ad
ad

Breaking News

Bratya Basu

শেক্সপিয়ারের ট্র্যাজেডিকে ভারতীয় রাজপরিবারে এনে মঞ্চে ফিরছেন ব্রাত্য, পরিচালনায় অর্পিতা

আমাদের মনে রাখতে হবে, যে ব্রাত্য বসু এর আগেও শেক্সপিয়ারের ‘হ্যামলেট’ থেকে ‘হেমলাট প্রিন্স অব গরানহাটা’ করেছেন যেমন, তেমনই ‘টুয়েলফ্থ নাইট’ থেকে ‘মুম্বাই নাইটস’ পরিচালনা করেছেন।

Bratya Basu Returns with Shakespeare Adaptation

গ্রাফিক্স: নিজস্ব

সুমন ভট্টাচার্য (বিশিষ্ট সাংবাদিক): শেক্সপিয়ারের ট্র্যাজেডিকে ভারতীয় রাজবংশে এনে তাঁর নতুন নাটক ‘মাৎস্যন্যায়’ নিয়ে ফিরছেন জনপ্রিয় নাট্যকার, লেখক এবং অভিনেতা ব্রাত্য বসু (Bratya Basu) স্বয়ং। ব্রাত্য বসুর এই নতুন নাটকের নাম ‘মাৎস্যন্যায়’, যা আজ গিরিশ মঞ্চে প্রথম মঞ্চস্থ হতে চলেছে। নাটকের পরিচালনায় বাংলা নাটকের আর এক খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব অর্পিতা ঘোষ আর অভিনয় করছেন মিনার্ভা রেপার্টারির সদস্যরা। আমাদের মনে রাখতে হবে, যে ব্রাত্য বসু এর আগেও শেক্সপিয়ারের ‘হ্যামলেট’ থেকে ‘হেমলাট প্রিন্স অব গরানহাটা’ করেছেন যেমন, তেমনই ‘টুয়েলফ্থ নাইট’ থেকে ‘মুম্বাই নাইটস’ পরিচালনা করেছেন।

‘মুম্বাই নাইটস’ ও মিনার্ভা রেপার্টারিরই প্রযোজনা ছিল। ‘মুম্বাই নাইটস’-এ গৌতম হালদারের স্মরণীয় অভিনয় এবং শেষ দৃশ্যে এসে পরিচালক ব্রাত্য বসুরও কুশীলবদের সঙ্গে মঞ্চে পা দোলানো দর্শকরা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি। আর এই মিনার্ভা রেপার্টারি থেকেই বেরিয়ে এসেছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য বা লোকনাথ দে-এর মতো বাংলা নাট্যমঞ্চের জনপ্রিয় অভিনেতারা। অনির্বাণ, যিনি সম্প্রতি ‘হুলি-গান-ইজম’, তাঁর গানের ব্যান্ডের জন্য আলোচনা এবং বিতর্কের কেন্দ্রে, তাঁরও কিন্তু নাট্যজীবনের প্রাথমিক পরিচিতি মিনার্ভা রেপার্টারির নাটক করেই। এবার সেই মিনার্ভা রেপার্টারির নতুন নাটক এবং যে নাটকের নাম খুব তাৎপর্যপূর্ণভাবে ‘মাৎস্যন্যায়’। ব্রাত্য বসুর (Bratya Basu) এই নাটকের অবলম্বন শেক্সপিয়ারের প্রথম ট্র্যাজেডি নাটক ‘টাইটাস অ্যান্ড্রোনিকাস’ আর বাণভট্টের ‘হর্ষচরিত’।

১৫৮৮ থেকে ১৫৯৩-এর মধ্যে লেখা শেক্সপিয়ারের ‘টাইটাস অ্যান্ড্রোনিকাস’ রোম সাম্রাজ্যের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, হিংসা, নারীর উপর আক্রমণ— এই সব কিছুরই এক নিপুণ মঞ্চায়ন ছিল। শেক্সপিয়ারের এই নাটক সেইসময় খুবই জনপ্রিয় ছিল। ব্রাত্য এই নাটককে এনে ফেলেছেন এক ভারতীয় রাজপরিবারে। হর্ষবর্ধন, রাজ্যবর্ধন ও তাঁদের বোন রাজ্যশ্রীর জীবনকে তিনি শেক্সপিয়ারের বিখ্যাত নাটক দিয়ে এক সূত্রে গেঁথেছেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, যে হর্ষবর্ধন ভারতীয় রূপকে যতটা জনপ্রিয়, যতটা সেবক হিসেবে পরিচিত, তেমনই ঘটনাবহুল তাঁদের রাজপরিবারের কাহিনি। শশাঙ্ক, গৌড়ের রাজা শশাঙ্কের হাতে রাজ্যবর্ধনের পরাজয় এবং রাজ্যবর্ধনের মৃত্যুর পর হর্ষবর্ধন-শশাঙ্কের সংঘাত ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

সেই সংঘাত, সেই সব কিছু এবার ‘মাৎস্যন্যায়’ নাটকের মাধ্যমে ব্রাত্য নিয়ে আসছেন মঞ্চে। আর অর্পিতা, ঘটনাচক্রে রাজনীতিক ব্রাত্য বসুর সহযোগী, সেই নাটককে পরিচালনা করছেন। মিনার্ভা রেপার্টারির একদল তরুণ অভিনেতা-অভিনেত্রী অসম্ভব যত্ন এবং পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে এই কঠিন নাটককে এবার মঞ্চে নিয়ে আসছেন। কঠিন বলার কারণ, ‘টাইটাস অ্যান্ড্রোনিকাস’ এক সময় যেমন বহু আলোচিত নাটক, তেমনই তাতে যেভাবে হিংসা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক হানাহানির জন্য নারীর উপরে আক্রমণকে দেখানো হয়েছিল, তা বহু আলোচিত। সেই নাটককেই যখন ব্রাত্য বসু (Bratya Basu) ‘মাৎস্যন্যায়’ নামে মঞ্চে ফিরিয়ে আনেন, তখন তা আলাদা কৌতূহল জাগায়।

‘মাৎস্যন্যায়’ শব্দটির মধ্যে যে সামাজিক, রাজনৈতিক অস্থিরতার উল্লেখ আছে, তাও হয়তো কৌতূহলোদ্দীপক। কারণ, আজকের ভারতবর্ষের রাজনীতিতেও আমরা তো কখনও কখনও এই ‘মাৎস্যন্যায়’-এর উদাহরণই দেখতে পাই। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে এই সময় ‘মাৎস্যন্যায়’ চলছে বলেই তো অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন।

গত তিন দশক ধরে নাট্যকার ব্রাত্য বসু তাঁর বিভিন্ন নাটক নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন। ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ থেকে ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত’ কিংবা ‘অদ্য শেষ রজনী’ তাঁর সেই পরীক্ষানিরীক্ষার উজ্জ্বলতম প্রমাণ। আবার এই যে ফর্মকে ভাঙা এবং চরিত্রকে চেনা বা হিংসার স্বরূপকে উদঘাটন করা, তা তিনি দেখিয়েছেন তাঁর সিনেমা ‘হুব্বা’তে। কিন্তু ‘টাইটাস অ্যান্ড্রোনিকাস’-এর মতো জটিল, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, রোম সম্রাজ্যের টানাপোড়েন, দাসদের সঙ্গে রাজপরিবারের দ্বন্দ্ব, প্রতিশোধের স্পৃহা, এই সব কিছুকেই তিনি এবার কীভাবে একটি ভারতীয় রাজপরিবারে এনে ফেলছেন, তা অবশ্যই বাড়তি কৌতূহল তৈরি করে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, যে শেক্সপিয়ারের ‘টাইটাস অ্যান্ড্রোনিকাস’ ওভিডের ‘মেটামরফোসিস’ অনুপ্রাণিত ছিল বলে অনেকে মনে করেন। সেখানেও গ্রিক সাম্রাজ্যের টানাপোড়েন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, কামনা-বাসনার তীব্র আত্মপ্রকাশ সকলকে আলোড়িত করেছিল। শেক্সপিয়ার ‘টাইটাস অ্যান্ড্রোনিকাস’ যখন লিখছেন, সেই সময়ের সমাজে এই প্রতিহিংসার আখ্যান খুবই জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু ভিক্টোরিয় সমাজ শেক্সপিয়ারের ‘টাইটাস অ্যান্ড্রোনিকাস’-এর মতো নাটককে প্রত্যাখ্যান করে। পরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে আবার ‘টাইটাস অ্যান্ড্রোনিকাস’ জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। কিন্তু শেক্সপিয়ার, বা আরও আগে, ওভিড যেভাবে ‘মেটামরফোসিস’-এ হিংসা, সাম্রাজ্যের দ্বন্দ্বকে দেখিয়েছিলেন, তাকে এবার ব্রাত্য ভারতীয় একটি রাজপরিবারে এনে ফেলছেন।

রাজ্য সরকারের উদ্যোগে চলতে থাকা মিনার্ভা রেপার্টারির সপ্তম ব্যাচের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে তৈরি একটি নাটক। আমাদের মনে রাখতে হবে, মিনার্ভা রেপার্টারি গত দেড় দশকে বারবার আমাদের ঋদ্ধ করেছে সুমন মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘রাজা লিয়ার’, দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘দেবী সর্পমস্তা’ বা ব্রাত্য বসুর পরিচালনায় ‘মুম্বাই নাইটস’-এর মাধ্যমে। মিনার্ভা রেপার্টারি যেভাবে তরুণ এবং নতুন প্রতিভাদের মঞ্চে নিয়ে এসেছে, তা অবশ্যই বাড়তি প্রশংসার জায়গা রাখে। কিন্তু রাজনীতিক ব্রাত্য বসু তাঁর নিজের শত ব্যস্ততার মাঝেও যেভাবে নতুন নাটক নিয়ে ফিরছেন এবং যে নাটকে মিশে আছে শেক্সপিয়ারের বিয়োগান্ত কাহিনির আখ্যান থেকে বাণভট্টের ‘হর্ষচরিত’-এর ছায়া, তা অবশ্যই আলাদাভাবে নাট্যপ্রেমীদের ইতিহাস নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের আকৃষ্ট করবে।

কেন ইতিহাস আর নাট্যচর্চার প্রসঙ্গ টানলাম? অনেকেই বলেন বাণভট্টের ‘হর্ষচরিত’ হচ্ছে ভারতবর্ষের প্রথম ঐতিহাসিক জীবনী। হর্ষবর্ধনের রাজসভার কবি বাণভট্ট তাঁর নিপুণ বিবরণে এবং অনবদ্য ছন্দোময়তায় হর্ষচরিত রচনা করেছিলেন। যদিও হর্ষচরিত রচনাকার অনেকটাই তাঁর রাজার দিকে ঢলে ছিলেন বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন। কিন্তু তাঁর কাব্যশৈলী, তাঁর ছন্দোময়তা বারবার সবাইকে বিস্মিত করেছে। পশ্চিমের পণ্ডিতরাও বাণভট্টের সাহিত্য প্রতিভাকে কুর্নিশ করেছেন। সেই বাণভট্টের একটি ভারতীয় রাজপরিবারের কাহিনির মধ্যে কীভাবে ব্রাত্য মেশাচ্ছেন শেক্সপিয়ারের ‘ট্র্যাজেডি’র আখ্যানকে, তা অবশ্যই কৌতূহলোদ্দীপক।

আজ রবিবার, ৭ই সেপ্টেম্বর গিরিশ মঞ্চে ‘মাৎস্যন্যায়’ তাই ব্রাত্য বসু (Bratya Basu) এবং অর্পিতা ঘোষের নতুন ‘থিয়েট্রিকাল স্টেটমেন্ট’। তাঁরা রাজনীতিক হিসেবে একই দলের সদস্য হতে পারেন, কিন্তু এই ধরনের মঞ্চ কোলাবরেশন বা নাটকের ক্ষেত্রে সহযোগিতা অবশ্যই আলাদা উল্লেখ রাখে। অর্পিতা ঘোষ এই প্রথম মিনার্ভা রেপার্টারির নাটককে পরিচালনা করছেন। সেই নাটকও আবার যে সে নাটক নয়, ব্রাত্য বসুর ‘মাৎস্যন্যায়’!

স্বভাবতই কৌতূহল যতটা তুঙ্গে, ততটাই দেখার বিষয় রাজনীতি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নারীর প্রতি ঈর্ষা, নারীকে আক্রমণ এবং গুজবকে ব্যবহার করে রাজনীতিকে নিজের অনুকূলে টানার যে গল্প শেক্সপিয়ার আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগে লিখেছিলেন, তাকে ব্রাত্য বসু কীভাবে ভারতীয় আঙ্গিকে এনে ফেলেন। সেই কারণে হয়তো ‘মাৎস্যন্যায়’ নামটিও আলাদা করে তাৎপর্যপূর্ণ। গুজব, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এই সব কিছু আজকের রাজনীতিতেও ছেয়ে আছে।