ad
ad

Breaking News

Domestic Violence Debate

গার্হস্থ্য হিংসা ও ভারতীয় নারী

এই ভয়ঙ্কর আইন আমাদের অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে (দিয়েছে কি?)। আফগানিস্তানে এই আইনের আগে মহিলাদের জীবনের পায়ে পায়ে অনেক অনেক বেড়ি পরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

Domestic Violence Debate

চিত্র: সংগৃহীত

সুকান্ত পাল: কয়েক দিন আগে আফগানিস্তানের একটি খবরে সমগ্র পৃথিবী আঁতকে উঠেছিল। যে যুগে মেয়েরা পাহাড় ডিঙিয়ে, উড়োজাহাজ চালিয়ে, মহাকাশ অভিযান করে, একটা দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদে বসে, শিল্প-সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হয়ে আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসাকে আদায় করে নিচ্ছেন, সেই সময়ে আফগানিস্তানে আইন করে বলা হল, বাড়ির মহিলাদের শরীরের হাড় না ভাঙা পর্যন্ত তাকে প্রহার করাটা কোনও সময়ই গার্হস্থ্য হিংসা বলে গ্রাহ্য করা হবে না। এই ভয়ঙ্কর আইন আমাদের অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে (দিয়েছে কি?)। আফগানিস্তানে এই আইনের আগে মহিলাদের জীবনের পায়ে পায়ে অনেক অনেক বেড়ি পরিয়ে দেওয়া হয়েছে (Domestic Violence Debate)।‌

২০২১ সালে তালিবানেরা ক্ষমতা দখলের পর তাদের পূর্ববর্তী সরকারের প্রণীত এলিমিনেশন অফ ভায়োলেন্স এগেনেস্ট ওম্যান  আইনটিকে একেবারেই অকার্যকর করে দেওয়া হয় এবং মহিলাদের উপর নেমে আসে অভাবনীয় গার্হস্থ্য ও সামাজিক অত্যাচারের নানান কায়দা কানুন। আফগানিস্তানের এই খবরে যখন আমরা উদ্বিগ্ন ও উৎকন্ঠিত হয়ে উঠছি, ঠিক তখনই একবার আমাদের নিজের দেশ ভারতবর্ষের দিকে দৃষ্টিপাত করলে প্রায় একই ধরনের এক চিত্র আমাদের সামনে উপস্থিত।

একথা বলছি কারণ, খুব সম্প্রতি গুজরাটের হাইকোর্ট একটি মামলায় রায় ঘোষণা করেছেন যে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য কলহে যদি স্ত্রীকে চড় মারে স্বামী তবে তা গার্হস্থ্য হিংসা বা আত্মহত্যায় প্ররোচনা বলে বিবেচিত হবে না। খবরে প্রকাশ যে, ১৯৯৬ সালের মে মাসে গুজরাটের সারিগাম গ্রামে প্রমীলা নামে এক গৃহবধূর ঝুলন্ত দেহ মেলে তারই স্বামীর খেত থেকে। এই ঘটনায় প্রমীলার বাবা দাবি করেন, তার মেয়ের ওপর বিভিন্ন কারণে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো বলেই তার মেয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে, এই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নেয় (Domestic Violence Debate)।

তিনি দায়রা আদালতে অভিযোগ করলে বিচারক প্রমীলার স্বামী দিলীপকে ২০০৩ সালে দোষী সাব্যস্ত করে গার্হস্থ্য হিংসার মতো ঘটনা ঘটানোর জন্য মোট সাত বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেন। কিন্তু দিলীপ হাইকোর্টে এই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আপিল করায় হাইকোর্টের মহিলা বিচারপতি গীতা গোপীর পর্যবেক্ষণ হল, একদিন স্ত্রীকে থাপ্পড় মারা ক্রিমিনাল ক্রুয়েলটি হতে পারে না এবং দিলীপ বেকসুর খালাস পান তথ্য ও প্রমাণাদির অভাবে।

আমরা আইনের বিভিন্ন ধারা বা প্যাঁচপয়জার বুঝি না। বুঝি মানবিক অধিকার এবং গার্হস্থ্য হিংসা ও তার প্রতিকার। আমাদের সংবিধানের একুশ নম্বর অনুচ্ছেদ সকল নাগরিককে সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বিবাহিত নারীর নিরাপত্তার বিঘ্নিত হলে তার জন্য প্রণীত হয়েছে ভারতীয় দণ্ডবিধি। নারী যদি তার স্বামী বা তার পরিবারের কোনও সদস্যদের দ্বারা কোনওভাবে মানসিক অথবা শারীরিকভাবে নির্যাতিতা হন তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ভারতীয় সামাজিক ব্যবস্থায় ও ধারনায় ধরেই নেওয়া হয়েছে যে নারী হল একটা সম্পত্তি। সেই কারণেই সম্পত্তিকে অধিকারে রাখতে তার উপর চলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এটা ঘর থেকেই শুরু হয়। অনেক সময় দেখা যায় যে গৃহে পালিত পশুও নারীর থেকে বেশি সম্মান পায়। গৃহাভ্যন্তরে নারীর প্রতি গার্হস্থ্য হিংসা বন্ধ না হলে সমাজ তাকে বিকশিত করার চেষ্টা করে (Domestic Violence Debate)।

এই সুযোগে একটি কথা বলে রাখি, সেটা হল গার্হস্থ্য হিংসার বলি শুধু নারীরাই হন না। পরিবারের শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ বৃদ্ধাদেরও এই হিংসার সম্মুখীন হতে হয়। তবে যেহেতু আমাদের এখানে নারীদের প্রতি গার্হস্থ্য হিংসার বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেছি সেহেতু নারীদের বিষয়ের উপরই আমাদের আলোচনার আলোকপাত করা সমীচীন। আমরা দেখি যে পারিবারিক সহিংসতা থেকে নারীদের সুরক্ষা আইন, ২০০৫-এ পরিষ্কার বলা হয়েছে কী কী কারণে মহিলাদের সঙ্গে ব্যবহারকে গার্হস্থ্য হিংসা হিসাবে ধরা হবে। সব কারণ ও কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানে লক্ষ্যণীয়, শারীরিক নির্যাতনের কথা বাদ দিলেও মৌখিকভাবে মানসিক ও আবেগে আঘাত করাও কিন্তু গার্হস্থ্য হিংসার মধ্যেই পড়ে। সেক্ষেত্রে এই মানসিক নিপীড়ন ঘর থেকেই শুরু হয়। ফলত এক অসহনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করে গৃহের নারীদের গার্হস্থ্য হিংসার শিকারে পরিণত করা হয়।‌ শারীরিক নির্যাতন তো সেখানে আরও ভয়ানক ও‌ সাংঘাতিক ক্রিমিনাল ক্রুয়েলটি ও অপরাধ! অথচ স্বামী একদিন চড়, থাপ্পড় মারলে তা গার্হস্থ্য হিংসা বলে গণ্য হবে না— একথা আমাদের চিন্তা ভাবনাকে, আমাদের চেতনাকে একেবারে ফায়ার স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে না (Domestic Violence Debate)?

আজ অনেক মেয়েই শিক্ষিত এবং অর্থ উপার্জনে সক্ষম। তারা এই গার্হস্থ্য হিংসার অপমান থেকে বাঁচার জন্য, এই পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ডিভোর্স নিয়ে স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাইছেন। সমাজের মন-মানসিকতা, নারীর প্রতি পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার যদি পরিবর্তন না ঘটে তবে ডিভোর্সও কিন্তু একটি সমাজের পক্ষে সুস্থ সমাধান নয়। এ তো গেল শিক্ষিত বা কোনওভাবে অর্থোপার্জনে সক্ষম মহিলাদের কথা। কিন্তু এর বাইরে ভারতবর্ষের অধিক সংখ্যক মহিলারাই তো অর্থনৈতিক ভাবে নিঃস্ব এবং পরনির্ভরশীল। তাদের অবস্থাটা কি আমরা ভাবব না?

হাজার হাজার দিলীপের পাল্লায় পড়ে দেশের নিম্নবিত্ত পরিবার, প্রান্তিক পরিবারের কত শত প্রমীলার জীবনের স্বপ্ন এবং প্রাণ মুছে যাচ্ছে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে তার কোনও পরিসংখ্যান আমাদের হাতের কাছে নেই। তবুও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে সেই চিত্রটা মোটেই সুখকর নয়। অথচ এর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা থাকলেও তার সদ্ব্যবহার কতজন করতে পারছেন? আবার আইনি ব্যবস্থার দারস্থ হলেও যদি গুজরাট হাইকোর্টের রায়ের অনুকরণে বিচার ব্যবস্থা চলতে থাকে তবে সমাজে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানটি ভেঙে পড়তে আর বেশি সময় লাগবে না। আমরা মনে করি এই রায় ভারতের চিরকালীন মানবাধিকারের যে বার্তা, ‘শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা’র শরীরে আঘাত। এই রায় পুনর্বিবেচনা করা যেতেই পারে (Domestic Violence Debate)।