ad
ad

Breaking News

sir

এসআইআর না ঘুরপথে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থান?

সেই আইন মোতাবেক আবেদনকারী নাগরিকত্ব পেতেন আর বর্তমানে অর্থাৎ ২০১৯-এ সংশোধিত হয়ে তা নাগরিকত্ব কাড়ার হাতিয়ার হয়েছে।

caa-nrc-debate-india-political-analysis

চিত্রঃ নিজস্ব গ্রাফিক্স

সুমন রায় চৌধুরী:  উত্তর-সত্য যুগে সত্য তাই যা তোমার মনপসন্দ। দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রের শাসক বিজেপি এক সত্য লালন করে চলেছে যা বর্তমান ভারতের অবস্থান থেকে বহু দূরে, এনআরসি বা সিএএ নিয়ে ভারতবর্ষকে মাতিয়ে বা বলা ভাল শাসিয়ে চলেছে, তার উপযোগিতা কতটা সেটা অবশ্যই সময় বলবে কিন্তু ভোটের বাজার গরম রাখতে এর জুড়ি মেলা ভার।

সিএএ-তে কী ভাবে আবেদন করতে হবে, আজও সঠিক পদ্ধতি এবং নিয়ম কানুন অজানা মানুষের। কারণ যে আইন ১৯৫১ সালে আনার প্রয়োজন হয়েছিল তার প্রেক্ষিত ও উপযোগিতা দুই-ই আজকের আইনের থেকে ভিন্ন। সেই আইন মোতাবেক আবেদনকারী নাগরিকত্ব পেতেন আর বর্তমানে অর্থাৎ ২০১৯-এ সংশোধিত হয়ে তা নাগরিকত্ব কাড়ার হাতিয়ার হয়েছে। এই আইন বর্তমানে শুধুমাত্র অসমে ব্যবহার্য এবং তার কারণও আলাদা। তাই জাতীয় কংগ্রেস তার সরাসরি বিরোধিতা করেনি, তবে সেক্ষেত্রেও ত্রুটি বিচ্যুতি আছে। রাম মন্দির প্রতিষ্ঠা বা কাশ্মীর থেকে ৩৭০ বিলোপ একটি রাজনৈতিক দলের অ্যাজেন্ডা হতেই পারে। তবে কেন্দ্রের শাসক দল যখন তা ব্যবহার করে সংখ্যাগুরুদের ভোট কুক্ষিগত করার চেষ্টা করে এবং দেশের রাজনৈতিজ চরিত্র পরিবর্তনের চেষ্টা করে তখন প্রশ্ন উঠবে বইকি! আর সেই সুযোগে বিভিন্ন রাজ্যের আঞ্চলিক দলগুলি সংখ্যালঘুদের ভোট তাদের নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করেছে। সিএএ নিয়ে কংগ্রেসের একটাই বক্তব্য, ধর্মীয় নিপীড়নের যারা শিকার পার্শ্ববর্তী দেশগুলিতে, তাদের সবাই কেন আশ্রয় ও নাগরিকত্ব পাবে না? শুধুই হিন্দুরা কেন? আইন তো বলে সংখ্যালঘু নিপীড়িত মানুষ আশ্রয় পাবে। মুসলমানদের মধ্যেও অনেক শ্রেণি আছে যারা পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে অত্যাচারের শিকার, জৈন, বৌদ্ধ ধর্মের মানুষ আছেন এই দেশগুলিতে যারা নিপীড়িত, অথবা মায়ানমারের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়, তারা কেন সাংবিধানিক ভাবে বৈধ আশ্রয় পাবে না? আর এখানেই খেলা। বিজেপি পরিষ্কার ভাবে সংখ্যাগুরু ভোট ব্যাঙ্ককে নিশানা করে এই সিএএ প্রণয়ন করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

মাঝদরিয়াতে কারা? সাধারণ মানুষ যাদের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের দাবি আজ সঙ্কটাপন্ন। টাকার দাম দিন দিন চড়ছে, সোনার দাম আকাশ ভেদ করে গেছে, বেকারিতে দেশ তুঙ্গে, ‘গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে’-এ ভারতের নাম প্রায় তলিয়েই গেছে। অথচ সরকার নির্বিকল্প সমাধি নিয়েছে।

এনআরসি নিয়ে বিবাদ আজকের নয়। কিন্তু এসআইআর-এ সঙ্গে একে গুলিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা সরকারের ধূর্তামির নিদর্শন। ভোটাধিকার ও ধর্মীয় অস্তিত্বকে বিলোপ করার এক ঐকান্তিক প্রয়াস। সারা ভারতবর্ষ জুড়ে শোনা যায়, ডিলিমিটেশন আগামী দিনে এমন ভাবে হবে যাতে কোনও লোকসভা কেন্দ্রতেই সংখ্যালঘু ভোট সংশ্লিষ্ট আসনটি জেতার নির্ণায়ক না হয়। এই এক বিভাজিত ভারতের গল্প লিখতে চাইছে আজকের শাসক দল। তারা শক্তিশালী তাই বদলাতে হচ্ছে ইতিহাসকেও, তোপের মুখে রবীন্দ্রনাথ, এখানেও বিভাজন করার অভিসন্ধি বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে। তবে কি এভাবেই বিজেপি বিরচিত ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থান’-এর দিকে এগোচ্ছে দেশ? প্রশ্ন অনেক আর উত্তর অধরা।

প্রথম যখন এনডিএ সরকার এসেছিল, প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর ন্যারেটিভ ছিল, ‘ভারতবর্ষ, ভারতবর্ষই থাকবে না যদি সেটা ধর্মনিরপেক্ষ না থাকে’, আজ তাঁর উত্তরসূরিরা আরএসএস-এর ভাষায় কথা বলছে, সেই আরএসএস যারা এককালে এদেশে জামাতের মতো নিষিদ্ধ ছিল। ক্ষমতার শক্তি আর সাম্প্রদায়িকতার নেশায় মত্ত বিজেপি পূর্বসূরির কথাও খেয়াল রাখেনি।

শুধু ইসলাম ধর্মাবলম্বী নয় দেশে খ্রিস্টান্দের ওপরও অনেক অত্যাচার হয়েছে, ওড়িশার ধর্মযাজক গ্রাহাম স্টেইন্সকে ভোলা কি সহজ!

এবার আসি অধুনা ফরমান এসআরআই-এ। স্বাধীনতার পর আমাদের দেশ আটবার এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে গেছে, কিন্তু কখনও মানুষের মৃত্যু ঘটেনি, যদিও ঘটনা তদন্ত সাপেক্ষ, তথাপি এমন আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করাই আইনত দণ্ডনীয়। বাংলার প্রেক্ষিতে বলতে গেলেই বিহার ও মহারাষ্ট্রের কথা উঠবে, আসবে ব্রাজিলিয়ান মডেলের কথা। মহারাষ্ট্রে দেখা গেল একটা ঠিকানায় বলা ভাল একটি ঘরে ৮০ জন ভোটারের বাস, আবার এটাও দেখলাম একজন ভোটারের চার রাজ্যে চারটি বিভিন্ন ঠিকানায় এপিক আছে। ব্যবহার করা হয়েছে বিদেশি মডেলের ছবি। রাহুল গান্ধির পরপর ৩টি ঐতিহাসিক সাংবাদিক সম্মেলন প্রমাণ করে দিয়েছেন বিহারে ৪৪ লক্ষ নাম বাদ গেছে তার পিছনে নির্বাচন কমিশনের অভিসন্ধি সাধু কি?

লোকসভার বিরোধী দলনেতা অভিযোগ তুললে জ্ঞানেশবাবু বলেন, এফিডেভিট করে বক্তব্য নাকি জমা দিতে হবে কিন্তু অনুরাগ ঠাকুরের ক্ষেত্রে ‘সারে নিয়ম তোর দো, নিয়ম পে চল না ছোড় দো’ গাইছেন। হরিয়ানা বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের হারের পিছনে নির্বাচন কমিশনের ষড়যন্ত্র আজ সর্বজনবিদিত।

আরও মজার ব্যাপার, নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্ন করলে উত্তর দেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। সেই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সংযোজন, কংগ্রেসের বুথ কর্মী নাকি যথেষ্ট ছিল না, ঘন হয় সন্দেহ।

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ‘সিজার্স ওয়াইফ’-এর মতো হতে হবে এমন ভাবনা কংগ্রেসের ছিল, সংবিধানও তাকে স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দিয়েছে বলে জানি, এখন কি তা হলে ওটা এবিভিপির-ই মতো আর একটি শাখা সংগঠন? জানতে মন চায়! বাংলার বিরোধী দলনেতা বাংলায় ১ কোটি নাম বাদ যাবে বলছেন? ওদিকে বিহারে ২২ লাখ সংখ্যালঘু মহিলা ভোটার বাদ গেছে।

আমার দল জাতীয় কংগ্রেস এসআইআর বিরোধী নয়, কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এসআইআর-এর অবশ্যই বিরোধী।

তামিলনাডুর ডিএমকে-এর মতো বাংলার কংগ্রেস সভাপতিও সুপ্রিম কোর্টে কড়া নেড়েছেন। কারণ কিছু প্রশ্ন তুলতেই হয়,

১. হঠাৎ তিন মাসের মধ্যে বাংলায় এসআইআর শেষ করতে হবে কেন?

২. ২০০২-এর ভোটার লিস্টকে ভিত্তি করতে হবে কেন?

৩. বাংলায় ডিলিমিটেশনের পর যে কোনও একটি বছর অথবা ২০২৪-এর ভোটার লিস্টকে মানদণ্ড করা হবে না কেন?

৪. এসআইআর নোটিফিকেশনের আগে সর্বদলীয় মিটিং করা হল না কেন?

সর্বোপরি যুক্তি বুঝুন, ১৯৮৭-এর আগে যাদের জন্ম, তাদের নিজেদের নথি জমা দিলেই হবে। ১৯৮৭-র পরে যাদের জন্ম তাদের নিজেদের আর বাবা বা মা– একজনের নথি জমা দিতে হবে। আর ২০০৪ সালের পরে যারা জন্মেছেন, সেক্ষেত্রে নিজের, তার মা ও তার বাবার নথিও জমা করতে হবে। এটা কি ঘুরপথে এনআরসি নয়? গন্ধটা কিন্তু নিঃসন্দেহে সন্দেহজনক। আর এই ডামাডোলে ভীত সন্ত্রস্ত সাধারণ মানুষ মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। ভয়ের বাতাবরণ তৈরি হচ্ছে।