Bangla Jago Desk,কাজল ব্যানার্জি: একটা সময় হাইস্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্ত্তির পরীক্ষার মাধ্যমে গুণমান বিচার করে শিক্ষার্থীদের ভর্ত্তি নেওয়ার প্রথা চালু ছিল। সেই সময় বেসরকারি স্কুলের এতটা রমরমাও ছিল না। ভালো মানের শিক্ষার্থীরা যথেষ্ট সংখ্যায় সরকারি বা সরকারি সাহায্য প্রাপ্ত স্কুলগুলিতেই লেখাপড়া করতো। ফলে ভালো ছাত্রছাত্রীদের ভর্ত্তি নেওয়ার বিষয়ে স্কুল গুলির মধ্যে বেশ প্রতিযোগিতা ছিল। প্রতিটি এলাকাতেই একাধিক স্কুলের মধ্যে যেখানে মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল ভালো হতো, সেইসব স্কুলে সন্তানকে ভর্ত্তির করার জন্য অভিভাবকরাও ব্যাকুল হতেন। সন্তান যাতে নামী স্কুলে ভর্ত্তির সুযোগ পায় তার জন্য অভিভাবকরা সন্তানকে স্পেশাল কোচিং-এও ভর্ত্তি করতেন। এলাকায় চলতো এই ধরণের নানা কোচিং সেন্টার। প্রকাশিত হতো একাধিক গাইড বুক।
এই ব্যবস্থার ফলে অভিভাবকদের চাহিদা অনুযায়ী ভালো ফলাফল সম্পন্ন স্কুলগুলিতে ভর্ত্তির পরীক্ষা দিয়ে সফল হওয়া ভালো মানের ছাত্রছাত্রীরাই সেখানে ভর্ত্তির সুযোগ পেত। ফলে আবারও সেই স্কুলগুলি থেকেই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল হতো প্রতিবছর। কারণ স্কুল ব্যবস্থায় যেখানে যেমন মানের ছাত্রছাত্রী ভর্ত্তি হবে সেখানে তেমনই ফলাফল হবে-এটাই স্বাভাবিক। তাই দু-একজন শিক্ষার্থীর ভালো ফলের সূত্র ধরে একটু সুনাম অর্জন করতে পারলেই পরবর্তী বছরগুলিতে সেই স্কুলে ভালো মানের শিক্ষার্থী ভর্ত্তির বিষয়ে আর চিন্তা করতে হতো না। স্কুলের দু-চার জনের ভালো ফলাফলকে সামনে রেখে ভর্ত্তির পরীক্ষার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রী বাছাই করে ভর্ত্তির প্রথার ফলেই কিন্ত স্কুলগুলির মেরুকরণ শুরু হয়। প্রতিটি এলাকাতেই স্কুলগুলিতে ‘নামী স্কুল’ ও ‘অনামী স্কুল’-এর তকমা লাগতে থাকে। এবং সেই পরম্পরায় ‘নামী স্কুল’ গুলি আরও নামি ও ‘অনামি স্কুল’ গুলি আরও অনামি হতে থাকে। একই এলাকায় চারটি স্কুল তাঁদের ফলাফল ও ভালো মানের শিক্ষার্থী ভর্ত্তির ভিত্তিতে এ, বি সি, ডি চারটি গ্রেডে ভাগ হয়ে যায়।
এরই মধ্যে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সরকারি ও সরকার পোষিত স্কুলগুলিতে ভর্ত্তির পরীক্ষা বন্ধের সরকারি নির্দেশ আসে। এলাকা ভিত্তিক এবং লটারির মাধ্যমে ভর্ত্তির প্রক্রিয়া চালু হয়। কিন্তু পুরনো সুনামের ফলে নামি স্কুলগুলিতেই মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা ভর্ত্তি হতে থাকে। পাশাপাশি স্থানীয় এলাকায় বসবাসের সুবিধা নিয়ে সবধরণের মানের ছাত্রছাত্রীরাই নামি স্কুলগুলিতেও প্রবেশাধিকার পেয়ে যায়। ফলে নামি স্কুলগুলিতে মেধাবী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা শতাংশের বিচারে কমে যেতে থাকে। শিক্ষার অধিকার আইন এবং সরকারী বিলিবন্টন নীতিতে স্কুল ব্যবস্থায় শিক্ষা বহিভূর্ত বহুবিধ বিষয় স্কুলশিক্ষাকে গ্রাস করে। মিড-ডে-মিল, জামা, জুতো, বইখাতা, ব্যাগ, শিক্ষার্থী, কন্যাশ্রী, ট্যাবের টাকা, সাইকেল প্রদান ইত্যাদি বিলিবন্টন মূলক কাজের মধ্যেই শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বেশি ব্যস্ত থাকার বাধ্যবাধকতা তৈরী হয়। আদালতের নির্দেশে উঠে যায় বিদ্যালয়ের অনুশাসন এবং শিক্ষার অধিকার আইনে সকলের অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত রাষ্ট্রের খরচে শিক্ষালাভকে নিশ্চিত করতে উঠে যায় ‘পাশফেল’ প্রথাও। ফলে সরকার পোষিত স্কুলগুলির লেখাপড়ার মান শিকেয় উঠতে থাকে।
এরই মধ্যে এই সবেরই রেশ ধরে আবার বেসরকারী স্কুলগুলিরও বেশ রমরমা ঘটতে শুরু করে। যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে ইংরাজি মাধ্যমে ভর্ত্তির প্রবনতাও অনেক মেধাবি শিক্ষার্থীদের বেসরকারি স্কুলে টেনে নিয়ে যেতে থাকে। এলাকায় জনঘনত্ব বাড়লেও জন্ম নিয়ন্ত্রণের কারণে পরিবার পিছু ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমতে থাকে পূর্বের তুলনায়। ফলে দুই পরস্পর বিপরীত প্রভাবে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা মোটামুটি একই থাকে বা অল্প বর্ধিত হয়। এমতাবস্থায় বেসরকারি স্কুলের থাবায় সরকার পোষিত স্কুলগুলির ছাত্রছাত্রী সংখ্যায় টান পড়া শুরু হয়। এলাকার ‘এ’ স্কুলে যাদের ভর্ত্তি হওয়ার কথা, তারা বেসরকারি স্কুল এক্স, ওয়াই, জেড-এ চলে যায়। ফলে ‘বি’ স্কুলে যাদের ভর্ত্তি হওয়ার রীতি ছিল, তারা এ-স্কুল ভর্ত্তি হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ লাভ করে এবং ভর্ত্তি হয়। একই ভাবে সি স্কুলে যাদের ভর্ত্তির কথা তারা বি স্কুলে এবং ডি-রা সি স্কুলে ভর্ত্তি হতে থাকে। এরই ফলে প্রথম পর্যায়ে ধুঁকতে থাকে ডি স্কুলগুলি। প্রথম ছেঁকাটা তাদেরই লাগে। কিন্তু এই সময় আসলে তাঁদের শিক্ষার্থীর পরিমান একই থাকলেও গুণমানের অবনমন ঘটে যায়। (কিন্তু এই সময় তাঁরা সংখ্যার গর্বে গর্বিত ছিল।) পরবর্তী ধাপে নামি স্কুলগুলির সর্বগ্রাসী মানসিকতার কারণে অপর্যাপ্ত ভর্ত্তি নেওয়ার কারণে বর্তমানে সি স্কুল গুলিও আর ভালো নেই। ইতিমধ্যে অনেক জায়গাতেই শিক্ষার্থীর অভাব উঠে গেছে ডি স্কুলগুলি। সি স্কুল গুলিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যার হ্রাসে আপাতত সেখান থেকে উদ্বৃত্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের তুলে নিয়ে অন্যত্র প্লেসমেন্ট দেওয়া চালু হয়েছে।
তাই স্বাভাবিক ভাবে এ স্কুলগুলিতে যাদের পড়ার কথা ছিল আজ তারা বেসরকারি স্কুলে। ফলে এ স্কুলগুলিতে শিক্ষার্থীর ‘সংখ্যা’ ঠিক থাকলেও মেধাবী শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। আর সর্বভারতীয় পাঠক্রমের সঙ্গে সঙ্গতি বিধানের কারণে রাজ্যে উচ্চমাধ্যমিকের বিজ্ঞান পাঠক্রম ও মাধ্যমিকের বিজ্ঞান পাঠক্রমের মধ্যে বড় ফারাক তৈরী হয়েছে। সাধারণ বিজ্ঞান পড়ুয়াদের জন্য রাজ্যের উচ্চমাধ্যমিকের বিজ্ঞান পাঠক্রম বেশ কঠিন। আবার সরকারী নীতির কারণে, মধ্যম মানের ছাত্রছাত্রীদের বিজ্ঞান পড়ার পর তেমন আলাদা কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় বিজ্ঞান পড়ার বিষয়ে ক্রমশ বিমুখ আজকের ছাত্রছাত্রীরা। বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ে আকাঙ্খিত মানের সম্মানজনক কোনো কর্মসংস্থান না হওয়ায় বিজ্ঞান পড়তে আকর্ষণ অনুভব করছে না পরবর্তী ছাত্রছাত্রীরা। আদালতে একাধিক মামলার কারণে রাজ্যে শিক্ষক নিয়োগ দীর্ঘদিন বন্ধ। আমাদের মত মধ্যম মানের বিজ্ঞান পড়ুয়াদের শিক্ষকতার চাকরি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। ফলে গ্র্যাজুয়েট হয়ে অন্যান্য পরীক্ষায় বসার জন্য বিজ্ঞান পড়ার চাপ আর কেউ নিতে চাইছে না। এর সঙ্গে করোনা অতিমারি যুক্ত হওয়ার ফলে পঠন পাঠনের সার্বিক ক্ষতির ফলেও অগ্রণী শিক্ষার্থীদের সব থেকে বেশি ক্ষতি হয়েছে। তারাও দু’বছর না পড়ে, না পরীক্ষা দিয়ে পরবর্তী শ্রেণিতে উন্নিত হওয়ার পর উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়ার সাহস দেখাচ্ছে না। তাই নিট ফল হল রাজ্যের সরকারী ও সরকার পোষিত স্কুলগুলিতে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ক্রমশ কমতে থাকছে বিজ্ঞান পড়ুয়ার সংখ্যা। এবং সাধারণ কলেজ গুলিতেও বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক স্তরে ভর্ত্তির জন্য পর্যাপ্ত পরিমানে বা পর্যাপ্ত গুণমানের শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছে না, যা রাজ্যের শিক্ষার প্রগতির ক্ষেত্রে একদমই ভালো লক্ষণ নয়।