চিত্র: সংগৃহীত
সত্যগোপাল দে (সাংবাদিক, শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং সাইকোলজিকাল কাউন্সেলর): প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের লেখা এবং গাওয়া হৃদয়স্পর্শী গানটির কথা মনে আছে নিশ্চয় সেই গানের কথার কিছু অংশ আবার আপনাদের শোনাই– “ছোট ছোট দুটো পা’ ছোট দুই হাত/ দু’টাকায় খেটে খায় ভোর থেকে রাত/ গালি খায় লাথি খায় করে মাথা হেট/ তার দিকে চেয়ে রয় কত খালি পেট/ তাই মুখ বুজে খেটে যায় ভোর থেকে রাত/ ছোট ছোট দুটো পা’ ছোট দুই হাত” (Child Labour)।
কারা খাটে ভোর থেকে রাত? আর কাদেরই বা ছোট ছোট দুটো পা, ছোট দুই হাত? কি উত্তরটা কি দেওয়া যাবে? এরা আর কেউ নয়, সমগ্র বিশ্ব-সহ আমাদের দেশের অগণিত শিশু শ্রমিক।
একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই, অবশ্য ঠিক অন্য প্রসঙ্গ বলা যাবে না। প্রসঙ্গ যাই হোক, শোনাই যাক প্রসঙ্গটা কী। কিছুদিন আগে দীপাবলি পার হয়ে গেল। দীপাবলি মানেই তো অন্ধকারের উৎস থেকে উৎসারিত আলো। দীপাবলি এবং কালীপুজাকে কেন্দ্র করে কলকাতা-সহ দেশের বিভিন্নপ্রান্তে পসরা সাজিয়েছিলেন আতস বাজির পাইকারি এবং খুচরো বিক্রেতারা। জমে উঠেছিল বাজির বাজার। ময়দান থেকে বাজির বাজার স্থানান্তরিত হলেও ক্রেতাদের উৎসাহে কিন্ত ভাটা পড়েনি। কথা হল, অমানিশার অন্ধকারের উৎস থেকেই তো দীপাবলির আলো উৎসারিত হয়। সেই আলোর দীপ্তিতেই জ্বলে ওঠে রঙিন রংমশাল, উজ্জ্বল হয়ে ওঠে আমাদের ঘর, বারান্দা, উঠোন। কিন্তু যখন আমরা আনন্দে মেতে উঠি, বাজি কিনি কিংবা বাজি পোড়াই, তখন কি একবারও মনে পড়ে— প্রতি মুহূর্তে এই বাজির সঙ্গে পুড়ে যাচ্ছে অগণিত শিশুর শৈশব (Child Labour)?
প্রদীপের তলা যেমন চিরকালীন অন্ধকার, তেমনই দীপাবলির ঝলমলে আলোতেও অদৃশ্য থেকে যায় হাজার হাজার শিশুর কান্না। আলোর উৎসব তো দূরের কথা তাদের জীবনে কি সত্যি কোন আলো আছে? আছে কেবল দারিদ্র্য, ভয় আর অন্ধকারের এক অনন্ত গহ্বর। তথ্যসূত্র বলছে, আমাদের দেশের আতসবাজি শিল্পের বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৩,০০০ থেকে ৬,০০০ কোটি টাকা। এই তথ্যটি কয়েক বছর আগের। অথচ এই বিশাল শিল্পের একটি বড় অংশের ভার বহন করছে শিশু শ্রমিকরা— যাদের বয়স ৫ থেকে ১৮ বছরেরও কম।
তাদের কোমল হাতেই গড়ে ওঠে আমাদের উৎসবের আলোকছটা। অথচ সেই হাতই প্রতিদিন জ্বলছে গন্ধক ও রাসায়নিকের দগ্ধ আগুনে। দীপাবলির আলোয় যখন আমরা সুখ দেখি, তারা তখন অন্ধকারে হারিয়ে যায়— নামহীন, অধিকারহীন, অদেখা এক বাস্তবতার ভেতরে।
২০১১ সালের ভারতের জাতীয় আদমসুমারির তথ্য আরও এক কঠিন সত্য সামনে আনে— ৫ থেকে ১৪ বছর বয়সী মোট ২৫৯.৬৪ মিলিয়ন শিশুর মধ্যে ১০.১ মিলিয়ন শিশু তখনও শিশুশ্রমে যুক্ত। এদের এক বড় অংশ কাজ করে বাজি কারখানায়— বিশেষ করে বেআইনি বাজি কারখানাগুলোয়। যেখানে সুরক্ষা মান, বড়দের জন্য শ্রমিকের অধিকার কিংবা শিশুর জীবনের মূল্য— সবকিছুই অবহেলিত (Child Labour)।
এই সব কারখানার অন্ধকারে তাদের প্রতিদিনের কাজ মানে মৃত্যুর মুখোমুখি জীবনের লড়াই। বারুদ, সালফার, ফসফরাস— এইসব বিষাক্ত রাসায়নিকের মধ্যে তারা দিন কাটায়, হাতে লাগে ক্ষত, ফুসফুসে জমে বিষ। অথচ তাদের তৈরি বাজিতেই আমরা আলোর উৎসব উদযাপন করি।
আমাদের দেশের বাজি কারখানাগুলির অধিকাংশই অবস্থিত তামিলনাডুর শিবকাশী, বিরুধনগর অঞ্চলে। কয়েক বছর আগের এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সমীক্ষায় প্রকাশ, দেড় লক্ষের মতো শিশু শ্রমিক এই অঞ্চলে বাজি তৈরির সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া উত্তর প্রদেশের বারাণসী, মধ্যপ্রদেশের ভোপাল, রাজস্থানের জয়পুর, বিকানের সহ আমাদের রাজ্যের হাওড়া, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় বেশ কিছু অঞ্চলে শিশু শ্রমিকরা বাজি তৈরির সঙ্গে যুক্ত। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নারী, শিশু সমাজ কল্যাণ দফতর, শ্রম দফতর এবং রাজ্যের শিশু অধিকার সুরক্ষা আয়োগ যৌথভাবে শিশুশ্রম নিবারণে বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য জনচেতনামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
বাজি কারখানায় শিশুশ্রমিক নিয়োগের রয়েছে এক দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। তথ্যসূত্র অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় যে তামিলনাড়ুর শিবকাশী অঞ্চলের বাজি কারখানাগুলিতে প্রায় ৩,০০০ এবং দেশলাই কারখানায় প্রায় ৩০,০০০ শিশুশ্রমিক কর্মরত ছিল।
সময় গড়িয়েছে, কিন্তু পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। জাতীয় শিশু সুরক্ষা কমিশনের ২০১৩ সালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়— শিবকাশী অঞ্চলে নিরাপত্তাজনিত বিধিনিয়মের অভাবে এক বছরের মধ্যে অন্তত ২৩৭ জন শ্রমিকের মৃত্যু ঘটেছে, যাদের অধিকাংশই ছিল শিশু। এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান শুধু দুর্ঘটনা নয়, আমাদের সমাজ ও প্রশাসনের ব্যর্থতার এক মর্মন্তুদ দলিলও বটে (Child Labour)।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুশ্রমের সবচেয়ে বেশি প্রভাব দেখা যায় লাইসেন্সবিহীন গৃহভিত্তিক কারখানাগুলিতে। এই সব কারখানা মূলত বড় কোম্পানিগুলির সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করে, ফলে শিশুরা থাকে নজরদারির বাইরে। তাদের নাম নেই কোনও শ্রমিক তালিকায়, নেই কোনও বিমা বা সুরক্ষা সুবিধা।
বেআইনি, ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা লাইসেন্সবিহীন বাজি কারখানাগুলিতে নেই নিরাপত্তার ন্যূনতম বালাই, নেই কোনও প্রশিক্ষিত শ্রমিক বা মানসম্মত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তাই দুর্ঘটনার খবর সংবাদপত্রের পাতায় প্রায়ই চোখে পড়ে। অসাবধানতা, ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতি বা রাসায়নিকের ভুল মিশ্রণে শিশুশ্রমিকদের অঙ্গহানি এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক কালে বিরুধনগর, পশ্চিমবঙ্গের কোলাঘাট ও নৈহাটির বিস্ফোরণের ঘটনা আমরা সবাই জানি। এইসব কারখানা অধিকাংশই বেআইনি, ফলে দুর্ঘটনার পর অনেক সময় ক্ষতিপূরণও মেলে না। দেশজুড়ে এমন অগণিত ঘটনা নথিভুক্ত না হওয়ায় জাতীয় স্তরের শিশুর অধিকার সম্পর্কিত পরিসংখ্যান থেকেও এই করুণ বাস্তবতা আড়ালেই থেকে যায়।
ভারতে শিশুশ্রম সংক্রান্ত আইন ১৯৮৬ অনুযায়ী ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের ১৮টি পেশা ও ৫৭টি বিপজ্জনক ক্ষেত্রে নিয়োগ নিষিদ্ধ ছিল। এই বিপজ্জনক ক্ষেত্রগুলির মধ্যে বাজি তৈরি অন্যতম। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে আইনটি সংশোধিত হয়। বিনামূল্যে এবং বাধ্যতামূলক শিক্ষা আইনের অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই সংশোধন অনুযায়ী ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত সব ধরনের শ্রম— বিপজ্জনক হোক বা না হোক— নিষিদ্ধ করা হয়।
তবে ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে খনি আইন, দাহ্য ও বিস্ফোরক আইন এবং কারখানা আইন অনুযায়ী বিপজ্জনক কাজ ছাড়া অন্য কাজে নিয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু এই সংশোধনের অন্যতম বিতর্কিত দিক হল ‘পারিবারিক ব্যবসা’-র ক্ষেত্রে শিশুদের নিয়োগে ছাড়। শর্ত দেওয়া হয়েছে, কাজটি যেন ঝুঁকিপূর্ণ না হয় এবং কেবলমাত্র স্কুল ছুটির পর বা স্কুল ছুটির সময়ই করা যায়। বাস্তবে, এই আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে বহু পরিবার ‘পারিবারিক ব্যবসা’র নামেই শিশুদের বিপজ্জনক বাজি তৈরির কাজে যুক্ত রাখছে— যা সর্বজনবিদিত অথচ প্রমাণের অভাবে আড়ালেই থেকে যায় (Child Labour)।
আমাদের দেশের শিশু কল্যাণমূলক নীতিমালা ও আইনগুলির মধ্যেও এক গভীর বৈপরীত্য বিদ্যমান। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ, ১৯৮৯ অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে সকলকেই শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়। ভারত সরকার এই আন্তর্জাতিক আইনটি ১৯৯২ সালে অনুমোদন করেছে। কিন্তু ভারতের শিশুশ্রম আইনে শিশু বলতে বোঝানো হয় ১৪ বছরের নিচের শিশু; জাতীয় শিশু নীতিমালা ২০১৩ অনুযায়ী সেই বয়সসীমা ১৮, আর বিনামূল্যে বাধ্যতামূলক শিক্ষার আইন অনুসারে ১৪ বছর।
প্রশ্ন থেকেই যায়— নীতি ও আইনগুলির এই অমিল কেন? ভারত সরকার যখন আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তখন কি সমস্ত জাতীয় আইন ও নীতিমালা সেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংশোধন করা উচিত নয়?
যদি শিশুর সুরক্ষা ও শিক্ষা আমাদের মৌলিক অঙ্গীকার হয়, তবে এই দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে প্রতিটি শিশুর শৈশবকে নিরাপদ, শিক্ষিত ও আলোকিত করার দায় আমাদেরই নিতে হবে।
শিশুশ্রম নিরোধক আইন অনুযায়ী ১৪ বছরের কম বয়সী শিশু শ্রমিক নিয়োজিত হলে নিয়োগকারীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা আছে। আইন অনুসারে, এমন অপরাধ প্রমাণিত হলে নিয়োগকারীকে ন্যূনতম ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা দিতে হয়, এবং সেই অর্থ শিশু শ্রমিকদের উদ্ধার, পুনর্বাসন ও শিক্ষার জন্য ব্যয় হওয়ার কথা।
কিন্তু প্রশ্ন হল— বাস্তবে কি এই আইন প্রয়োগ হচ্ছে? কতজন নিয়োগকারীর কাছ থেকে এই জরিমানা আদায় হয়েছে, জাতীয় বা রাজ্যস্তরে তার কোনও গ্রহণযোগ্য নথি কি আদৌ আছে? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তর ‘না’। আইন রয়েছে, কিন্তু তার কার্যকর প্রয়োগে অভাব রয়েছে তদারকির, দায়বদ্ধতার এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার। ফলে শিশুশ্রম নির্মূলের পথ এখনও দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ।
আজও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে বেআইনি বাজি কারখানাগুলিতে ‘বিস্ফোরক আইন’ ও ‘কারখানা আইন’ এবং শিশু শ্রম (নিষেধ এবং নিয়ন্ত্রণ) আইন— সব আইনকেই বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে চলছে অবাধ ব্যবসা। এই বেআইনি কারখানাগুলি প্রশাসনের নাকের ডগায় গজিয়ে উঠছে, আবার কোনও দুর্ঘটনা ঘটলেই মুহূর্তে অদৃশ্যও হয়ে যাচ্ছে।
এই ব্যবসার আড়ালেই প্রতিদিন লাঞ্ছিত হচ্ছে অসংখ্য শৈশব— যাদের চোখে উৎসবের আলো নয়, জ্বলে ওঠে কেবল আগুনের শিখা আর বারুদের দহন (Child Labour)।