ad
ad

Breaking News

Bangladesh Politics

বাংলাদেশকে কতটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন তারেক রহমান?

সতেরো বছর বিদেশে থাকার পরে তারেক রহমানের ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিকভাবে যতটা তাৎপর্যপূর্ণ, ততটাই বাংলাদেশে সুস্থিতি ফেরানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ

Bangladesh Politics Tarique Rahman’s Return Signals

চিত্র- সংগৃহীত

সুমন ভট্টাচার্য: পৃথিবী ক্রমশ ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ হয়ে যাওয়াতে এবং সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক মাধ্যমের দৌলতে আমরা একে অপরের কাছাকাছি বা আসলে হয়তো ‘দূরে’ চলে আসার প্রক্রিয়ায় আজকে এক প্রতিবেশী অন্য প্রতিবেশীকে প্রভাবিত করে। সেটা শুধু খুলনার ভূমিকম্প কলকাতায় টের পাওয়া যায় বলে নয়, সেটা আসলেই এক জায়গায় সংখ্যালঘুদের কীভাবে রাখা হচ্ছে, তা অন্য দেশের সংখ্যালঘুদের আশঙ্কিত অথবা উত্তেজিত করে। আমি আসলে আমাদের পুবের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করছি। বাংলাদেশে একটা নির্বাচন শেষ হয়েছে, তারেক রহমান ক্ষমতায় এসেছেন। সতেরো বছর বিদেশে থাকার পরে তারেক রহমানের ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিকভাবে যতটা তাৎপর্যপূর্ণ, ততটাই বাংলাদেশে সুস্থিতি ফেরানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইউনুস সরকারের ১৮ মাসের শাসনে যে মাৎস্যন্যায়, সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, মুসলিম মৌলবাদকে প্রশ্রয় দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে, তারপরে তারেক রহমানের ক্ষমতায় আসা অবশ্যই স্বস্তির এক ঝলক বাতাস। এটা সত্যি কথা, ফেব্রুয়ারি মাসে হওয়া ওই নির্বাচনে আওয়ামি লিগকে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি। কারণ, মূলত আওয়ামি লিগ এবং শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধেই তথাকথিত ‘জুলাই বিপ্লব’-এর মাধ্যমে ইউনুস ক্ষমতায় এসেছিলেন এবং ইউনুস তারপরই আওয়ামি লিগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। আওয়ামি লিগ নির্বাচনে না অংশগ্রহণ করতে পারায় বাংলাদেশের নির্বাচন কতটা সর্বজনভিত্তিক হয়েছে, তা নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন আছে। এমনকি বিএনপি-র প্রাক্তন নেত্রী, বাংলাদেশের সংসদে নির্দল হিসেবে জিতে আসা সাংসদ রুমিন ফারহানা অবধি সেই নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি একটা যুক্তিযুক্ত কথা বলেছেন। যেমন আওয়ামি শাসনের ৪টি নির্বাচনের মধ্যে ২টি নির্বাচনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তোলা হয়, এবং বিএনপি-কে বাইরে রেখে নির্বাচনের অভিযোগ তোলা হয়, তেমনই এই নির্বাচনে আওয়ামি লিগ অংশগ্রহণ করতে পারেনি। তাহলে অন্তত ৩০ শতাংশ মানুষ, যাঁরা আওয়ামি লিগের সমর্থক, তাঁরাও হয়তো নিজেদের মত প্রকাশের সুযোগ পাননি। তবু তারেক রহমানের জিতে আসা সমাজ এবং বৃহত্তর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য শুভ সঙ্কেত।

কেন তারেক রহমানের জিতে আসাকে শুভ সঙ্কেত বললাম? কারণ, তারেক ক্ষমতায় বসার আগে বাংলাদেশে যে শাসন চলছিল, তা এক ধরনের মৌলবাদকে প্রশ্রয় দিচ্ছিল এবং ভারতের জন্য রক্তচাপ বাড়িয়ে তুলছিল। মহম্মদ ইউনুস, নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ শুধু যে খুল্লামখুল্লা ভারত-বিরোধিতা করেছিলেন, তা নয়। তাঁর তথাকথিত সমন্বয়করা পায়ে পা দিয়ে ভারতের সঙ্গে ঝগড়া চালিয়ে গিয়েছেন। সেটা হুমায়ুন আহমেদের জামাই, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল থেকে শুরু করে আরও অনেকে। তাঁরা ভারতে চলা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কট করেছেন, তাঁরা পাকিস্তানের সঙ্গে সখ্য বাড়িয়েছেন, এমনকি পাকিস্তানি নৌ বাহিনীর প্রধান বা পাক সেনাবাহিনীর উপ-প্রধানকে ডেকে লাল গালিচা পেতে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। বোঝাই যাচ্ছিল জামাত, যার আবার শিকড় বাঁধা আছে করাচিতে, তারা আসলে বাংলাদেশকে আবার ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এ পরিণত করতে চায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের জামাতের আমির শফিকুর রহমানের একটি মন্তব্য, যা ভাইরাল হয়ে যায়, সেই নারী বিরোধী মন্তব্য বাংলাদেশে জামাত বিরোধী জনমতকে সংগঠিত করতে সাহায্য করে। এবং সেই নারী বিদ্বেষী মন্তব্য বাংলাদেশের মহিলাদের হয়তো দলে দলে জামাতের বিরুদ্ধে ভোট দিতেও উৎসাহিত করে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ওসমান হাদির মৃত্যুর পরে ঢাকা শহরে যে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ছায়ানট, উদীচীতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল, তারপর ঢাকার মধ্যবিত্ত আরবান ‘এলিট’কুল এবং যাঁরা রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃতির চেতনাকে বুকে নিয়ে বেঁচে থাকতে চান, তাঁরা প্রমাদ গুনেছিলেন। তাঁরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে তারেক রহমানকে ভোট দিয়েছেন।

যে প্রতিশ্রুতি বা স্বপ্ন নিয়ে তারেক ক্ষমতায় এসেছিলেন, তিনি কিন্তু আসার পর থেকে সেই পথে হাঁটার যথেষ্ট লক্ষণ দেখাচ্ছেন। যেমন তিনি প্রথমেই আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ বিরোধী ট্রাইবুনাল থেকে জামাতের ঘনিষ্ঠ আইনজীবী তাজ-উল ইসলামকে সরিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেদেশের সেনাবাহিনীতেও সাম্প্রতিকতম যে রদবদল হয়েছে, তা আসলে পাক ঘনিষ্ঠ সমস্ত সেনাপ্রধানদের সরিয়ে তুলনায় বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষায় তৎপর সামরিক কর্তাদের বসানোর মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠা হয়েছে। অর্থাৎ, তারেক চাইছেন, জামাত নয়, পাকিস্তানের সঙ্গে গলাগলি নয়; বরং একটা বাংলাদেশের একটা স্বাধীন অস্তিত্বের আবার জোরদার প্রমাণ দেওয়ার। আমাদের মনে রাখতে হবে, নির্বাচনের আগে তারেকের স্লোগানই ছিল দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়, ঢাকা, ঢাকা। এই স্লোগানের মধ্যে যেমন নয়াদিল্লির সঙ্গে দূরত্ব বোঝানোর ইঙ্গিত রয়েছে, তেমনই তিনি যে পাকিস্তানের সঙ্গে হাঁটতে চান না, তারও পরিষ্কার ইঙ্গিত ছিল। ভারতীয় হিসেবে, একজন ভারতীয় সাংবাদিক হিসেবে আমি মনে করি, উনি যদি নয়াদিল্লির সঙ্গে দূরত্ব দেখাতে চান, তাতে অন্যায়ের কিছু নেই। কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের সঙ্গে দূরত্ব দেখানোটা জরুরি। তা না হলে ভারত-বিরোধিতার পুরো রাশটা জামাত বা জামাতের ‘প্রক্সি’ হিসেবে উঠে আসা এনসিপি নেতৃত্বের হাতে চলে যাবে। তাই মুখে নয়াদিল্লির সঙ্গে দূরত্বের কথা বলেও, তিনি যদি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকের দিকে যান, তা হলে তারেককে সাধুবাদ জানাতেই হয়। তারেক ক্ষমতায় বসার ১৫ দিনের মধ্যে ভারতের সঙ্গে ভিসা ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়েছে। আমদানি-রফতানি আরও বেড়েছে। অর্থাৎ, তারেক চান যে ভারতের সুসম্পর্ক হোক এবং তাঁর প্রধান প্রতিবেশীকে সঙ্গে নিয়েই বাংলাদেশের আগামী বছরগুলির ‘রোডম্যাপ’ তৈরি করা হোক।

আমাদের একটা কথা মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ যেমন একদিকে ‘মেক্সিকো সিনড্রোম’-এ ভোগে, অর্থাৎ, পাশের ‘বড় প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিরুদ্ধে যাবতীয় শত্রুতাকে চাগিয়ে রাখা’ এবং সেটাই অনেক সময় সেখানকার সংখ্যাগুরু, অর্থাৎ, মুসলিমদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেতে সবচেয়ে কাজে দেয়। আবার তেমনই গত কয়েক মাসে ইউনুস বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একেবারে ধ্বংস করে দিয়ে গিয়েছেন। তাই তারেক রহমানকে যেমন বাংলাদেশের ভিতরে নিভু নিভু জ্বলতে থাকা এই ভারত-বিরোধী ক্ষোভ, মুসলিম মৌলবাদকে সামলে চলতে হবে, তেমনই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আবার পুরনো জায়গায় ফেরত আনতে হবে। তারেক যদি জামাতপন্থী, পাকিস্তানপন্থীদের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ থেকে সরিয়ে তুলনায় মধ্যপন্থীদের নিয়ে আসেন, তা হলে যেমন বাংলাদেশের সমাজ এবং রাষ্ট্রের উপকার, তেমনই ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে সহজ হবে। আমরা সবাই জানি বা বুঝি, বা এত দিনে আরও পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে নাহিদ ইসলাম-সারজিস, আলম-হাসমত আবদুল্লাহরা আসলে জামাতের ‘মুখোশ’ এবং তাঁরা তাঁদের প্ররোচনামূলক কাজকর্ম, কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের ভারত-বিরোধী অংশকে খেপিয়ে রাখতে চাইবেন। কারণ, সেটাই তাঁদের একমাত্র রাজনীতি এবং সেটাই তাঁদের একমাত্র মূলধন। এটাও মনে রাখতে হবে, যে বাংলাদেশের যে কোনও ভোটে ভারত-বিরোধীরা ৩০ শতাংশের মতো ভোট পায়, ঠিক যেমন ‘ভারতবন্ধু’ আওয়ামি লিগের কাছেও ৩০ শতাংশ ভোট রয়েছে। তা হলে এই ভারত-বিরোধিতার জিগির যারা তুলতে চায়, তাদের কীভাবে একপাশে সরিয়ে রাখবেন সেটা তারেক রহমানকেই বুঝতে হবে। এখনও পর্যন্ত তারেক রহমান শান্ত মাথায় খুব দক্ষতার সঙ্গে সেই কাজটি করে চলেছেন। তাই তারেকের প্রশংসা না করে উপায় নেই। জামাত যে প্ররোচনার আগুন জ্বালাতে চায়, এনসিপি যেভাবে বাংলাদেশের সংস্কারের নামে আসলে একটা ইসলামিক রাষ্ট্র বিপ্লবের কথা ভাবতে চায়, তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তারেক রহমান লড়াই করছেন। তারেক রহমান লড়াই করছেন তাঁর ‘পপুলার সাপোর্ট’ বা সংসদে বিশাল জনসমর্থনকে সঙ্গে নিয়ে। তারেক রহমান কীভাবে আগামী দিনে বাংলাদেশের ‘রোডম্যাপ’ তৈরি করবেন, কীভাবে জামাতের সঙ্গে সংঘাত সত্ত্বেও বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবেন এবং সামাজিকভাবে সবাইকে এক রাখবেন, সেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখনও অবধি তারেক রহমান বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নতির কথা জোরের সঙ্গে বলছেন। এটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয়।