ad
ad

Breaking News

Bengal Elections

বঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন-২০২৬ ইস্তাহারে কোন দলের কী কথা

দেখে নেওয়া যাক নির্বাচনী ইস্তাহারে কোন দল কী কথা বলেছে।

Bengal Elections Manifesto Battle and Welfare Politics

চিত্র- AI

সত্যগোপাল দে (লেখক— সাংবাদিক, শিশু, নারী সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলর): পশ্চিম বাংলার বিধানসভা নির্বাচনের দামামায় আকাশ বাতাস এখন মুখরিত। নির্বাচন মানেই তা কেবল দুই বা তিন পক্ষের রাজনৈতিক মল্লযুদ্ধ নয়, এ হল আদর্শ ও রণকৌশলের সংঘাত। আজ বাংলার ভোট রাজনীতি এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে। একদিকে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের ‘সামাজিক সুরক্ষ কবচ’, অন্যদিকে বিজেপি-র তথাকথিত ‘পরিবর্তন’ ও বাম-কংগ্রেস জোটের ‘বিকল্প’ গড়ার ডাক। তবে সব ছাপিয়ে এবারের নির্বাচনের মূল সুর বেঁধে দিচ্ছে সরকারি প্রকল্প ও সরাসরি আর্থিক সুবিধার ডালি। আর এসব কথার সম্ভার রয়েছে সব রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইস্তাহারে। একটু দেখে নেওয়া যাক নির্বাচনী ইস্তাহারে কোন দল কী কথা বলেছে।

জনকল্যাণেরতৃণমূলমডেল

তৃণমূল কংগ্রেসের ২০২৬-এর ইস্তেহার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রণকৌশলের মূলে রয়েছে সাধারণ মানুষের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছে দেওয়া। বিরোধীরা একে ‘খয়রাতি’ বলে কটাক্ষ করলেও, বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে এটি এক অনন্য রক্ষাকবচ তা ছাড়া ক্যাশ ট্রান্সফার মডেল অর্থনীতির এক অনন্য রক্ষাকবচ।

কন্যাশ্রীর নীরব বিপ্লব: বাংলার সমাজ সংস্কারের ইতিহাসে কন্যাশ্রী প্রকল্পটি এক মাইলফলক। স্কুলছুট কমানো থেকে শুরু করে বাল্যবিবাহ রোধ— কন্যাশ্রী আজ ঘরে ঘরে মেয়েদের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। আন্তর্জাতিক মঞ্চে পুরস্কৃত এই প্রকল্পকে ২০২৬-এ আরও আধুনিক ও ব্যাপক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ঘাসফুল শিবির।

লক্ষ্মীর ভাণ্ডার: অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি। বর্তমান বাজারের অগ্নিমূল্যের সময়ে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বাংলার কয়েক কোটি মহিলার হাতে যে আর্থিক স্বাধীনতা তুলে দিয়েছে, তার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ইস্তেহারে এই ভাতার অঙ্ক বৃদ্ধি করার ঘোষণা কেবল ভোট পাওয়ার কৌশল নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার এক নিপুণ প্রয়াস। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার শুধু টাকার অঙ্কে এক হাজার, পনেরশো কিংবা সতেরশো টাকা নয় এটি মেয়েদের সেলফ আইডেন্টি ও সাংসরিক সিদ্ধান্তের প্রতীক।

ক্যাশ ট্রান্সফার সামাজিক নিরাপত্তা: স্বাস্থ্যসাথী থেকে কৃষকবন্ধু— প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে দেওয়ার নীতি তৃণমূলকে সাধারণ মানুষের অনেক কাছে নিয়ে গিয়েছে। প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতা কাটিয়ে সরাসরি সুবিধা প্রদানের এই মডেলই আজ তৃণমূলের সাফল্যের প্রধান স্তম্ভ।

তৃণমূলের ইস্তাহারে ট্রাম্প কার্ড তাদের দশ দফা দাবি, এই দাবি অনুযায়ী আগামী ২০২৬-এর নির্বাচনে জয়লাভ করে পুনরায় ক্ষমতায় এলে তৃণমূল কংগ্রেস বাংলার মানুষের জন্য উন্নয়নের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। ইস্তাহার প্রকাশকালে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের প্রধান অঙ্গীকার হল— রাজ্যের প্রতিটি কাঁচা বাড়িকে পাকা বাড়িতে রূপান্তরিত করা; আবাসন যোজনার আওতায় প্রত্যেক মাথার ওপর নিশ্চিত ছাদ গড়ে তোলা হবে। ঘরে ঘরে পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি বিধবা ও বার্ধক্য ভাতার বকেয়া মেটানো হবে এবং ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর সুবিধা মা-বোনেরা সারাজীবন পাবেন। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ হিসেবে ‘দুয়ারে সরকার’-এর আদলে শুরু হবে ‘দুয়ারে চিকিৎসা’ পরিষেবা, যেখানে প্রতিটি ব্লক ও শহরে স্বাস্থ্য শিবিরের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবেন চিকিৎসকরা। শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে হাজার হাজার সরকারি স্কুলে ই-লার্নিং ব্যবস্থা চালু করা এবং দ্রুত স্বচ্ছ শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে সরকার। যুবসমাজের জন্য মেধাশ্রী ও যুবশ্রীর মতো বৃত্তির সুবিধা জারি রাখার পাশাপাশি চালু হবে বিশেষ যুব ভাতা। কৃষকদের আয় বাড়াতে ৩০ হাজার কোটি টাকার পৃথক কৃষি বাজেট ঘোষণা করা হবে। এছাড়া, একাকী প্রবীণদের দেখাশোনার জন্য বিশেষ প্রকল্প এবং প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য রাজ্যে নতুন ৭-৮টি জেলা ও নতুন পুরসভা গঠন করার বলিষ্ঠ সংকল্প গ্রহণ করেছে তৃণমূল।’

কী বলছে বিজেপি

বিজেপি তাদের ইস্তেহারে ‘সোনার বাংলা’ গড়ার ডাক দিয়েছে। ২০২৬-এ তাদের মূল ফোকাস কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন তাদের সকল্পপত্রেও ১৫ দফা দাবির উল্লেখ রয়েছে।

শিক্ষা স্বাস্থ্য: তারা আয়ুষ্মান ভারত এবং জাতীয় শিক্ষানীতিকে হাতিয়ার করে বাংলার স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল বদল আনতে চায়।

শিল্পায়ন: বিজেপির দাবি, রাজ্যে বিনিয়োগ আনতে গেলে ডাবল ইঞ্জিন সরকারের বিকল্প নেই। তবে সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে তৃণমূলের ‘ক্যাশ ট্রান্সফার’ মডেলের পাল্টা কোনও শক্তিশালী বিকল্প তারা এখনও পেশ করতে পারেনি। দলীয় প্রচারে তারা লক্ষীর ভাণ্ডারের নাম উল্লেখ করেই ক্ষমতায় এলে টাকা বাড়াবার কথা বলছেন।

বামকংগ্রেস: বিকল্প পথের হদিশ

বাম ও কংগ্রেস জোটের ইস্তেহারের অভিমুখ মূলত কর্মসংস্থান।

শিক্ষায় স্বচ্ছতা: তারা স্বচ্ছ নিয়োগ ও সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।

অধিকারের লড়াই: তাদের দাবি, ক্যাশ ট্রান্সফার সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান ছাড়া রাজ্যের উন্নয়ন সম্ভব নয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে জোয়ার আনাই তাদের মূল লক্ষ্য। দেখা যাক এবারের নির্বাচনে বাম কিংবা কংগ্রেস খাতা খুলতে পারে কিনা।

সামাজিক অর্থনৈতিক সূচকে তুলনামূলক চিত্র

তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান শক্তি হল নারী ভোটাররা। তাদের ইস্তেহারে কন্যাশ্রী ও লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো পরীক্ষিত প্রকল্পগুলোর জয়যাত্রা অব্যাহত রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সরাসরি আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নই তাদের মূল লক্ষ্য। অন্যদিকে, বিজেপি নারী নিরাপত্তার ইস্যুটিকে সামনে রেখে কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলোর সরাসরি সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার কথা বলছে। বাম-কংগ্রেস জোট অবশ্য কেবল আর্থিক অনুদান নয়, বরং সমাজে প্রকৃত লিঙ্গসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং শিশুদের সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করার অধিকারের কথা বলছে।

শিক্ষার আঙিনায় তৃণমূলের বাজি হল প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকীকরণ। স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড এবং উচ্চশিক্ষার জন্য ট্যাব বিতরণের মাধ্যমে তারা ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের পাশে রাখতে চায়। বিপরীতে, বিজেপি চাইছে কেন্দ্রীয় ধাঁচে ‘জাতীয় শিক্ষানীতি’ কার্যকর করে শিক্ষার খোলনলচে বদলে দিতে। 

স্বাস্থ্যের নিরিখে তৃণমূলের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার স্বাস্থ্যসাথী কার্ড, যার ব্যাপ্তি তারা আরও বাড়াতে চায়। এর বিপরীতে বিজেপি বাংলার মানুষের জন্য কেন্দ্রের ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্প চালুর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। তবে বাম-কংগ্রেস দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা ভিন্ন; তারা কার্ড-নির্ভর চিকিৎসার চেয়েও সরকারি হাসপাতালগুলোর নিজস্ব পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের জন্য নিখরচায় আধুনিক চিকিৎসার অধিকার সুনিশ্চিত করতে আগ্রহী।

শিশুদের কথা

নির্বাচনী ইস্তাহারে যে কথাই লেখা থাকুক না কেন নতুন সরকার গঠন করার পর তারা শিশুদের কথা বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের কথা যেন মনে রাখেন। বিগত বছরগুলোতে বাংলার কন্যা সন্তানদের সার্বিক বিকাশ, সুযোগ এবং ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার যে প্রতিশ্রুতি দেখিয়েছে, তা প্রশংসনীয়। কন্যাশ্রী থেকে শুরু করে অসংখ্য ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলার মেয়েদের উন্নতির চিত্র আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃত। ২০২৬-এর নির্বাচনে জয়লাভ করে পুনরায় যারাই ক্ষমতায় আসুক বিশেষ করে যদি তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসে তা হলে এই উন্নয়নের ধারা এক নতুন মাত্রা পাবে। এই আশা অবশ্যই করা যেতে পারে। আশা করা যেতে টাস্ক ফোর্স ফর কমবাটিং হিউমান ট্রাফিকিং ইউনিটটি আরও শক্তিশালী হবে।

সেই লক্ষ্যেই, আগামী দিনে বাংলার শিশুদের জন্য একটি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে ‘অপরাজিতা’ কর্মসূচি চালু করার জন্য বিনীত আবেদন রাখা যেতে পারে, কারণ অপরাজিত আইন ইতিমধ্যে রাজ্য বিধানসভায় পাশ হয়েছে।

প্রস্তাবিত এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হবে পশ্চিমবঙ্গ থেকে শিশু যৌন পাচার বিশেষ করে মেয়ে শিশু চিরতরে মুছে ফেলা। এর জন্য নিম্নলিখিত দফাগুলি বাস্তবায়নের আবেদন রাখা যেতে পারে, শিশু পাচারের বিরুদ্ধে রাজ্যে এক আপসহীন ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করার আবেদন রাখা যেতে পারে। প্রতিটি জেলায় অ্যান্টি হিউম্যান ট্র্যাফিকিং ইউনিটকে শুধুমাত্র পাচার বিরোধী কাজে নিয়োজিত করা হোক। খবর পাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধারকাজ সম্পন্ন করা তাদের আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে ধার্য করা হোক।

পাচারের শিকার হওয়া শিশুদের বিশেষ করে নাবালিকাদের জন্য ১ লক্ষ টাকার অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষতিপূরণ সরাসরি প্রদান এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক যত্নের মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসন সুনিশ্চিত করা হোক।

সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিলে বাংলার প্রতিটি শিশু নিরাপদ থাকবে।

শারীরিক, মানসিক বা যৌন— সব ধরনের শোষণ থেকে প্রতিটি শিশুর মুক্তি সুনিশ্চিত করা। জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা পরিযায়ী পরিচয় নির্বিশেষে প্রতিটি শিশু বিশেষ করে কন্যা সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পাচারের শিকার হওয়া শিশুদের পরিচয় রক্ষা ও সামাজিক কলঙ্ক থেকে মুক্তি দেওয়াকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান। স্কুল, ক্রেশ এবং পাড়া-প্রতিবেশী পর্যায়ে একটি সুরক্ষিত পরিবেশ গড়ে তোলা। অনলাইন মাধ্যম বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শিশুদের প্রলোভন ও শোষণ রুখতে কঠোর আইন প্রণয়ন ও নিয়মিত নজরদারি। শিশু পাচার সহ শিশুদের প্রতি সহিংসতা সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রতিটি জেলায় প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোসহ ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট স্থাপন। প্রতিটি কিশোরী এবং অভিভাবকের জন্য নাম প্রকাশ না করে সাহায্য চাওয়ার একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা অ্যাপ তৈরি করা।

পরিশেষে, আমাদের বিশ্বাস, সরকার ২০২৬-এ নুতন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর শিশুদের উদ্ধার, পুনর্বাসন এবং সামাজিক মূলস্রোতে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ ও তহবিল বরাদ্দ করবে। ‘অপরাজিতা’ প্রকল্পে কিংবা অনুরূপ কর্মসূচি সফল রূপায়ণ বাংলার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক নির্ভীক ও উজ্জ্বল আগামীর দিশা দেখাবে।