেগে ওঠে। এখানে দোলযাত্রা কেবল আবির-গুলালের উৎসব নয়; এটি প্রেমভক্তির চিরন্তন আহ্বান, এটি গৌরপূর্ণিমা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু-র আবির্ভাব তিথি। নবদ্বীপের গৌড়ীয় মঠে এই দিনটি রূপ নেয় এক আধ্যাত্মিক মহোৎসবে, যেখানে রঙের উচ্ছ্বাস মিশে যায় নামসংকীর্তনের সুরে, আর ভক্তির আবেগ ছুঁয়ে যায় হাজারও হৃদয় (Gaur Purnima)।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট; দোলপূর্ণিমা থেকে গৌরপূর্ণিমা
১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দে ফাল্গুন পূর্ণিমার সন্ধ্যায় নবদ্বীপে আবির্ভূত হন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। ঐতিহ্য অনুসারে, তাঁর জন্মমুহূর্তে চন্দ্রগ্রহণ চলছিল এবং গঙ্গার ঘাটে অসংখ্য মানুষ হরিনাম সংকীর্তনে মগ্ন ছিলেন। সেই নামধ্বনির মধ্যেই তাঁর আবির্ভাব যা পরবর্তীকালে তাঁর জীবনদর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। এই কারণেই দোলপূর্ণিমা বৈষ্ণবসমাজে গৌরপূর্ণিমা নামে সমাদৃত। বসন্তের রঙিন উৎসব এখানে পরিণত হয় প্রেমভক্তির দিবসে। গৌড়ীয় মঠ বহু আগে থেকেই এই তিথিকে কেন্দ্র করে আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি গ্রহণ করে উপবাস, শাস্ত্রপাঠ, নামজপ ও ধর্মসভা আয়োজনের মাধ্যমে (Gaur Purnima)।
গৌড়ীয় মঠে দিনের সূচনা; ভোরের মঙ্গলধ্বনি
দোলযাত্রার দিন ভোররাতেই গৌড়ীয় মঠে শুরু হয় মঙ্গলআরতি। শঙ্খধ্বনি, ঘণ্টানাদ ও কীর্তনের সুরে মন্দিরপ্রাঙ্গণ মুখর হয়ে ওঠে। ফুল, আলোকসজ্জা ও বৈষ্ণব পতাকায় সজ্জিত হয় সমগ্র আশ্রম। ভক্তরা সাদা বা গেরুয়া বস্ত্রে, কপালে তিলক এঁকে, হাতে মালা নিয়ে নামজপে অংশ নেন।
সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভক্তসমাগম বৃদ্ধি পায়। শুধু নদিয়া জেলা নয়, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত, এমনকি দেশ-বিদেশ থেকেও আগত ভক্তরা এই উৎসবে যোগ দেন। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে উপস্থিত হন, কারণ এটি শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এক পারিবারিক ও সামাজিক মিলনোৎসব (Gaur Purnima)।
শ্রীবিগ্রহের শৃঙ্গার ও রঙের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
অহোরাত্র অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ পুজো ও শ্রীবিগ্রহের শৃঙ্গার। শ্রীগোদ্রুমবিহারি রাধা গোবিন্দ জিউ বিগ্রহ ফুলে, চন্দনে ও রঙিন বস্ত্রে সজ্জিত হয়। ভক্তরা আবির ও গুলাল অর্পণ করেন, তবে এখানে রঙের ব্যবহার ভক্তির প্রতীক হৃদয়কে প্রেমের রঙে রাঙানোর আহ্বান। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, মহাপ্রভুর কৃপায় অন্তরের কলুষ দূর হয়ে প্রেম ও নম্রতা জাগ্রত হয়। রঙের এই প্রতীকী প্রয়োগ উৎসবকে আধ্যাত্মিক গভীরতা প্রদান করে।
নামসংকীর্তন
মৃদঙ্গ, করতাল ও শঙ্খের তালে তালে ‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ’ ধ্বনিতে মঠপ্রাঙ্গণ মুখরিত হয়। সন্ন্যাসী ও ব্রহ্মচারীরা নেতৃত্ব দেন, আর ভক্তরা একযোগে সাড়া দেন। অনেকের চোখে আনন্দাশ্রু যেন পাঁচশো বছরের পুরনো নবদ্বীপের সেই দিনগুলি ফিরে এসেছে।
নামসংকীর্তন কেবল সঙ্গীত নয়; এটি এক সামষ্টিক সাধনা। এখানে জাতি-বর্ণের ভেদরেখা মুছে যায়। সকলেই একই সুরে, একই ছন্দে, একই নাম জপ করেন। এই সম্মিলিত ভক্তিই শ্রীচৈতন্যের আন্দোলনের প্রাণ।
শোভাযাত্রা ও ধামপরিক্রমা
এই উপলক্ষে পাঁচ দিন পূর্ব থেকেই ধাম পরিক্রমা শুরু হয়। মহা সংকীর্তন যোগে সাধু, সন্ন্যাসী সহ ভক্তরা নগরপরিক্রমায় অংশ নেন। কীর্তনের সুরে, পতাকা ও ফুলের মালায় সজ্জিত সেই শোভাযাত্রা নবদ্বীপের অলিগলি পেরিয়ে এগিয়ে চলে (Gaur Purnima)।
পথচারীরা প্রণাম জানান, কেউ কেউ কীর্তনে যোগ দেন। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই এই মহোৎসবে অংশগ্রহণ করেন। এই শোভাযাত্রা নবদ্বীপের ঐতিহাসিক বৈষ্ণব ঐতিহ্যকে জীবন্ত করে তোলে এবং শহরের সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে।
আবির্ভাবের দর্শন; প্রেমভক্তির বিপ্লব
গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে শ্রীকৃষ্ণের করুণাময় অবতার হিসেবে মানা হয় যিনি রাধার প্রেম ও কৃষ্ণের করুণা ধারণ করে আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁর শিক্ষা ছিল সহজ— নামসংকীর্তন ও প্রেমভক্তি।
তিনি দেখিয়েছিলেন, ধর্মচর্চা কোনও বিশেষ গোষ্ঠীর একচেটিয়া অধিকার নয়। সমাজের নিম্নবর্ণ, নারীরা, এমনকি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও তাঁর কীর্তনে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁর বিখ্যাত বাণী— ;তৃণাদপি সুনীচেন, তরোরপি সহিষ্ণুনা’ আজও মানবিকতা ও সহিষ্ণুতার পাঠ দেয় (Gaur Purnima)।
নবদ্বীপের আধ্যাত্মিক পরিবেশ গৌরপূর্ণিমার দিন নবদ্বীপ এক বিশাল তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়। গঙ্গার ঘাটে স্নান, পুজো ও নামজপ চলে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত। বিভিন্ন আশ্রম ও মন্দিরে ধর্মসভা, শাস্ত্রপাঠ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
সন্ধ্যায় আবির্ভাব মুহূর্ত স্মরণ করে বিশেষ আরতি হয়। হাজার হাজার প্রদীপের আলোয় মঠপ্রাঙ্গণ আলোকিত হয়ে ওঠে। সেই মুহূর্তে উপস্থিত ভক্তরা অনুভব করেন এক গভীর আধ্যাত্মিক সংযোগ যেন সময়ের সীমানা অতিক্রম করে তাঁরা মহাপ্রভুর সান্নিধ্যে পৌঁছে গেছেন।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব
এই উৎসব নবদ্বীপের অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, হস্তশিল্প ও পর্যটন খাতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। বহু পরিবার এই সময়ের জন্য অপেক্ষা করে থাকে, কারণ এটি তাদের জীবনে আনন্দের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও বয়ে আনে (Gaur Purnima)।
তবে সবচেয়ে বড় প্রভাব সামাজিক সম্প্রীতিতে। বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ এই উৎসবে অংশ নেন। নামসংকীর্তনের সুরে তারা একাত্মতা অনুভব করেন। এই মিলনমেলা নবদ্বীপকে কেবল ঐতিহাসিক শহর নয়, এক জীবন্ত আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
আধুনিক প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিকতা
বর্তমান বিশ্বে যখন বিভাজন, হিংসা ও অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, তখন শ্রীচৈতন্যের প্রেম ও ঐক্যের বার্তা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। গৌড়ীয় মঠের সন্ন্যাসীরা মনে করেন, নামসংকীর্তন মানুষের মানসিক চাপ কমাতে ও সামাজিক সংহতি গড়ে তুলতে সহায়ক।
আজকের তরুণ প্রজন্মও এই উৎসবে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে কীর্তন ও শোভাযাত্রার ছবি-ভিডিয়ো ভাগ করে তারা এই ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিচ্ছে। ফলে নবদ্বীপের গৌরপূর্ণিমা আন্তর্জাতিক পরিসরেও পরিচিতি পাচ্ছে (Gaur Purnima)।
উপসংহার; প্রেমের রঙে রাঙা হোক মানবতা (Gaur Purnima)
নবদ্বীপের গৌড়ীয় মঠে দোলযাত্রা তাই কেবল রঙের উৎসব নয়; এটি প্রেমভক্তির এক গভীর সাধনা। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব স্মরণে এই দিনটি মানুষের হৃদয়ে জাগায় নম্রতা, সহিষ্ণুতা ও ভ্রাতৃত্বের বোধ।
ফাল্গুনের পূর্ণিমার চাঁদ যখন গঙ্গাতীরে আলো ছড়ায়, তখন কীর্তনের সুরে ধ্বনিত হয় সেই চিরন্তন আহ্বান—
প্রেমের রঙে রাঙাও মন, নামসংকীর্তনে জাগুক মানবতা।
এই আহ্বান শুধু নবদ্বীপের নয়; এটি সমগ্র মানবসমাজের জন্য এক দৃষ্টান্ত।