চিত্র: প্রতীকী
মহম্মদ মফিজুল ইসলাম: যদি আধার কার্ড, ভোটার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ না হয়, তবে এই রাষ্ট্রের নাগরিক কে? আর কেনই বা হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে এ দেশের প্রতিটি নাগরিককে জোর করে লাইন করিয়ে এই সব কার্ড হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে? প্রশ্নটা এখন শুধু আইনি নয়, অস্তিত্বের। রাষ্ট্র যখন এক হাতে চিহ্নিত করে, অন্য হাতে অস্বীকার করে, তখন সাধারণ মানুষ বড় অসহায় হয়ে পড়ে (Aadhaar & Voter ID)।
আমরা যে দেশে বাস করি, সেই দেশের সরকার বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নাগরিকদের আধার নম্বর দেওয়া নিয়ে এক মহাযজ্ঞে মেতে ছিল। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহরের অলি-গলি পর্যন্ত ক্যাম্প বসিয়ে আঙুলের ছাপ, চোখের মণির ছবি সংগ্রহ করা হল। বলা হল— এটাই চূড়ান্ত পরিচয়। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে স্কুলে ভর্তি, গ্যাস সংযোগ, রেশন তোলা, এমনকী হাসপাতালেও চিকিৎসা- সব জায়গাতেই আধার বাধ্যতামূলক করা হল। বলা হল, ‘এক জাতি, এক পরিচয়’। অথচ আজ যখন নাগরিকত্বের প্রশ্ন উঠছে, তখন সেই আধারই অচল কাগজ। যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, ‘এটা শুধু পরিচয়ের প্রমাণ, নাগরিকত্বের নয়’।
ঠিক একই রকম অবস্থা ভোটার কার্ড নিয়েও। প্রতিটি নির্বাচনের আগে যে নির্বাচন কমিশন মানুষের দরজায় দরজায় গিয়ে পরিচয় যাচাই করে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করে, যার ভিত্তিতে মানুষ ভোট দেয়, সরকার গঠন হয়— সেই ভোটার কার্ডও আজ রাষ্ট্র বলছে নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। তা হলে কীসের ভিত্তিতে এতদিন ভোট হয়েছে? যারা ভোট দিয়েছে, তারা কে? অবৈধ অনুপ্রবেশকারী? বিদেশি? না কি এই দেশেই জন্ম নেওয়া অথচ রাষ্ট্রের চোখে অধিকারহীন কয়েদি (Aadhaar & Voter ID)?
এই অসঙ্গতির পিছনে যে রাজনৈতিক চক্রান্ত কাজ করছে, তা বোঝার জন্য খুব গভীরে যেতে হয় না। বিগত কয়েক বছরে এনআরসি ও নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ নিয়ে দেশজুড়ে যে তীব্র বিতর্ক ও বিক্ষোভ হয়েছে, তা আমরা সবাই জানি। অসমে এনআরসি-র ফলাফলে দেখা গেল প্রায় ১৯ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছে। যাদের একটা বড় অংশ হিন্দু, এবং যাদের অধিকাংশের কাছেই আধার, ভোটার কার্ড, এমনকি রেশন কার্ড ছিল। তবু তারা ‘বিদেশি’। কেন? কারণ তাদের কাছে সেই তথাকথিত ‘মূল প্রমাণ’ নেই, যা নাগরিকত্বের শংসা দেবে। আর সেই মূল প্রমাণ কী, তা দিনের পর দিন বদলে যাচ্ছে।
এ রাজ্যেও সেই ভয়ানক অনিশ্চয়তার কালো ছায়া ঘনিয়ে আসছে। একদিকে ভোটার তালিকা ‘সংশোধন’-এর নামে এনআরসি-র ছায়া, অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায় ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর নাম থেকে বেছে বেছে বাদ পড়ার প্রবণতা। কিছুদিন আগেই সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টে একাধিক মামলা চলাকালীন জানা গেল, মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত বহু মানুষকে রাজ্যের নতুন ওবিসি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এই যুক্তিতে যে তারা নাকি যথাযথ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। অথচ একই প্রক্রিয়ায় অন্য জাতিগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে কোনও প্রশ্ন তোলা হয়নি (Aadhaar & Voter ID)।
নাগরিকত্ব এখানে শুধু কাগজ নয়, এক ক্ষমতাকেন্দ্রিক চর্চা। যার হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা, সে-ই নির্ধারণ করছে কারা ‘ভারতীয়’। আর এই নির্ধারণের যন্ত্র হয়ে উঠছে আধার, ভোটার, স্কুল সার্টিফিকেট, জমির দলিল, এমনকি জন্মের শংসাপত্র- যা না থাকলে আপনি বিদেশি! ভাবুন তো, এ দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ আছেন যাদের জন্ম কোনও হাসপাতালে হয়নি, কোনও স্কুলে পড়াশোনা হয়নি, জমি নেই, বাড়ি নেই। সেইসব দরিদ্র মানুষ, দলিত, আদিবাসী, সংখ্যালঘু— তারা কীভাবে নাগরিকত্বের প্রমাণ দেবে?
আরও বিস্ময়ের বিষয় হল, ভারত সরকারের নিজস্ব পোর্টাল ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথোরিটি অব ইন্ডিয়া বা আধার কর্তৃপক্ষ নিজেই বলেছে, ‘আধার হল পরিচয়ের প্রমাণ, নাগরিকত্বের নয়।’ কিন্তু যখন দরিদ্র মানুষ রেশন তুলতে গিয়ে আধার না থাকায় ফিরে আসে, তখন রাষ্ট্র কী বলে? তখন বলে- ‘তোমার আধার নেই, তুমি অবৈধ।’ সুতরাং রাষ্ট্র নিজের সুবিধা অনুযায়ী একেই কখনও করে অস্ত্র, আবার কখনও করে অপমান (Aadhaar & Voter ID)।
এই দ্বিচারিতা কেবল প্রশাসনিক নয়, সাংবিধানিক। কারণ আমাদের সংবিধান এই দেশের সব নাগরিককে সমান অধিকার দিয়েছে— জাতি, ধর্ম, ভাষা, লিঙ্গ, অর্থনৈতিক অবস্থা নির্বিশেষে। অথচ বাস্তবে রাষ্ট্র সেই অধিকার কেড়ে নিতে উঠে পড়ে লেগেছে। নাগরিকত্ব এখন আর জন্ম বা বসবাসের ভিত্তিতে নির্ধারিত হচ্ছে না, বরং নির্ধারিত হচ্ছে আপনি কোন ধর্মে বিশ্বাস করেন, আপনি কোন ভাষায় কথা বলেন, আপনার নাম কী- এইসব প্রশ্নে।
২০২৩ সালে দিল্লি হাইকোর্ট এক মামলায় রায় দিয়েছিল, আধার এবং ভোটার কার্ড ‘স্বতন্ত্র নাগরিকত্বের প্রমাণ’ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। আদালত বলেছিল, ‘এই নথিগুলি পরিচয় নির্ধারণে সহায়ক হলেও তা নাগরিকত্বের একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না।’ কিন্তু সেই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে- যে কোটি কোটি টাকা খরচ করে এইসব নথি তৈরি করা হল, প্রতিটি নাগরিককে বাধ্য করা হল- তার হিসেব কে দেবে? সেই টাকাটা কী নাগরিকদের ঠকিয়ে নেওয়া হল না?
এই প্রশ্ন আরও গভীর হয় যখন দেখা যায়, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আধার প্রকল্পে খরচ হয়েছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরেও ভোটার তালিকা, এনপিআর, সিভিল রেজিস্ট্রেশন, বিভিন্ন সরকারি যোজনা ইত্যাদি নিয়ে নথির পাহাড় বানানো হয়েছে। মানুষ কেবল ঘুরে বেড়াচ্ছে এক অফিস থেকে অন্য অফিস, অথচ তার পরিচয়ই প্রশ্নচিহ্নের মুখে!
এই প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, ‘নাগরিকত্ব’ এক রাজনৈতিক অস্ত্র। যা একদিকে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে, অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক শ্রেণিকে রক্ষা করে। শাসকের উদ্দেশ্য স্পষ্ট- মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করো, তাদের পরিচয় নিয়েই সন্দেহ তৈরি করো, যাতে তারা সবসময় মাথা নিচু করে রাষ্ট্রের দয়ায় বাঁচতে বাধ্য হয়।
আধার কার্ড, ভোটার কার্ডের অস্তিত্ব যদি মান্যতা না পায়, তা হলে তার অর্থ রাষ্ট্র নিজেই নিজের তৈরি নিয়ম-কানুনের বিরোধিতা করছে। রাষ্ট্রের এই আত্মবিরোধিতা আসলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এটি একদিক থেকে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার বহিঃপ্রকাশ, অন্যদিকে গণতন্ত্রকে ক্রমশ দুর্বল করার এক কৌশল। কারণ যার পরিচয় নেই, তার প্রতিবাদের অধিকারও নেই (Aadhaar & Voter ID)।
কিন্তু, এই নীরব অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা এখন সময়ের দাবি। মানুষের পরিচয় কেড়ে নিয়ে উন্নয়নের বুলি যে এক প্রতারণা, তা আজ স্পষ্ট। নাগরিকত্ব কোনও কাগজে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তা এক জীবন্ত চেতনা, যা জন্মের সঙ্গে, বেঁচে থাকার সংগ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। রাষ্ট্র যদি সেই চেতনা কেড়ে নিতে চায়, তা হলে মানুষের দায়িত্ব সেই রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করা- কেন?