চিত্র: সংগৃহীত
রাজু পারাল (বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক): সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ ধূমায়িত চা দেখলেই মন ভরে যায় আমাদের। বাঙালি মাত্রই চা পিয়াসী। বলা হয়, জলের পরেই বিশ্বের সর্বাধিক উপভোগ্য পানীয় ‘চা’। কারণ, চায়ের স্নিগ্ধ, প্রশান্তিদায়ক স্বাদ আমাদের সকলের কাছেই উপভোগ্য। কিন্তু কখনও আমরা ভেবে দেখেছি কি এই চায়ের উৎপত্তিস্থল কোথায় বা চায়ের আবিষ্কার কে করল? জানতে গেলে ফিরে যেতে হবে ৩০০০ বছরেরও আগের ইতিহাসে (Rabindranath-Vivekananda’s First Meeting)।
ইতিহাস বলছে, চিন দেশে নাকি প্রথম চা চাষের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। অনুমান করা হয় খ্রিস্টপূর্ব ২৭০০ শতাব্দীতে চিন সম্রাট সিন নুং-এর সময় চা-এর আবিষ্কার হয়। আবার কারও কারো মতে গৌতম বুদ্ধের জন্মের ১০০০ বছর পূর্বে চৈনিক সন্ন্যাসীরা ‘চা’ আবিষ্কার করেন। তাঁরা নাকি তপস্যা শেষে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত হয়ে চা গাছের পাতা সিদ্ধ করে তা পান করে শরীরের ক্লান্তি মেটাতেন। রাষ্ট্রসংঘের এক তথ্যে পাওয়া গেছে, বর্তমানে প্রায় হাজার মিলিয়নেরও বেশি মানুষ প্রত্যেহ কমপক্ষে দু’কাপ করে চা পান করে থাকেন।
ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে আমাদের দেশে চা গাছের চাষ শুরু হয়। ওই শতাব্দীর প্রথমার্ধে চিন ও জাপানের মধ্যে যুদ্ধ আরম্ভ হলে চিন দেশ থেকে ইউরোপীয়দের জন্য চা সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। তখন ইংরেজরা ভারতে চা চাষের জন্য ভাবনা চিন্তা শুরু করে। ১৮৩৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ভারতে চা চাষের জন্য জরিপের কাজ শুরু করেন। আর এই কাজে এগিয়ে এসেছিলেন স্যার উইলিয়াম গ্রিফিথ, ড. নাথানিয়েল ওয়ালিচ এবং ড.জন ম্যাকলিওল্যান্ডের মতো তাবড় তাবড় বিজ্ঞানী।
বেশ কয়েক বছর পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ১৮৪০ সাল নাগাদ চা চাষের কাজ শুরু হয়। প্রথমে উত্তর আসাম ও সিলেট অঞ্চলে, পরে ডুয়ার্স, তরাই ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে চা বাগান তৈরীর কাজ শুরু হয়। দক্ষিণ ভারত ও শ্রীলঙ্কায় চা চাষ শুরু হয় ১৮৭০ সালের শেষদিকে। ১৯২০ সালের মধ্যে ভারত পৃথিবীর সর্বোচ্চ চা উৎপাদক দেশে পরিণত হয়।
পানীয় হিসেবে চা আজ বিশ্বে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। ঊনবিংশ শতকের বিখ্যাত ইংরেজ কূটনীতিবিদ গ্ল্যাডস্টোন ছিলেন একজন প্রথম শ্রেণীর চা-রসিক। তিনি দিনে কম করে বিশ কাপ চা পান করতেন। ১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে এক চিনা অধ্যাপকের নামানুসারে ‘সুশিমো চা-চক্র’ নামে একটি চক্রের উদ্বোধন করেছিলেন। চা ছিল কবিগুরুর একটি প্রিয় পানীয় (Rabindranath-Vivekananda’s First Meeting)।
তিনি জাপানি চা ভীষণ পছন্দ করতেন। পছন্দ করতেন জাপানিদের চা পানের রীতি টিকেও। জোড়াসাঁকোর লালবাড়ি অর্থাৎ বিচিত্রা বাড়িতে যেমন বসত চায়ের আসর। তেমনি শান্তিনিকেতনের উত্তরায়ণে কবির কোনার্ক বাড়ির লাল বারান্দাটি ছিল চায়ের আসরের জন্য বিখ্যাত। চায়ের সঙ্গে আড্ডার একটা গভীর সংযোগ আছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের একবার মাত্র সাক্ষাৎ হয়েছিল ঐতিহাসিক এক চায়ের আড্ডার মাধ্যমেই। তথ্য বলে, সেই চায়ের আড্ডার আয়োজন করেছিলেন ভগিনী নিবেদিতা।
১৮৩৪ সালে লর্ড বেন্টিংক ভারতে চায়ের ব্যবসার অনুমোদন দিলে দ্বারকানাথ ঠাকুর চা ব্যবসা শুরু করেন। বাগিচা শিল্পের প্রযুক্তিকে তিনি যথেষ্ট আগ্রহের সঙ্গে স্বাগত জানান। তিনিই আসামের চা প্রথম কলকাতায় এনে ইংল্যান্ডে রফতানি করেছিলেন। যে বাড়ি থেকে চায়ের ব্যবসা চলে সে বাড়ির সদস্যরা চা-পানে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে তাতে আর আশ্চর্য কী । আমাদের রাজ্যের দার্জিলিং-এর চায়ের পাতা ও কুঁড়ি থেকে তৈরী হয় বিখ্যাত ‘গোল্ডেন টিপ’ ও ‘অরেঞ্জপেকো’ চা (Rabindranath-Vivekananda’s First Meeting)। দার্জিলিং চায়ে এক ধরনের মিষ্টি ফুলের সুগন্ধী স্বাদ পাওয়া যায় যা আসলে এক ধরনের তৈলাক্ত পদার্থের উপস্থিতির কারণে সম্ভব হয়। জুন জুলাই মাসে পরিষ্কার আকাশ ও ঠান্ডা আবহাওয়ায় দার্জিলিংয়ের চা বেশ সুগন্ধ ও উৎকৃষ্ট মানের হয়। এই প্রকারের চা বেশ চড়া দামে বিক্রি হয়।
সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা চায়ে ভিটামিন ‘পি’ নামের এক রাসায়নিক উপস্থিতির কথা জানান যা নাকি মানুষের শরীরে শিরা উপশিরায় রক্ত চলাচলে সাহায্য করে। চা কারখানায় প্রধানত দুই প্রকার চা বৃহৎ পরিমানে তৈরী হয় – সবুজ চা ও কালো চা। একই গাছের পাতা থেকে উভয় প্রকার চা তৈরী হয়। চিন ও জাপানে সবুজ চায়ের জনপ্রিয়তা সবচাইতে বেশি। অন্যান্য দেশে অবশ্য কালো চায়ের চাহিদাই বেশি।
চা গাছের বৈজ্ঞানিক নাম – ক্যামেলিয়া সিনেনসিস। এই নাম থেকেই চিন দেশের সাথে চায়ের উৎপত্তির যোগ সূত্রতা লক্ষ করা যায়। চায়ের ফুল দেখতে অনেকটা ক্যামেলিয়ার মতো, তবে তা ক্যামেলিয়ার মতো এতো বিচিত্র সুন্দর বর্ণের হয় না (Rabindranath-Vivekananda’s First Meeting)।
চা উৎপাদন, অনুমোদন, রফতানি এবং ভারতে চা অনুমোদনের সমস্ত দিক ভারতের চা পর্ষদ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। জনপ্রিয়তার কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর ২১ মে পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক চা দিবস’। পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার এবং উত্তরদিনাজপুর জেলায় চা বাগান ও চা চাষের যথেষ্ট অনুকূল পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়।