চিত্রঃ সংগৃহীত
ড. রাম কৃষ্ণ সেন: এল নিনো ও লা নিনা দুটি স্প্যানিশ শব্দ হলেও আজ গবেষণা, পরিবেশনীতি ও বৈশ্বিক জলবায়ু রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত পরিভাষা। এল নিনোর অর্থ ‘ছোট ছেলে’, আর লা নিনার অর্থ ‘ছোট মেয়ে’। নাম দুটি নিছক প্রতীক হলেও ঘটনা দুটি সম্পূর্ণরূণে সমুদ্র-বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালনের গভীর পরিবর্তনের ফল। প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার চক্রাকার ওঠানামা, বায়ুচাপের তীর পার্থক্য এবং সমুদ্রস্রোতের শক্তি-এই তিনের সমন্বয়েই গঠিত হয় এল নিনো-লা নিনা। স্বাভাবিক অবস্থায় নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের উপর দিয়ে পূর্ব দিক থেকে বাণিজ্য বায়ু প্রবাহিত হয়। এই বায়ু পূর্বাঞ্চলের উষ্ণ জল পশ্চিম দিকে ঠেলে দেয়। ফলে ইন্দোনেশিয়া, পাপুয়া নিউগিনি ও উত্তর অস্ট্রেলিয়ার দিকে সমুদ্রপৃষ্ঠ তুলনামূলকভাবে উষ্ণ থাকে এবং সেখানে বৃষ্টি বেশি হয়। অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে থাকে তুলনামূলক শীতল জল, যা ওপরের দিকে উঠতে থাকা ঠান্ডা জলের স্রোতের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু এই স্বাভাবিক ভারসাম্য যখন ভেঙে পড়ে, তখনই ঘটে এল নিনো বা লা নিনা। এল নিনো ঘটে যখন বাণিজ্য বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের জল অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে যায়। বিপরীতে লা নিনার সময় বাণিজ্য বায়ু অত্যধিক শক্তিশালী হয়ে সাধারণের চেয়ে আরও বেশি উষ্ণ জলকে পশ্চিম দিকে সরিয়ে দেয়, এবং পূর্ব অংশে ঠান্ডা স্রোতের প্রভাব বেড়ে যায় (El Niño and La Niña)।
গবেষণা বলছে, এই পরিবর্তন মাত্র তাপমাত্রা বা বৃষ্টিপাতের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। কৃষি, মৎস্য, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি-বিশ্বের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এল নিনো–সাউদার্ন অসিলেশন-এর সরাসরি এবং পরোক্ষ প্রভাব দেখা যায়। বিশেষত ভারত, যেখানকার মৌসুমি জলবায়ু বৃষ্টিভিত্তিক কৃষিনির্ভর ও জনসংখ্যা অত্যন্ত ঘন-সেখানে এল নিনো–সাউদার্ন অসিলেশন বৈশ্বিক বিপর্যয়ের মতোই একটি অভ্যন্তরীণ সংকটের ইঙ্গিত বহন করতে পারে (El Niño and La Niña)।
ইতিহাস— এল নিনো ও লা নিনার পর্যায়ক্রমিক আগমন নতুন কিছু নয়। প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলবর্তী পেরুর জেলেরা ১৬শো শতকেই লক্ষ্য করেছিলেন যে কিছু বছর ডিসেম্বরে সমুদ্রের জল অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠে, ফলে মাছের পরিমাণ হ্রাস পায়। তারা ধর্মীয় প্রতীকের সঙ্গে মিলিয়ে একে নাম দিয়েছিলেন এল নিনো দে নাভিদাদ বা ক্রিসমাস বালক। বিজ্ঞানীরা পরবর্তীতে একে বিশ্বজুড়ে জলবায়ুগত ব্যতিক্রমী ঘটনার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেন।
ইতিহাসে ১৯৮২-৮৩, ১৯৯৭-১৮ এবং ২০১৫-১৬ সালের এল নিনো ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী। এসব বছরে একাধিক দেশে রেকর্ড ভাঙা তাপদাহ, ভয়াবহ বনানল, আকস্মিক বন্যা ও কৃষিক্ষয়ক্ষতি দেখা যায়। বৈজ্ঞানিক পরিসংখ্যান বলে, গত ৫০ বছরে এল নিনো অন্তত ১৪ বার এবং লা নিনা ১২ বার ঘটেছে। সাম্প্রতিক তিন বছর ধরেই (২০২০-২০২২) পৃথিবী লা নিনার শীতল প্রভাবে ছিল, যা বিরল ঘটনা। গবেষণা আরও বলছে-বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ইএনএসও-কে আরও চরম করে তুলছে। ভবিষ্যতে এল নিনোর উষ্ণতা ও লা নিনার শীতলতা দুটোই আগের চেয়ে বেশি তীব্র হয়ে উঠতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকার প্যানেল-এর রিপোর্টে দেখা যায়, ২০৩০ সালের মধ্যেই এল নিনো–সাউদার্ন অসিলেশন-এর প্রভাব এশিয়া ও আফ্রিকায় আরও ধ্বংসাত্মক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ Weather Update: বঙ্গোপসাগরে নতুন ঘূর্ণিঝড় ‘দিতোয়া’, বাংলায় প্রভাব কেমন?
প্রভাব— এল নিনো ও লা নিনা পৃথিবীর আবহাওয়ার ওপর যে প্রভাব ফেলে তা অভান্ত বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক। প্রথমত, তাপমাত্রার ওঠানামা। এল নিনো হলে প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চল গরম হয়ে যায়, যা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৬ সালে এল নিনো বৈশ্বিক উষ্ণতার রেকর্ড গড়ে দেয়। লা নিনার সময় পৃথিবী তুলনামূলক ঠান্ডা থাকে, যদিও সাম্প্রতিক না নিনা পর্বগুলোতেও উষ্ণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি যা মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতারই ইঙ্গিত। দ্বিতীয়ত, বৃষ্টিপাতের ধরন সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও উত্তর অস্ট্রেলিয়ায় এল নিনোর সময় বৃষ্টিপাত কমে, খরা দেখা দেয়। পূর্ব আফ্রিকায় তীব্র খরা-খাদ্যসঙ্কট, দক্ষিণ আমেরিকায় অতিবৃষ্টি-এই বিপরীতধর্মী চিত্রই ইএনএসও-এর বৈশ্বিক স্বরূপ। তৃতীয়ত, মৎস্যসম্পদের ওপর প্রভাব। প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণায়ন ঠান্ডা স্রোতের উত্থান বন্ধ করে দেয়, ফলে পেরুর মত সমুদ্রনির্ভর দেশগুলোতে মাছের প্রজনন কমে যায়। বিপরীতে লা নিনায় ঠান্ডা স্রোত বাড়ায় মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি পায়। চতুর্থত, ঝড়-ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা বদলে যায়। এল নিনো আটলান্টিকে ঘূর্ণিঝড় কমায়, আবার প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তা বাড়ায়। লা নিনা আবার উল্টো প্রভাব ফেলে। সব মিলিয়ে ইএনএসও-কে বৈশ্বিক জলবায়ুর ‘ডোমিনো ইফেক্ট’। বলা চলে, এক স্থানের পরিবর্তন পৃথিবীর অন্য প্রান্তে বিপর্যয় ঘটিয়ে দেয় (El Niño and La Niña)।
২০২৬ সাল কি এল নিনো বছর হতে যাচ্ছে?
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষণা সংস্থা, বিশেষত এনওএএ, ডব্লুএম এবং আইপিসিসি-এর আপডেট মডেলগুলো ২০২৫-এর শেষ দিক থেকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ২০২৬ সালে একটি শক্তিশালী ইএনএসও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে, যার মধ্যে মাঝারি থেকে শক্তিশালী মাত্রার এল নিনো অথবা তার পরই দ্রুত লা নিনা আগমন-দুটোই সম্ভাব্য। ২০২৩-২৪ সালের মাঝারি এল নিনো শেষ হওয়ার পর পৃথিবী ২০২৪-এ এল নিনো–সাউদার্ন অসিলেশন স্বাভাবিক অবস্থায় প্রবেশ করে। এরপর ২০২৫ সালে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার ধীর বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য বায়ুর পরিবর্তন দেখে গবেষকরা অনুমান করছেন-২০২৬ সালে আবারও এল নিনো–সাউদার্ন অসিলেশন-এর তীব্রতা বেড়ে উঠবে।
কেন ২০২৬-এ ঝুঁকি বেশি?
১. প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতার দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা— শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী উষ্ণায়নের কারণে প্রশান্ত মহাসাগর ক্রমে গড় তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে। ফলে এল নিনো–সাউদার্ন অসিলেশন ঘটনার সম্ভাবনা দ্বিগুণ বেড়েছে।
২. জলবায়ু মডেলগুলোতে উচ্চ অনিশ্চয়তা— ২০২৫-২৬ সালের মডেলগুলো দেখাচ্ছে-এল নিনো শুরু হলেও তা দ্রুত লা নিনায় রূপ নিতে পারে, যা পৃথিবীর আবহাওয়ার জন্য ‘ডাবল শক’ সৃষ্টি করবে।
৩. মৌসুমি বায়ুর ওপর সরাসরি প্রভাব— ভারতীয় মৌসুমি বায়ু ইএনএসও-এর ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। ২০২৬ সালে এল নিনো হলে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
৪. তাপপ্রবাহ-খরা-দাবানলের যৌথ প্রভাব— ২০২৬ সালে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে এশিয়ায় তাপপ্রবাহ তীব্র হতে পারে-যার আগাম সতর্কতা অনেক দেশের আবহাওয়া সংস্থা ইতিমধ্যেই দিয়েছে। সবমিলিয়ে বলা যায়-২০২৬ সাল ইএনএসও চক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে (El Niño and La Niña)।
ভারতে এল নিনো-লা নিনার প্রভাব
ভারতের জলবায়ু এবং কৃষি ব্যবস্থার ওপর এল নিনো ও লা নিনা-র প্রভাব ব্যাপক এবং বহুমাত্রিক। ভারতের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তা উভয়ই মৌসুমি বর্ষার ওপর নির্ভরশীল। বর্ষা দেরিতে আসা বা অতিবৃষ্টি হওয়া সরাসরি ফসল উৎপাদন, জলসম্পদ, অর্থনীতি এবং মানবস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। এল নিনো ও লা নিনা হল ইএনএসও চক্রের দুটি পরস্পরবিরোধী ধাপ। যখন প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বৃদ্ধি পায়, তখন এল নিনো তৈরি হয় এবং পশ্চিম প্রশান্তে জল তাপমাত্রা কমে গেলে বা বায়ুপ্রবাহ পরিবর্তিত হলে লা নিনা ঘটে। এই দুটি প্রক্রিয়া ভারতের জলবায়ুকে অত্যন্ত ভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। এল নিনো ভারতের বর্ষাকে সাধারণের তুলনায় দেরিতে আনে। সাধারণত বর্ষার বৃষ্টিপাত ১০-২০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে, যা বিশেষত উত্তর-পশ্চিম ভারতের রাজস্থান, হরিয়ানা ও পাঞ্জাবের মতো অঞ্চলে তীব্র খরার সৃষ্টি করে। মধ্য ভারতের কৃষিজমিতে ফসলের ক্ষতি বৃদ্ধি পায়, ফলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। অন্যদিকে লা নিনার সময় বর্ষা আগেভাগে আসে এবং অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। হিমাচল, উত্তরাখণ্ড, অসম ও মেঘালয়ের মতো পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিধসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। এর ফলে সেচ ও ফসল উৎপাদনের ওপর চাপ আরও বাড়ে। কৃষিক্ষেত্রে এল নিনোর প্রভাব চরমরূপে দেখা যায়। ধান, আখ, তুলা ও ডাল-এই চারটি প্রধান ফসল বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলসেচনির্ভর ফসলের খরচ বৃদ্ধি পায় এবং ভূগর্ভস্ব জলের ওপর চাপ বেড়ে যায়। ফলন কমে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ে, যা সাধারণ মানুষ ও শিল্প উভয়ের জন্যই প্রভাব বিস্তার করে।
Bangla Jago fb page: https://www.facebook.com/share/17CxRSHVAJ/
লা নিনার সময় ধান ও আখের উৎপাদন কিছুটা বাড়লেও অতিবৃষ্টির কারণে সবজি ও ডাল ফসল নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কৃষি-নির্ভর অর্থনীতি অনিশ্চিত হয়ে ওঠে এবং বাজারে খাদ্যদ্রব্যের অভাব দেখা দিতে পারে। জলসম্পদের ক্ষেত্রে এল নিনো বছর নদীর জলপ্রবাহ হ্রাস করে। গঙ্গা, নর্মদা ও কাবেরী নদীর অববাহিকায় জলস্তর কমে যায়, জলাধার ও হ্রদ দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং শহরগুলোতে জলসঙ্কট চরমে পৌঁছয়। উদাহরণস্বরূপ, চেন্নাই শহরে ২০১৯ সালের মতো পরিস্থিতি পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থাকে। অপরদিকে লা নিলার সময় অতিরিক্ত জলস্রোত দেখা যায়, যা বাঁধ, জলাধার ও নদীর গতিপথে চাপ বৃদ্ধি করে। ফলে বন্যার ঝুঁকি বাড়ে এবং নদী ও জলাধার ব্যবস্থার স্থায়িত্ব হুমকির মুখে পড়ে। মানবস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও এল নিনো ও সা নিনার প্রভাব লক্ষ্যণীয়। এল নিনোর সময় তাপপ্রবাহে মৃত্যুহার বৃদ্ধি পায়। শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। ডিহাইড্রেশন, হিটস্ট্রোক এবং ডায়েরিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। তদুপরি, দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, যার কারণে শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ে। লা নিনার সময় বন্যার কারণে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ও অন্যান্য জলজ-সংক্রামক রোগের প্রকোপ তীব্র হয়। ফলে স্বাস্থ্যখাতেও এল নিনো-লা নিনা সরাসরি চাপ তৈরি করে। কৃষিতে ক্ষতির প্রভাবে এল নিনো অর্থনীতি ও বাজারকেও প্রভাবিত করে। খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ে, শিল্পে কাঁচামালের ঘাটতি দেখা দেয়, বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পায় এবং পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি পায়। দেশের সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যায়। ভারতের কৃষিনির্ভর রাজ্যগুলোর ওপর এই প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিয়েছেন, যদি ২০২৬ সালে মাঝারি বা শক্তিশালী এল নিনো ঘটে, তবে বর্ষা স্বাভাবিকের তুলনায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশে ফসলের উৎপাদন ২০-২৫ শতাংশ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানার মতো রাজ্যে তীব্র জলসঙ্কট দেখা দিতে পারে। মার্চ-জুনের মধ্যে তাপপ্রবাহ ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলে বায়ুদূষণ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। হিমালয় অঞ্চলে তুষার গলার হার বৃদ্ধি পেতে পারে, যা আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তৈরি করবে। চা, কফি, মসলা, আম ও আখের মতো শিল্পও বড় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। যদি একই বছরের শেষ দিকে লা নিনা শুরু হয়, তবে অতিবৃষ্টি, নদী উপচে পড়া, উত্তরবঙ্গ বা উত্তরাখণ্ডে বড় ধরনের বন্যা, ভূমিধস এবং ফসলভেজা ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। অর্থাৎ, ২০২৬ সাল ভারতের জন্য ইএনএসও নির্ভর একটি দ্বিকেন্দ্রিক ঝুঁকির বছর হতে পারে, যেখানে একদিকে তীব্র খরা ও তাপপ্রবাহ, অন্যদিকে অতিবৃষ্টি ও বন্যা-উভয় প্রকার প্রাকৃতিক ঝুঁকি দেশকে চ্যালেজ করবে। ভারতে এল নিনো-লা নিনার প্রভাব কেবল কৃষি বা জলসম্পদের ওপর সীমাবদ্ধ নয়, এটি স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাতেও গভীর প্রভাব ফেলে। তাই সরকারের পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা, জলাধার ও নদী ব্যবস্থাপনা, কৃষি সহায়তা, এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইএনএসও-চক্রের পূর্বাভাস ও প্রস্তুতি গ্রহণ করে ভারত এই প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে পারে এবং ক্ষতির মাত্রা কমাতে সক্ষম হবে (El Niño and La Niña)।
ভারতের জন্য করণীয়
ভারতের জন্য এল ইএনএসও-নির্ভর ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য। জাতীয় পর্যায়ে এইএনএসও পূর্বাভাস ও সঙ্কট পরিকল্পনা গ্রহণ করে প্রতিটি রাজ্যকে বর্ষা ও খরা পরিস্থিতি অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া উচিত। পাশাপাশি জলব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি, যার মধ্যে নদী পুনর্জীবন, জলাধার সংস্কার এবং বর্ষার জল সংরক্ষণ অন্তর্ভুক্ত। কৃষিক্ষেত্রে অভিযোজন কৌশল গ্রহণ করতে হবে, যেমন স্বল্পমেয়াদি জাতের ধান, খরা-সহনশীল ডাল চাষ, ডিপ সেচ এবং মাইক্রো-ইরিগেশন প্রযুক্তি প্রয়োগ। তাপপ্রবাহের ঝুঁকি মোকাবিলায় শহরে হিট-অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন, ছায়াযুক্ত রাস্তা বৃদ্ধি এবং সবুজায়ন জরুরি। একই সঙ্গে বন্যা ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে হবে, যাতে নদীতীর রক্ষা নিশ্চিত হয় এবং হিমালয় অঞ্চলে আগাম ভূমিধস সতর্কতা ব্যবস্থা চালু থাকে। এই সমন্বিত কৌশলগুলি ইএনএসও-নির্ভর ঝুঁকিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং দেশের অর্থনীতি, কৃষি ও মানবস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উপসংহার
এল নিনো ও লা নিনা কেবল আবহাওয়ার ঘটনা নয়-এগুলো বিশ্বের অর্থনীতি, কৃষি, জলসম্পদ, স্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার উপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। ভারতের ক্ষেত্রে ইএনএসও আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ দেশের ৫০ শতাংশ মানুষ এখনও বর্ষা-নির্ভর কৃষির সঙ্গে যুক্ত। ২০১৬ সালে ইএনএসও-এর সম্ভাব্য পরিবর্তন দেশকে বড় ধরনের সামাজিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করতে পারে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের যে বৃহত্তর সংকট পৃথিবীকে ঘিরে ফেলেছে, ইএনএসও তারই বহিঃপ্রকাশ মাত্র। যথাসময়ে প্রস্তুতি, বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস, কৃষিনীতি ও জলব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করেই ভারত ২০২৬ সালের সম্ভাব্য এল নিনো-লা নিনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে।