ad
ad

Breaking News

Digital Addiction

ডিজিটাল আসক্তিতে লুকিয়ে আছে মানসিক বিপর্যয়ের বীজ

ডিজিটাল আসক্তি আর নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণি বা বয়সের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই

Digital Addiction Rising Mental Health Crisis

চিত্র- AI

বিশ্বজিৎ বৈদ্য (গবেষক, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়): ডিজিটাল আসক্তি বলতে অনেকেই এখনও হালকাভাবে ‘বেশি মোবাইল ঘাঁটা’ বলে ধরে নেন। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি জটিল মানসিক প্রক্রিয়া, যেখানে ব্যক্তি স্ক্রিন ছাড়া নিজেকে অস্বস্তিকর, উদ্বিগ্ন বা শূন্য মনে করে। ফোন হাতে না থাকলে অস্থিরতা, বারবার নোটিফিকেশন চেক করার তাগিদ, কাজের ফাঁকেও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকে পড়া— এসব আচরণ আজ এতটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে যে আমরা আর এগুলোকে সমস্যার লক্ষণ বলেই ভাবি না। অথচ এই ‘স্বাভাবিকতা’র মধ্যেই লুকিয়ে আছে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক বিপর্যয়ের বীজ। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো— ডিজিটাল আসক্তি আর নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণি বা বয়সের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিশু থেকে প্রবীণ, ছাত্র থেকে কর্মজীবী, শহর থেকে গ্রাম— সব স্তরেই এর বিস্তার ঘটছে। সস্তা স্মার্টফোন ও সহজলভ্য ইন্টারনেট ডিজিটাল বিভাজন যেমন কমিয়েছে, তেমনই এক নতুন ধরনের মানসিক ঝুঁকিও তৈরি করেছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক সচেতনতা ও পরিকাঠামো এখনও দুর্বল, সেখানে এই সমস্যা ভবিষ্যতে বড় সামাজিক সংকটের রূপ নিতে পারে।

ডিজিটাল আসক্তির সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়ছে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম উদ্বেগ, অবসাদ ও একাকিত্ব বাড়ায়—এ কথা আজ আর কেবল মতামত নয়, বরং গবেষণালব্ধ বাস্তবতা। সামাজিক মাধ্যমের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও জটিল। সেখানে মানুষ নিজের বাস্তব জীবনের বদলে এক ধরনের সাজানো পরিচয় তুলে ধরে। অন্যের সেই ‘পরিপূর্ণ’ জীবন দেখে অনেকেই নিজের জীবনকে ব্যর্থ বা তুচ্ছ মনে করতে শুরু করে। আত্মসম্মানবোধ ক্ষয়ে যায়, আত্মবিশ্বাস দুর্বল হয়। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে এই তুলনামূলক মানসিকতা বিপজ্জনক মাত্রা নিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঘুমের সমস্যা। গভীর রাত পর্যন্ত মোবাইল ব্যবহার, একের পর এক ভিডিও দেখা বা স্ক্রল করার অভ্যাস মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিশ্রাম ব্যাহত করে। নীল আলোর প্রভাবে ঘুমের হরমোন নিঃসরণ কমে যায়। ফলস্বরূপ অনিদ্রা, ক্লান্তি, মনোযোগহীনতা ও মানসিক অস্থিরতা বাড়ে। কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা কমে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মন বসে না। অথচ আমরা এই সমস্যার মূল কারণ হিসেবে খুব কম ক্ষেত্রেই ডিজিটাল আচরণকে চিহ্নিত করি। পারিবারিক জীবনেও এই পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। একসময় পরিবার ছিল কথোপকথনের প্রধান কেন্দ্র। আজ অনেক পরিবারেই দেখা যায়— সবাই এক ঘরে থাকলেও মানসিকভাবে আলাদা। বাবা-মা ফোনে ব্যস্ত, সন্তান গেম বা ভিডিওতে ডুবে— সংলাপের জায়গা দখল করেছে স্ক্রিন। এতে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে, প্রজন্মগত দূরত্ব বাড়ছে। সম্পর্কের জটিলতা ও ভুল বোঝাবুঝি বেড়ে চলেছে, যার দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব আমরা এখনও পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারিনি।

শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে ডিজিটাল আসক্তি আরও উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। অনলাইন গেমিং ও শর্ট ভিডিও কনটেন্ট তাদের মনোযোগের ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। বাস্তব খেলাধুলা, সৃজনশীল চিন্তা ও সামাজিক দক্ষতা গড়ে ওঠার আগেই তারা ভার্চুয়াল জগতের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে আগ্রাসী আচরণ, একগুঁয়েমি ও বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্নতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। অথচ পরিবার ও সমাজ এই সমস্যাকে এখনও প্রায়শই ‘সময়ের প্রভাব’ বলে এড়িয়ে যায়। ভারতীয় প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ উদ্যোগ প্রশাসন ও পরিষেবা ব্যবস্থাকে যেমন গতিশীল করেছে, তেমনই ডিজিটাল নির্ভরতার মাত্রাও বহুগুণ বাড়িয়েছে। গ্রামাঞ্চলেও আজ স্মার্টফোন জীবনের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু সেই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবার বিস্তার সমানতালে ঘটেনি। মানসিক সমস্যাকে এখনও দুর্বলতা হিসেবে দেখার সামাজিক প্রবণতা বিদ্যমান। ফলে অনেকেই সমস্যায় ভুগেও সাহায্য চাইতে সংকোচ বোধ করেন। এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা জরুরি— সমস্যার মূল প্রযুক্তি নয়। প্রযুক্তি নিজে নিরপেক্ষ। প্রশ্ন হলো, আমরা তাকে কীভাবে ব্যবহার করছি। একই ডিজিটাল মাধ্যম আবার মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ছড়াতে পারে, অনলাইন কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে, দূরবর্তী অঞ্চলে সহায়তা পৌঁছে দিতে পারে। অর্থাৎ প্রযুক্তি একদিকে যেমন ঝুঁকি, অন্যদিকে তেমনই সম্ভাবনার ক্ষেত্রও।

তাহলে এই সংকট মোকাবিলার পথ কোথায়? প্রথমত, ব্যক্তিগত স্তরে সংযম ও সচেতনতা। স্ক্রিন টাইম সীমিত করা, নির্দিষ্ট সময়ে ফোন ব্যবহার বন্ধ রাখা, ঘুমের আগে ডিজিটাল ডিভাইস এড়িয়ে চলা— এসব অভ্যাস এখন বিলাসিতা নয়, মানসিক সুস্থতার শর্ত। দ্বিতীয়ত, পরিবারের ভূমিকা। শিশুদের ক্ষেত্রে কেবল নিষেধাজ্ঞা নয়, যুক্তিসহ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে সময় কাটানো, নিয়মিত কথোপকথন মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। পাঠ্যসূচিতে ডিজিটাল লিটারেসি ও মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি। শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ব্যবহার শেখানোর পাশাপাশি প্রযুক্তি থেকে বিরত থাকার গুরুত্বও শেখাতে হবে। চতুর্থত, রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা। অনলাইন গেমিং, বেটিং অ্যাপ ও ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি প্রয়োজন। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।