ad
ad

Breaking News

Climate Impact

ভারতের জলবায়ুর উপর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব

এই পৃথিবী আমাদের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে

Climate Impact How Middle East War Affect Global Environment

চিত্র- AI

ড. সুজীব কর (ভূবিজ্ঞানী): সমগ্র পৃথিবীব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধুমাত্র জলবায়ু পরিবর্তন নয়, এর সাথে ওত‌োঃপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে পার্থিব বাস্তুতন্ত্র এবং সমগ্র পৃথিবীর বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের প্রকৃতি। তাই স্বাভাবিকভাবে এই মুহূর্তে উন্নততর বিশ্বের মানুষেরা যেমন চিন্তিত তেমনি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির কাছেও এই জলবায়ু পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মেরু অঞ্চল এবং পার্বত্য অঞ্চলের তুষাররাশি গলে যাচ্ছে। যার ফলে সমুদ্রের জলস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে বিভিন্ন প্রান্তে, ঘনীভূত হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এই সবকিছুই জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে ত্বরান্বিত হচ্ছে। সুতরাং, সেক্ষেত্রে সভ্য সমাজের মানুষের কাছে এটা অবশ্যই চিন্তার যে আস্তে আস্তে আমরা আমাদের বাসযোগ্য পৃথিবীকে নতুন রূপে দেখতে পাচ্ছি, হয়তো পায়ের তলা থেকে মাটিটাও হারিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত দেশগুলির সমুদ্রতল থেকে ভূমিভাগের উচ্চতা পরোক্ষভাবে নির্দেশ করে যে অদূর ভবিষ্যতে এই সমস্ত দেশগুলি জলের তলায় তলিয়ে যাবে। এতদসত্বেও আধুনিক বিশ্বের উন্নততর মানুষ, উন্নততর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চেতনা যাদের মস্তিষ্কে অবস্থান করছে তারা কিন্তু বুঝতে পারছেন না যে এই পৃথিবী আমাদের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

সুতরাং, যেকোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের অনেক বেশি সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। তথাপি সমগ্র পৃথিবীব্যাপী সেই ধরনের ধনাত্মক চিন্তার কোন প্রভাব লক্ষ করা যায় না, বরং মধ্যপ্রাচ্যে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলি তাদের যুদ্ধের দামাবাজিতে সমগ্র বিশ্বকে আরও বেশি করে দূষণের জর্জরিত করে দিতে চাইছে। হয়তো এর ফলে যুদ্ধের আস্ফালন নিবৃত্তি হবে, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে সমগ্র পৃথিবী মানুষের বসবাসের ক্ষেত্রে অযোগ্য হয়ে উঠবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং তার প্রভাব কেবল সেই অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি, রাজনীতি এবং পরিবেশের ওপরও পড়বে। ভারত ভৌগোলিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের কাছাকাছি হওয়ায় এবং অর্থনৈতিকভাবে ওই অঞ্চলের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকায়, সেখানে সংঘটিত যুদ্ধ ভারতের জলবায়ুতেও পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। এই প্রভাব সরাসরি নয়, বরং বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে প্রকাশ পাবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক দূষণ সৃষ্টি করছে।

এগুলোর প্রধান দিকগুলো সংক্ষেপে নিচে দেওয়া হল—
১. বিষাক্ত গ্যাস নির্গমন : বোমা বিস্ফোরণ ও আগুন লাগার ফলে কার্বন মনোক্সাইড (CO), নাইট্রোজেন অক্সাইড (NOx), সালফার ডাই অক্সাইড (SO₂) তৈরি হচ্ছে। এগুলো শ্বাসযন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
২. সূক্ষ্ম কণিকা (Particulate Matter – PM2.5, PM10) : ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন, ধুলো ও ধোঁয়া থেকে ক্ষুদ্র কণিকা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে যা ফুসফুসে প্রবেশ করে অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিস ইত্যাদি রোগ সৃষ্টি করতে পারে।
৩. বিষাক্ত ধাতু ও রাসায়নিক : অস্ত্র ও বিস্ফোরকে থাকা সিসা (Lead), পারদ (Mercury), ক্যাডমিয়াম (Cadmium) বাতাসে ছড়ায় যা দীর্ঘমেয়াদে স্নায়ুতন্ত্র ও কিডনির ক্ষতি করে।
৪. জৈব দূষক (Organic Pollutants) : পোড়া প্লাস্টিক, জ্বালানি ও রাসায়নিক থেকে ডাইঅক্সিন (Dioxins), ফিউরান (Furans) উৎপন্ন হয়। এগুলো ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
৫. ধোঁয়া ও কালো কার্বন (Black Carbon) : তেলক্ষেত্র বা স্থাপনায় আগুন লাগলে প্রচুর কালো ধোঁয়া তৈরি হয়। এটি বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে এবং জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।
৬. ওজোন গঠন (Ground-level Ozone) : NOx ও VOCs (Volatile Organic Compounds) সূর্যালোকের সঙ্গে বিক্রিয়া করে নিম্ন স্তরে ওজোন গ্যাস তৈরি করে। এটি চোখ জ্বালা, শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি করে।
এর ফলে যা ঘটতে চলেছে সেগুলি হল নিম্নরূপ :
প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ফলে বায়ুমণ্ডলে দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে। যুদ্ধের সময় ব্যাপকভাবে বোমা বিস্ফোরণ, তেলক্ষেত্রে আগুন লাগা, এবং বিভিন্ন ধরনের সামরিক কার্যকলাপের ফলে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া, কার্বন ডাই অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং অন্যান্য ক্ষতিকর গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়বে। এই দূষিত কণাগুলি বায়ু প্রবাহের মাধ্যমে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে চলে যেতে পারে। ভারতীয় উপমহাদেশে পশ্চিম দিক থেকে আসা বায়ুপ্রবাহ এই দূষিত কণাগুলিকে নিয়ে আসতে পারে, যার ফলে ভারতের বায়ুর গুণগত মান অনেকাংশে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, এই ধরনের যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রার ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ গ্রিনহাউস প্রভাবকে বাড়িয়ে তুলবে, যার ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ত্বরান্বিত হবে। ভারত ইতিমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, যেমন — অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বর্ষা, এবং ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বৃদ্ধি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে এর ফলে সৃষ্ট অতিরিক্ত দূষণ এই সমস্যাগুলিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তৃতীয়ত, যুদ্ধের কারণে সমুদ্রপথে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এর অর্থনৈতিক প্রভাব ভারতের ওপর পড়তে শুরু করেছে, যা পরোক্ষভাবে পরিবেশেও প্রভাব ফেলে। তেলের দাম বেড়ে গেলে ভারত বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে পারে, যা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে একইসঙ্গে, কিছু ক্ষেত্রে সস্তা কিন্তু বেশি দূষণকারী জ্বালানির ব্যবহার বাড়তে পারে, যা বায়ুদূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা বাড়িয়ে তুলতে পারে। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক চাপ পরিবেশগত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

চতুর্থত, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ফলে ধূলিকণা বা ‘ডাস্ট ট্রান্সপোর্ট’ বেড়ে যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে যুদ্ধের কারণে মাটির উপরের স্তর নষ্ট হয়ে গেলে, বাতাসে ধূলিকণার পরিমাণ বেড়ে যায়। এই ধূলিকণা পশ্চিম এশিয়া থেকে ভারত পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিম ভারতের অঞ্চলে। এর ফলে বায়ুদূষণ বৃদ্ধি, আকাশের স্বচ্ছতা হ্রাস এবং সূর্যালোকের প্রবাহে পরিবর্তন ঘটে, যা স্থানীয় জলবায়ুকে প্রভাবিত করতে পারে।
পঞ্চমত, যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একটি বড় বাধা। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু চুক্তি, যেমন কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ, এগুলো বাস্তবায়নের জন্য দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু যখন বড় শক্তিগুলি যুদ্ধ বা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, তখন তাদের অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হয় এবং পরিবেশ সংক্রান্ত উদ্যোগগুলো পিছিয়ে পড়ে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলি আরও বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
ষষ্ঠত, যুদ্ধের কারণে শরণার্থী সমস্যা তৈরি হয়, যা পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ায়। যদিও এই প্রভাব সরাসরি ভারতের ক্ষেত্রে কম, তবে বৈশ্বিক পর্যায়ে এর প্রভাব পড়ে। শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য নতুন বসতি স্থাপন, বনভূমি উজাড়, এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে। এর ফলস্বরূপ জলবায়ু পরিবর্তনের গতি বাড়ে, যার প্রভাব বিশ্বব্যাপী, এমনকি ভারতেও অনুভূত হয়।
সপ্তমত, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সমুদ্রপথে দূষণ বাড়াতে পারে, বিশেষ করে যদি তেলবাহী জাহাজে আক্রমণ বা দুর্ঘটনা ঘটে। এই ধরনের তেল ছড়িয়ে পড়লে তা (oil spill) সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংস করে এবং সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। ভারত মহাসাগরের পরিবেশে এর প্রভাব পড়লে ভারতের উপকূলীয় জলবায়ু, মৎস্য সম্পদ এবং জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অষ্টমত, যুদ্ধের কারণে প্রযুক্তিগত এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়ে। অনেক সময় দেশগুলি তাদের বাজেটের বড় অংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করে, যার ফলে পরিবেশ ও জলবায়ু সংক্রান্ত গবেষণায় বিনিয়োগ কমে যায়। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় নতুন প্রযুক্তি বা সমাধান আবিষ্কারের গতি ধীর হয়ে যায়, যা ভারতের মতো দেশগুলির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে এটি উল্লেখ করা জরুরি যে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ভারতের জলবায়ুর ওপর সরাসরি এবং তাৎক্ষণিক কোনো বড় পরিবর্তন আনবে না। বরং এর প্রভাব ধীরে ধীরে এবং পরোক্ষভাবে অনুভূত হবে। এই প্রভাবগুলির মাত্রা নির্ভর করে যুদ্ধের স্থায়িত্ব, তীব্রতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ওপর। শেষে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ একটি আঞ্চলিক ঘটনা হলেও এর প্রভাব বৈশ্বিক, এবং ভারতও তার বাইরে নয়। বায়ুদূষণ, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, অর্থনৈতিক চাপ, এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ঘাটতির মাধ্যমে এই যুদ্ধ ভারতের জলবায়ুকে প্রভাবিত করতে পারে। মানুষ আজ বিপন্ন বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জলবায়ুগত ভারসাম্য, তাই কোনোভাবেই প্রকৃতিকে ক্ষতিসাধন করতে পারে এমন বিষয়গুলিকে ছোট করে দেখার উচিত হবে না। আমাদেরকে প্রত্যেকটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ফেলতে হবে, নতুবা কিছুদিনে এই ধরনের যুদ্ধগুলি সমগ্র পৃথিবী থেকে মানব সভ্যতার ইতিহাসকে মুছে দিতে পারে। আজ তাই সময় এসেছে নতুন করে ভাবার এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নত বা অনুন্নত বিশ্বে মানুষের মধ্যে সঠিক চিন্তা-ভাবনা জাগরিত হবার নতুবা আমরা চিরতরে হারিয়ে ফেলবো আমাদের বাসযোগ্য পার্থিব এই পরিমণ্ডলকে। তাই শুধুমাত্র আঞ্চলিক শান্তি নয়, বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাও জলবায়ু রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের উচিত এই প্রেক্ষাপটে নিজস্ব পরিবেশ নীতি শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করা, যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের পরোক্ষ প্রভাব কমিয়ে আনা যায়।