ad
ad

Breaking News

Bengal Politics

অমিত শাহের মোকাবিলায় অভিষেক, বিরোধী পরিসরে কং-সিপিএম কোথায়?

এই প্রশ্ন ওঠার কারণ, বিজেপি যখন তার নখ-দাঁত বের করছে এবং সেই নখ-দাঁতের মোকাবিলায় রাহুল গান্ধি ‘ভোট চোর’ বা ভোটে কারচুপি নিয়ে স্লোগান তুলে কেন্দ্রের শাসকদলকে বিঁধতে চাইছেন, তখন এই রাজ্যের কংগ্রেস বা এই রাজ্যের সিপিএম কোথায়?

Bengal Politics: Congress, CPM’s Silence Amid TMC vs BJP Battle

নিজস্ব

সুমন ভট্টাচার্য: পুজোর উদ্বোধনে কলকাতায় অমিত শাহের আসার দিনই যে বিদ্যাসাগরের জন্মদিন, সেটা মনে রেখে কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে বাঙালির এই আইকনিক মনীষীকে প্রণাম করতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৌঁছে যাওয়াটা যদি ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হয়, তা হলে তো প্রশ্ন উঠবেই বিজেপি বিরোধিতার রাজনীতিতে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস এবং সিপিএম কোথায় (Bengal Politics)?

[আরও পড়ুন: ‘আগে পরিস্থিতি বোঝা উচিত’, ফাইনালের আগে সূর্যকুমারকে পরামর্শ সানির]

এই প্রশ্ন ওঠার কারণ, বিজেপি যখন তার নখ-দাঁত বের করছে এবং সেই নখ-দাঁতের মোকাবিলায় রাহুল গান্ধি ‘ভোট চোর’ বা ভোটে কারচুপি নিয়ে স্লোগান তুলে কেন্দ্রের শাসকদলকে বিঁধতে চাইছেন, তখন এই রাজ্যের কংগ্রেস বা এই রাজ্যের সিপিএম কোথায়? যাঁরা জানেন না, তাঁদের জন্য জানিয়ে রাখা ভাল যে, পশ্চিমবঙ্গের সিপিএমের সর্বোচ্চ নেতা অর্থাৎ রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম এই সময় চিনের কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে সিপিএমের একটি সর্বভারতীয় প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে চিন সফর করছেন। তা হলে মহানগরী জলে ডুবল কিনা কিংবা অমিত শাহ এসে পশ্চিমবঙ্গে মেরুকরণের রাজনীতিতে কতটা শান দিলেন, সেটা নিয়ে সিপিএম নেতৃত্বের কতটা আগ্রহ আছে, তা সহজেই অনুমেয়।

কিন্তু কংগ্রেস, তারা কোথায়? যখন তাদের দলের সর্বভারতীয় নেতা ভোটচুরির স্লোগান তুলে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা জোগাড় করেছেন, যখন লাদাখে সোনাম ওয়াংচুখের বিক্ষোভের পিছনে কংগ্রেসের হাত রয়েছে বলে বিজেপি অভিযোগ করছে, তখন পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেস কি ‘ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট’-এ ব্যস্ত? ‘ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট’ শব্দ দুটি ব্যবহার করার কারণ, সোশ্যাল মিডিয়া দেখে অনুমান যে, পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেস তার মুখপাত্র বাছার কাজে সেই সময় ব্যস্ত ছিল (Bengal Politics)।

প্রথমত, কংগ্রেসের মতো সর্বভারতীয় দলকে যদি জেলায় জেলায় ‘ইভেন্ট’ করে মুখপাত্র বাছতে হয়, তা হলে তাদের রাজনৈতিক সচেতনতা কতটা রয়েছে, বুথ পর্যায়ে পর্যন্ত সংগঠন রয়েছে কি না বা পশ্চিমবঙ্গে তারা সত্যি সত্যি কী ধরনের রাজনীতি করতে চায়, সেই নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই, আর সেটা উঠছেও। এবং উঠছে বলেই পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি বিরোধী রাজনীতিতে তৃণমূল কতটা সিরিয়াস বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কীভাবে ‘রোডম্যাপ’ তৈরি করছেন, সেটা সাধারণ মানুষের নজরে আসছে।

পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান কংগ্রেস নেতারা প্রত্যেকে যে সুভদ্র এবং সুবক্তা, এই বিষয়ে আমার অন্তত কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহদের মোকাবিলায় তো বাংলার মানুষ তো কাউকে ‘জামাই’ হিসেবে খুঁজছেন না। বরং তাঁরা চান এমন রাজনৈতিক নেতাদের, যাঁরা অমিত শাহদের ঢিলের বদলে পাটকেল ছুড়তে পারবেন এবং প্রতিদিন তাঁদের সঙ্গে ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে লড়াই করবেন (Bengal Politics)।

দুঃখের বিষয়, যখন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলাম আদালতে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর সোনালি খাতুনের ‘পুশব্যাক’কে অবৈধ প্রমাণ করে দিচ্ছেন, তখনও বিধানভবনের কোনও হেলদোল নেই। যদি এরপরে বিধানভবন মনে করে, যে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের প্রতি সংখ্যালঘুদের সমর্থন থাকবে, তা হলে সেটা কি দুরাশা নয়? যদি ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলকে কেউ বিশ্লেষণ করে, তা হলে দেখা যাবে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস যে কয়েক লক্ষ ভোট পেয়েছিল, তার মধ্যে সিংহভাগই এসেছিল মুর্শিদাবাদ ও মালদা থেকে। অর্থাৎ, মুর্শিদাবাদের দুটি লোকসভা কেন্দ্র ও মালদার দুটি লোকসভা কেন্দ্র থেকেই কংগ্রেস সিংহভাগ ভোট পেয়েছিল।

অবশ্যই সেই সিংহভাগ ভোটের বেশিই ছিল মুসলিমদের সমর্থন। তা হলে সেই মুসলিমরা যখন ‘বাংলাদেশি’ অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত হচ্ছে, বিজেপি শাসিত রাজ্যে তাঁরা কোণঠাসা হচ্ছেন এবং যখন তৃণমূলের সাংসদ সামিরুল ইসলাম সোনালি খাতুনের জন্য হাইকোর্টে লড়াই করছেন, তখন যদি রাজ্য কংগ্রেস নেতৃত্ব ‘ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট’-এ ব্যস্ত থাকে, তা হলে আপনি তাদের কী বলবেন? আপনাকে কি ধরে নিতে হবে না, তা হলে রাহুল গান্ধি বিহার পর্যন্ত যা রাজনীতি করছেন, তা করছেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেস আসলে ‘ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট’ কোম্পানি হয়ে গিয়েছে (Bengal Politics)!

সম্প্রতি একটি টেলিভিশন বিতর্কে বিজেপির সজল ঘোষ কংগ্রেসের মুখপাত্রদের কটাক্ষ করে বলেছিলেন, “পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের লড়াই এখন বাংলা পক্ষর সঙ্গে।” সত্যিই তো! যে প্রদেশ কংগ্রেস দফতরে বাংলা পক্ষের নেতা গর্গ চট্টোপাধ্যায় বা কৌশিক মাইতিকে হেনস্থা হতে হয় এবং তারপরেও প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বে হেনস্থাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না, সেই দলের প্রতি বাঙালিরা, বাঙালি মুসলিমরা কীভাবেই বা আস্থা রাখবেন?

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার ঘটনা মনে করিয়ে দিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ বা বিজেপির রাজনীতিকে প্রতিরোধের জন্য মাঠে নামছেন বা তৃণমূলের সাংসদ সামিরুল ইসলাম যখন এই বাংলার মুসলিমদের ‘বাংলাদেশি’ বলে দেগে দিয়ে ‘পুশব্যাক’-এর বিরুদ্ধে আদালতে লড়াই করছেন, তখন সত্যি সত্যি কংগ্রেস বা সিপিএম কী করছে? এমনটা তো হতে পারে না, যে তাদের হাতে কোনও রাজনৈতিক অস্ত্র নেই (Bengal Politics)।

এমনটাও হওয়া উচিত না যে, তৃণমূলের বিরোধী রাজনৈতিক পরিসরে তাদের কাজ করার সুযোগ নেই। কারণ, যে কোনও সময় যে কোনও গণতন্ত্রে যদি সেটা উত্তর কোরিয়া কিংবা বেলারুশ না হয়, তা হলে শাসকের পক্ষে যতটা ভোট থাকবে, তার বিরোধী পক্ষেও প্রায় কাছাকাছি ভোট থাকা উচিত। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও তৃণমূল যদি ৪৭ শতাংশ ভোট পায়, তা হলে তার বিরোধী শিবিরেও যথেষ্ট ভোট রয়েছে।

সেই ভোট কুড়ানোর জন্য কতটা উদ্যোগী কংগ্রেস বা সিপিএম? দেখুন যখন কলকাতার রাস্তায় জল জমেছে এবং কলকাতা পুরসভার বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ রয়েছে, সেই সময় তৃণমূল যদি রাস্তায় নেমে থাকে, তৃণমূলের কাউন্সিলর মেয়ররা যদি রাস্তায় নেমে থাকেন, কংগ্রেস-সিপিএম কী করছিল? সোশ্যাল মিডিয়ায় মিম বানিয়ে পোস্ট করা ছাড়া কতটা উদ্যোগী তাঁরা ছিলেন জল জমার ক্ষেত্রে নাগরিকদের দুর্ভোগে পাশে দাঁড়ানোয় (Bengal Politics)?

কিংবা যে দশ জন সহ-নাগরিক মারা গেলেন, যাঁদের মৃত্যুর জন্য কলকাতার বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সিইএসসি-র দিকে অভিযোগের আঙুল উঠছে, সেই বিষয়েই বা কংগ্রেস-সিপিএম কী করেছিল? সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা ছাড়া এই রাজ্যের কংগ্রেস-সিপিএম বিরোধী পরিসরে ঠিক কতটুকু কাজ করছে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েও যদি সিইএসসি-র বিরুদ্ধে কামান দাগতে পারেন, তা হলে কংগ্রেস বা সিপিএমের অসুবিধা কোথায়?

সিইএসসি-দের বিরুদ্ধে বা গোয়েঙ্কাদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামতে এই রাজ্যের বিরোধীদের অসুবিধা কোথায়, সেটা বুঝতে গিয়ে আমি গত দশকে সঞ্জীব গোয়েঙ্কার পুত্র শাশ্বত গোয়েঙ্কার বিয়ের সময় ঠিক কতজন কংগ্রেস এবং বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন, সেই তালিকাটা মনে পড়ে গেল। কংগ্রেসের চিদম্বরম থেকে সুশীল সিন্ধে, বিজেপির পীযূষ গোয়েল থেকে আরও অনেক কেষ্ট-বিষ্টু নেতাই উপস্থিত ছিলেন। তাই সিইএসসি-র বিরুদ্ধে যদি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মানুষের মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে, তা হলে কংগ্রেস বা বিজেপি সেই বিষয়ে প্রতিরোধে নামবে কী করে?

বিধান ভবন ভাববে যে, এটা করলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কোপে পড়ে যাব না তো! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যাঁর সঙ্গে সঞ্জীব গোয়েঙ্কার সখ্য নিয়ে বিরোধীরা অনেক কটাক্ষ করেছে, তিনি কিন্তু প্রকাশ্যে নিউজ ১৮-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় সিইএসসি-কেই দায়ী করেছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যতটা আক্রমণাত্মকভাবে সিইএসসি-কে আক্রমণ করেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিধান ভবন এবং আলিমুদ্দিন স্ট্রিট সেটা পারে না কেন? কারণ, তাদের টিঁকি বাঁধা আছে গোয়েঙ্কাদের কাছে। এটা আলাদা প্রশ্ন যে সঞ্জীব গোয়েঙ্কার বাবা প্রয়াত আরপি গোয়েঙ্কা কংগ্রেসের রাজস্থানের রাজ্যসভার সাংসদ ছিলেন। কিন্তু তার বাইরেও কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতারা সঞ্জীব গোয়েঙ্কাদের এত ঘনিষ্ঠ যে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মানুষের মৃত্যুর অভিযোগে যদি সিইএসসি-র বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হয়, তা হলে বিধান ভবন দু-পা পিছিয়ে যাবে।

[আরও পড়ুন: মহাষষ্ঠীতে এই পাঁচ রাশির ভাগ্য প্রসন্ন, পড়ুন রাশিফল]

বিধান ভবনের নেতারা সুভদ্র, সুবক্তা কিংবা বিদেশে ঘোরাঘুরি করতে পারেন, কিন্তু মানুষের ইস্যুতে কোথায়? সিপিএম তো শুধুমাত্র একটি ফেসবুক নির্ভর দল হয়ে গিয়েছে। তা হলে রাজ্যে বিরোধী পরিসরটা বিজেপির কাছে ছেড়ে দেওয়ার জন্য আপনি কংগ্রেস-সিপিএমকে দায়ী করবেন না? মনে করবেন না যে, এরা আসলে বিজেপিকে পরোক্ষে সুবিধা করে দিচ্ছে? দলে দলে সিপিএম সমর্থক, সিপিএম নেতা এমনকি আজকাল বামতাত্ত্বিকরাও বিজেপি শিবিরে নাম লেখাচ্ছেন। রাজ্য কংগ্রেসও কি সেই একই পথে হাঁটতে চায়? তারাও কি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ‘বি-টিম’ হয়েই থাকতে চায়? অধীর চৌধুরীর সময় যে তকমা তাদের গায়ে লেগেছিল, বিধান ভবন সেটা ঝেড়ে ফেলতে এখনও কি তৎপর হতে পারল (Bengal Politics)?