চিত্রঃ নিজস্ব
সৌতিক চক্রবর্তী শান্তিনিকেতন, বীরভূম: থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুদের জন্য এক ঐতিহাসিক আশার আলো। সাধারণত যেখানে বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট করাতে খরচ পড়ে ৪০ থেকে ৪৫ লক্ষ টাকা, সেখানে সেই চিকিৎসাই এবার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়ার পথ খুলল শান্তিনিকেতনে। কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানি হাসপাতাল ও মেডিকেল রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং শান্তিনিকেতন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের যৌথ উদ্যোগে থ্যালাসেমিয়া চিকিৎসায় এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। রবিবার সকাল থেকেই শান্তিনিকেতন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল চত্বরে ভিড় জমাতে শুরু করেন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু ও তাঁদের অভিভাবকেরা। শুধু বীরভূম জেলা নয়—মালদা, মুর্শিদাবাদ, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, কলকাতা, নদীয়া, হাওড়া, হুগলি, দক্ষিণ ২৪ পরগণা এবং পার্শ্ববর্তী রাজ্য ত্রিপুরা থেকেও বহু রোগী ও তাঁদের পরিবার এদিন উপস্থিত হন।
এই বিশেষ শিবিরে উপস্থিত ছিলেন কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানি হাসপাতাল ও মেডিকেল রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগের প্রধান ডাঃ শান্তনু সেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সহযোগী চিকিৎসক ডাঃ মানম মেহেরা। শান্তিনিকেতন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডাঃ অশোক কুমার দত্ত-সহ বিশিষ্ট চিকিৎসকেরা। ডাঃ শান্তনু সেন জানান, থ্যালাসেমিয়া মেজর আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে i-BMT বা বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্টই একমাত্র স্থায়ী চিকিৎসা পদ্ধতি। এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রথম পর্যায়ে বিবাহযোগ্য বয়সের পুরুষ ও মহিলাদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে HPLC পরীক্ষা করা হবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে থ্যালাসেমিয়া মেজর আক্রান্ত শিশুদের জন্য HLA Typing এবং i-BMT-এর ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হবে। তিনি আরও জানান, এদিনের শিবির থেকেই প্রায় ৯০০টি স্যাম্পেল সংগ্রহ করা হয়েছে, যা একটি রেকর্ড। এই স্যাম্পেলগুলি জার্মানির একটি বিশেষজ্ঞ সংস্থার মাধ্যমে পরীক্ষা করা হবে। রিপোর্ট অনুযায়ী পরবর্তী চিকিৎসার সমস্ত ব্যবস্থাও বিনামূল্যেই করা হবে। গোটা প্রক্রিয়ায় রোগী ও তাঁদের পরিবারকে এক টাকাও খরচ করতে হবে না।
এছাড়াও শান্তিনিকেতন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পক্ষ থেকে ১৪ হাজার মানুষের HPLC টেস্ট বিনামূল্যে করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসক মহলের মতে, এই উদ্যোগ রাজ্যে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে বড়সড় ভূমিকা নেবে। শুধু চিকিৎসা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন করে তুলতেও উদ্যোগী হয়েছেন চিকিৎসকেরা। এদিন ডাঃ সেন শান্তিনিকেতন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এমবিবিএস ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে এক আলোচনা সভায় অংশ নেন এবং থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে সচেতনতার উপর বিশেষ জোর দেন। ডাঃ শান্তনু সেন জানান, আগামী দিনে কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানি হাসপাতাল ও মেডিকেল রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং শান্তিনিকেতন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল একযোগে কাজ করে এখানেই i-BMT বা বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট পরিষেবা চালু করতে আগ্রহী। যাতে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য আর দূরে কোথাও যেতে না হয়। এই বিষয়ে কলেজের সভাপতি মলয় পীট ও প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডাঃ অশোক কুমার দত্তের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি। শান্তিনিকেতন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সভাপতি মলয় পীট বলেন, “সরকার এবং কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানি হাসপাতাল ও মেডিকেল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় থ্যালাসেমিয়া সচেতনতা ও চিকিৎসায় আমরা একযোগে কাজ করতে চাই। এই উদ্যোগ আগামী প্রজন্মকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। সকলে সচেতন হলে থ্যালাসেমিয়া-মুক্ত ভারত গড়ে তোলা সম্ভব।”