চিত্র- সংগৃহীত
Bangla Jago Desk: রথের চাকার ঘর্ঘর ধ্বনি আর ‘জয় জগন্নাথ’ রবে মুখরিত চারদিক। প্রতি বছর আষাঢ়ের এই বিশেষ পুণ্য তিথিতে পুরীর রাজপথে আছড়ে পড়ে দেশ-বিদেশের লক্ষ লক্ষ ভক্তের আবেগ। মন্দিরের গর্ভগৃহের নিভৃত অন্ধকার ছেড়ে রাজপথে নেমে আসেন বিশ্বচরাচরের নাথ, জগন্নাথদেব। সনাতন ধর্মের প্রচলিত প্রথাকে ভেঙে দিয়ে স্বয়ং ভগবানই এদিন আসেন ভক্তের দ্বারে। কিন্তু এই মহামিলনের বিপুল আড়ম্বরের মাঝে আমরা কি সত্যিই রথযাত্রার গভীর আধ্যাত্মিক মর্মার্থ অনুধাবন করতে পারি?
সাধারণত মানুষ ঈশ্বরের খোঁজে মন্দিরে ছোটেন। কিন্তু রথযাত্রার মাহাত্ম্য এই চিরন্তন ধারাকে সম্পূর্ণ উলটে দেয়। এখানে জাতি, বর্ণ, ধর্ম কিংবা সামাজিক ভেদাভেদ মুছে যায় এক লহমায়। জগন্নাথদেব শ্রীমন্দির থেকে গুন্ডিচা বাটির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন সকলের জন্য নিজেকে উন্মুক্ত করে। এই যাত্রা প্রমাণ করে ঈশ্বরের পরম কৃপা কোনও গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, তা সর্বজনীন ও অপার।
গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের প্রখ্যাত আচার্যদের মতে, প্রকৃত দর্শন চোখের দেখা নয়। ‘আমি ঈশ্বরকে দেখেছি’, এই অহংকার ত্যাগ করাই আসল সাধনা। বরং পরমেশ্বরের কাছে ভক্তের বিনম্র প্রার্থনা হওয়া উচিত, তিনি যেন কৃপা করে ভক্তের দিকে তাকান। ভগবানের সেই করুণাময় দৃষ্টির স্পর্শেই মানুষের হৃদয়ে প্রকৃত ভক্তি ও নিঃস্বার্থ সেবার আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়।
ইতিহাসের পাতায় এই ঐশী কৃপার এক অবিস্মরণীয় ও রোমাঞ্চকর দৃষ্টান্ত মেলে। সালটা ছিল ১৮৭৪। পুরীর রথযাত্রার পুণ্যলগ্নে জগন্নাথদেবের রথের সামনে উপস্থিত করা হয়েছিল মাত্র কয়েক মাসের শিশু বিমল প্রসাদকে। ঠিক সেই মুহূর্তে সবাইকে স্তম্ভিত করে মহাপ্রভুর কণ্ঠের দিব্য পুষ্পমাল্য খসে পড়েছিল ওই শিশুর ওপর! এই ঘটনাকে ঈশ্বরের পরম আশীর্বাদ ও অলৌকিক স্বীকৃতি হিসেবেই গণ্য করা হয়েছিল। এই শিশুই পরবর্তীকালে বিশ্ববন্দিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব আচার্য শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর নামে পরিচিত হন, যিনি ইসকন (ISKCON) প্রতিষ্ঠাতা শ্রীল প্রভুপাদের দীক্ষাগুরু এবং যিনি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের অন্তরে কৃষ্ণভক্তির আলো জ্বেলেছিলেন।
বাস্তবিক অর্থে, রথযাত্রা কেবল বাইরের কোনও পথপরিক্রমা নয়, এটি মানুষের অন্তরের এক পরম তীর্থযাত্রা। রথের রশি টানার প্রকৃত অর্থ হলো নিজের ভেতরের অহংকার ও আমিত্বকে ত্যাগ করে বিনয়ে উন্নীত হওয়া। ধর্মের বাহ্যিক আচার ছেড়ে নিঃস্বার্থ মানবসেবায় আত্মনিয়োগ করাই এর আসল শিক্ষা। রথের গন্তব্য কেবল গুন্ডিচা মন্দিরেই শেষ হয় না, এর আসল গন্তব্য মানুষের অন্তরের মণিকোঠা। জগন্নাথদেবের সেই মায়াময় দৃষ্টি যখন মানুষের চিন্তা ও আচরণকে পবিত্র করে, তখনই এই উৎসবের প্রকৃত সার্থকতা প্রকাশ পায়।