ad
ad

Breaking News

Aravalli

মানবসভ্যতাকে রক্ষা করতে অতীব গুরুত্বপূর্ণ আরাবল্লী বাঁচানোর লড়াই

কর্পোরেটের বৃহৎ জালা আরও ফুলেফেঁপে উঠবে, বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত হবে প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশ।

aravalli-hills-environmental-fight

চিত্রঃ সংগৃহীত

সন্তোষ সেন: আরাবল্লী পর্বতমালা ২০০ কোটি বছর ধরে উত্তরভারতের ভূ-প্রাকৃতিক বাফার জোন হিসেবে কাজ করছে। ভাবতেও অবাক লাগে, এই দুইশো কোটি বছরের পাহাড়ের ভূগোল ইতিহাস ভবিষ্যত নির্ধারন করছে মাত্র দুইশো বছরের ‘প্রগতিশীল’ মানুষ। একেই নাকি বলে সভ্যতা!

এই পর্বতশ্রেণী গুজরাট থেকে শুরু করে রাজস্থান, হরিয়ানা হয়ে দিল্লি পর্যন্ত বিস্তৃত। বাস্তুতন্ত্র ও সামগ্রিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে আরাবল্লীর ভূমিকা আজও অপরিসীম। এই পর্বতশ্রেণি একদিকে যেমন মরুকরণের অগ্রগতি রোধ করে, অন্যদিকে তেমনই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও জলচক্র নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভারতবর্ষের সবথেকে প্রাচীন এই ভঙ্গিল পর্বতমালা বেশ কয়েকটি নদীর উৎসভূমি। বহু প্রজাতির গাছ, অসংখ্য বন্যপ্রাণ ও পাখির আবাসস্থল। এখানে রয়েছে ২২টি অভয়ারণ্য, বেশ কিছু জীববৈচিত্র্য পার্ক, অসংখ্য জলাশয়। এই পর্বতমালা দিল্লি-সহ উত্তর ভারতের গাঙ্গেয় অঞ্চলকে থর মরুভূমির প্রকোপ থেকে রক্ষাকারী ঢাল হিসেবে কাজ করে। আরবসাগর থেকে আসা জলীয়বাষ্পকে আটকে রাজস্থানে বৃষ্টিপাত ঘটায় এবং তার পূর্ব দিকে যাওয়া আটকে হিমালয়ের দিকে ঠেলে দেয়।

মানবসভ্যতার অতীব গুরুত্বপূর্ণ এহেন আলাবল্লী রেঞ্জ ইতিমধ্যেই প্রবল চাপের মুখে। নগরায়ন, শিল্পাঞ্চলের সম্প্রসারণ এবং বৈধ ও অবৈধ খনির ফলে এই প্রাচীন পাহাড় ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। ‘আরাবল্লী গ্রিন ওয়াল’ প্রকল্পের অধীনে কেন্দ্র নিজেই তার অ্যাকশন প্ল্যানে এই ব্যাপক ক্ষয়ের কথা স্বীকার করেছে। এই নথিতেই বলা হয়েছে, ব্যাপক পরিমাণে জঙ্গল কেটে ফেলা, খনন, অতিরিক্ত পশুচারণ, ইত্যাদির ফলে আরাবল্লীর বিপদ ক্রমশই বাড়ছে। ১৯৮০-র আগে ‘সরিষ্কা ব্যাঘ্র সংরক্ষণ কেন্দ্র’ সংলগ্ন বনভূমি অন্য কাজে ব্যবহার হওয়ায় বনাঞ্চল কমে গেছে। পশ্চিম দিকের মরুভূমির বালি পূর্বদিকে সরতে থাকায় কমে যাচ্ছে উর্বর কৃষি জমির পরিমাণ, বাড়ছে থর মরুভূমির আয়তন। খনন কার্যের ফলে ভূগর্ভস্থ জলস্তর অনেক নিচে নেমে গেছে, বহু জলাশয় শুকিয়ে গেছে। জলের অভাবে বন্যপ্রাণ প্রবল সংকটে। এসব জেনেও গত ২০ নম্বর সুপ্রিমকোর্ট কেন্দ্রের দেওয়া ১০০মিটারের সংজ্ঞা মেনে নিয়েছিল। প্রকৃতির মহান দান পাহাড় জঙ্গল নদীর আজ নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করছে টাকার লোভে মূর্খ মানুষ!

কেন্দ্রের দেওয়া নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী আরাবল্লীর ৯১ শতাংশই আর পাহাড় হিসেবে গণ্য হবেনা। স্বভাবতই সেখানে নির্বিচারে আইনি পথেই ইচ্ছেমতো খননকার্য করে মৃত খনিজ তুলে নিয়ে এসে পণ্য ও মুদ্রায় পরিণত করা যাবে। কর্পোরেটের বৃহৎ জালা আরও ফুলেফেঁপে উঠবে, বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত হবে প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশ। আরাবল্লী পর্বতমালাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার রাজসূয়যজ্ঞ শুরু হয়েছিল আগেই, তা ত্বরান্বিত করতে উঠেপড়ে লেগেছে একদল মানুষ। যাকে আপাতত রুখে দিল অন্য আর এক দল সচেতন লড়াকু মানুষ ও সেই আদালত।

আরাবল্লীর জন্য লড়াইগল্প হলেও সত্যি

রাজস্থানের আলওয়ার জেলার থানাগাজি ব্লকের ভৈরপুরা গ্রাম। চারদিক জুড়ে একসময় ঘন বন আর ঢেউ খেলানো শৈলশ্রেণি। এই পাহাড় থেকেই গ্রামবাসীদের জীবনধারা— বর্ষার জল ধরে রাখা কুয়ো ও ঝরনার উৎস, পশুখাদ্য ও জ্বালানি। কৃষক রামনিবাস গুজ্জর বলেন, ২০০০ সালের আগেও তাঁদের কুয়োয় সারা বছর জল থাকত। কিন্তু ধীরে ধীরে পাহাড়ের গায়ে শুরু হয় অবৈধ খনন। পাথর, কোয়ার্টজ, মার্বেল তুলতে আসে বড় বড় মেশিন। পাহাড় কাটা পড়ে, বন উজাড় হয়। ২০১০ সালের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। রাজস্থান সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার নেতৃত্বে আরাবল্লীর বিস্তীর্ণ অংশে খনন, রিয়েল এস্টেট ও শিল্প প্রকল্প শুরু হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষিতে। ভূগর্ভস্থ জলস্তর দ্রুত নেমে যায়, খরা বাড়ে, ছোট কৃষকদের জমি অনাবাদি হয়ে পড়ে। কৃষক হুকম সিং প্রতিদিনের মতো ভোরে মাঠে যেতে গিয়ে দেখলেন পাহাড়ের গায়ে বড় বড় যন্ত্র বসানো হচ্ছে। পাথর ভাঙার শব্দে কেঁপে উঠছে মাটি। তাঁর বাবা বলতেন, ‘এই পাহাড় বাঁচলে আমরা বাঁচব।’ আজ সেই পাহাড়ই বিপন্ন।

একদিন সন্ধ্যায় গ্রামের চৌপালে সবাই জড়ো হলেন। বৃদ্ধ কৃষক মঙ্গল রাম বললেন, ‘আমরা চুপ থাকলে কাল আমাদের ছেলে-মেয়েদের জন্য কিছুই থাকবে না।’ সেই রাতেই সিদ্ধান্ত হল, পাহাড় বাঁচাতে চাই আন্দোলন। নারী-পুরুষ, তরুণ-বৃদ্ধ সবাই এগিয়ে এল। কেউ হাতে তুলে নিল পোস্টার— ‘আরাবল্লী বাঁচাও, জীবন বাঁচাও’। কেউ পাহাড়ের পাদদেশে গিয়ে বসে পড়ল। যেন আর কোনও যন্ত্র এগোতে না পারে। পরদিন প্রশাসনের লোক এলে গ্রামবাসীরা শান্ত গলায় জানিয়ে দিলেন, ‘যে উন্নয়নে জল শুকিয়ে যায়, জমি মরে যায়— সেই উন্নয়ন আমরা চাই না।’ তাঁরা জানতেন, আরাবল্লী ভারতের প্রাচীনতম পর্বতশ্রেণি এবং উত্তর ভারতের জলবায়ু রক্ষার অন্যতম স্তম্ভ। প্রশাসনের কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে দাবি তোলা হয়; অবৈধ খনন সম্পূর্ণ বন্ধ করে আরাবল্লীকে সংরক্ষিত পরিবেশ অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। বন ও জলাধার পুনরুদ্ধার করতে হবে। ২০২০–২১ সালে এই আন্দোলন আরও তীব্র হয়, যখন পরিবেশবিদরা সতর্ক করেন যে, আরাবল্লী ধ্বংস হলে দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলে মরুকরণ আরও দ্রুত হবে। কৃষকদের আন্দোলনে তখন ছাত্র, পরিবেশকর্মী ও স্থানীয় সংগঠন যুক্ত হয়। ২০২২ সালে রাজস্থান হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের আগের নির্দেশের ভিত্তিতে কিছু এলাকায় খনন কার্য স্থগিত করা হয়। পুরো পাহাড় সুরক্ষিত না হলেও আন্দোলনের ফলে বহু অবৈধ খনি বন্ধ হয় এবং প্রশাসন নজরদারি বাড়াতে বাধ্য হয়। গ্রামবাসীরা জানান, ‘আমরা পাহাড়কে ভালবাসি বলেই লড়ছি। পাহাড় বাঁচলে জল বাঁচবে, জল বাঁচলে কৃষক বাঁচবে।’ আরাবল্লীর এই লড়াই কোনও একদিনের ঘটনা নয়। এটি রাজস্থানের কৃষক সমাজের দীর্ঘ সংগ্রাম, যেখানে প্রকৃতি রক্ষাই জীবিকা রক্ষার একমাত্র পথ।

 ২০২৫আমাদের জল, আমাদের পাহাড়

রাজস্থানের আলওয়ার জেলার এক পাহাড়ঘেরা গ্রাম। ভোরে সূর্য ওঠার আগেই কমলাদেবী কলসিতে হাত দেন। কুয়োয় দড়ি নামিয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও জল পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, ‘পনেরো বছর আগে এই কুয়োই আমাদের জীবন ছিল। এখন পাহাড় কাটার সঙ্গে সঙ্গে জলও চলে গেছে।’

কৃষক রতন সিং ছোট জমিতে বাজরা আর সরষে চাষ করেন। ২০২৫ সালে এসে সেই জমিতে ফসল ফলানোই কঠিন যুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাহাড় কাটা মানে শুধু পাথর তোলা নয়। পাহাড় বিদীর্ণ করা মানে জলস্তর ভেঙে পড়া, ঝর্না শুকিয়ে যাওয়া, মাটির উর্বরতা নষ্ট হওয়া। রতন সিং বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে কেউ বন্দুক ধরেনি। তবু আমরা লড়ছি। কারণ পাহাড় কেটে আমাদের জমিকে মেরে ফেলা হচ্ছে।’

২০২৪ সালের শেষে খবর আসে গ্রামে। পাহাড়ি এলাকায় নতুন রাস্তা ও সৌরপ্রকল্পের জন্য জমি ‘নন-ফরেস্ট’ হিসেবে দেখানো হবে। কৃষকদের বোঝানো হয়, ‘মেনে নাও, মানিয়ে নাও, এটাই উন্নয়ন।’ ২০২৫-এর গ্রীষ্মে ট্যাঙ্কারে জল এলে কৃষকরা বোঝেন, এই উন্নয়ন তাদের জন্য নয়। লড়াইয়ের মুখ হয়ে ওঠেন নারীরা। জল আনতে তাঁদেরই দূরে যেতে হয়। গবাদি পশুর যত্ন তাঁদেরই কাঁধে। নারীরাই ঘরের খাদ্যসংকট প্রথম টের পান। তাই শকুন্তলাদেবী গ্রামসভায় দাঁড়িয়ে বলেন, ‘খনি বন্ধের কথা পুরুষরা বহু বছর ধরেই বলে আসছে। এবার আমরা বলছি, জল না থাকলে সংসার চলবে কীভাবে?’

নারীরা ‘মহিলা জল কমিটি’ গঠন করেন। কুয়ো, হ্যান্ডপাম্প, শুকিয়ে যাওয়া ঝরনার তালিকা তৈরি করেন। এক ভয়ানক তথ্য সামনে আসে।

এপ্রিল ২০২৫— কৃষকরা মাঠ ছেড়ে মিছিলে নামেন। সেই মিছিলের অগ্রভাগে নারী বাহিনী। হাতে প্ল্যাকার্ড— ‘পাহাড় কাটলে মা শুকোয়’, ‘আরাবল্লী মানে আমাদের জল’।

তাঁরা প্রশাসনের সামনে প্রশ্ন তোলেন, পরিবেশ ছাড়পত্র কোথায়? গ্রামসভা ছাড়া জমি নেওয়া হল কেন? সুপ্রিম কোর্টের পুরনো নিষেধাজ্ঞা কেন মানা হচ্ছে না?

গ্রামের মেয়েরা মোবাইলে পাহাড় কাটার ভিডিও তোলে। আগে–পরে ছবির তুলনা করে দেখে কীভাবে পাহাড়ের গায়ে ফাটল ধরেছে, ঝরনা শুকিয়ে গেছে। এই ভিডিও বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, মাঠে ঘাটে, লড়াইয়ে ময়দানে। কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে এবার নারীর কণ্ঠ জুড়ে যায়। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সরকার বাধ্য হয় কিছু প্রকল্প সাময়িকভাবে হলেও বন্ধ করতে। কয়েকটি খনির লাইসেন্স খতিয়ে দেখার নির্দেশ আসে। কমলাদেবী বলেন, ‘আমরা আদালতের ভাষা জানি না। আমরা শুধু জানি, পাহাড় থাকলে জল থাকে, জল থাকলে জীবন থাকে।’

২০২৫ সালের এই আন্দোলন তাই শুধু কৃষকের নয়, শুধু পরিবেশেরও নয়। এই আন্দোলন ছিল গ্রামীণ নারীদের নেতৃত্বে জল–জীবন–ভবিষ্যৎ রক্ষার সংগ্রাম।

আরাবল্লী পাহাড়ের গায়ে আজও ক্ষত আছে।

কিন্তু ২০২৫ দেখিয়ে দিয়েছে, যখন কৃষক আর নারী একসঙ্গে দাঁড়ায়, প্রকৃতি রক্ষার কথা বলে, তখন পাহাড় একা থাকে না। দোর্দণ্ডপ্রতাপ সরকার বাহাদুর ও আদালতকেও পিছু হটতে হয়। এভাবেই জিতে যায় মানুষের আবেগ বিশ্বাস লড়াইয়ের গল্প।