ad
ad

Breaking News

Murshidabad

‘জলসাঘর’ ও ‘দেবী’ সিনেমার শুটিং হয়েছিল মুর্শিদাবাদের এই দুই জমিদার বাড়িতে, জানুন অজানা ইতিহাস

ইটের গাঁথুনির উপরে কাঠের তৈরি কড়িরবর্গার ওপর চুনসুরকির ছাদ দেখে বুঝতে অসুবিধা হয়না ভবনটি কতদিনের পুরানো।

Murshidabad: Kanchnatala Zamindar House and Its Untold Legacy

চিত্র: সংগৃহীত

নৃপেন্দ্রনাথ বিশ্বাস: এককালে জ্ঞান ও গরিমায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মহান দেশ ছিল ভারতবর্ষ।বঙ্গদেশ তার অঙ্গরাজ্য। নবাবের দেশ মুর্শিদাবাদ রাজ্যের একটি জেলা। এই মুর্শিদাবাদ (Murshidabad) ছিল নবাবি আমলে বাংলা বিহার ও উড়িষ্যার রাজধানী। তাদের স্থাপত্যের নিদর্শন আজও বিশ্ববাসীকে আকৃষ্ট করে।

প্রচারের অভাব ও সরকারের সদিচ্ছার অভাবে মুর্শিদাবাদ (Murshidabad) জেলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা হিন্দুর কত দেব-দেবীর পবিত্র মন্দির ও তার মাহাত্ম্য লুকিয়ে রয়েছে তাঁরা জানেনা। জানার চেষ্টাও করেনা, সারা বাংলার জমিদারদের কত অপূর্ব কৃতিত্বের দৃষ্টান্ত রয়েছে এই জেলায়। আজ এমনি এক জমিদারবাড়ির কথা আমরা জানব, সেটি হল ধুলিয়ানের কাঞ্চনতলা জমিদারবাড়ি।

মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গিপুর মহকুমার শমসেরগঞ্জ থানার অন্তর্গত ধুলিয়ান। কাঞ্চনতলা শহর ধুলিয়ানের মধ্যবর্তী মনোমুগ্ধকর একটি স্থান।জেলার উত্তরের শেষ সীমান্ত, পদ্মা-ভাগীরথীর তীরে অবস্থিত। শমসেরগঞ্জের বহু জায়গা নদীভাঙনে গঙ্গাগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙন শামসেরগঞ্জের চিরসাথী। অত্যধিক ধূলিকণার প্রকোপ থাকায় সম্ভবত নামকরণ ধুলিয়ান হয়েছে। মুর্শিদাবাদ জেলার সদর শহর বহরমপুর থেকে ধুলিয়ানের দূরত্ব প্রায় ৮২ কিলোমিটার। নদীপথের সংযোগ থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামরিকশক্তির গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়েছিল ধুলিয়ান। গুপ্ত, সেন, মোগল, পাঠান, ইংরেজ ফরাসি সবার কাছেই শহরের গুরুত্ব অধিক ছিল।

এখান থেকেই নদীটির ভাগীরথী ও পদ্মা দুটি নামের উৎপত্তি। পদ্মার বিস্তার পূর্ববঙ্গে, অধুনা বাংলাদেশ। ভাগীরথী পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার মধ্য দিয়ে বয়ে চলে মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। ধুলিয়ানের নীচে গঙ্গা সমুদ্রের মত বিশাল চওড়া। ওপারে মালদা জেলা। নদীর ওপর দিয়ে বহমান শীতল বাতাস গায়ে লেগে শহরবাসীর প্রাণ জুড়ায়। দক্ষিণবঙ্গের মানুষদের ট্রেনে চেপে যেতে নামতে হয় ধুলিয়ান গঙ্গা স্টেশনে। স্টেশন থেকে টোটোয় চেপে স্বল্প সময়ে পৌঁছানো যায় ধুলিয়ানের কাঞ্চনতলার প্রাসাদসম জমিদারভবনের সামনে। ভবনটি নির্মাণ করেছিলেন জমিদার জগৎবন্ধু রায় (Murshidabad)।

তিনি ছিলেন পূর্ববঙ্গের ঢাকা জেলার মাণিকগঞ্জের অন্তর্গত মালুচি গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর মেশোমশাই রাঘবেন্দ্রনাথ রায়। তিনিও ঢাকা জেলার মাণিকগঞ্জের মানুষ। কোন এক সময়ে চলে আসেন গঙ্গার তীরবর্তী স্থান ধুলিয়ানে। এখানে তিনি একজন ধনী প্রতিষ্ঠিত কৃষিজীবী মানুষ হিসেবে খ্যাত হন। বিপুল অর্থ সঞ্চয় করে এখানে জমিদারি কেনেন।

স্থানটির বর্তমানে নাম দেওনাপুর। জমিদারির দেওয়ানদের বসবাসের জন্য তিনি এখেনে অনেকগুলি ঘর নির্মাণ করেন। বর্তমান আইনে জমিদারিপ্রথা বিলোপ হওয়ায় জমিদারি আর না থাকলেও ঘরগুলি রয়েছে। সম্ভবত দেওয়ানদের বসবাসের সুবাদে জায়গাটির নাম দেওনাপুর হয়েছে। রাঘবেন্দ্রনাথ রায়ের সন্তানাদি না জন্মানোয় শ্যালিকা পুত্র জগৎবন্ধু রায়কে দত্তক নেন। জগৎবন্ধু পাকুড়ের রাজবাড়িতে কর্ম করতেন (Murshidabad)।

একসময়ে বন্যা কবলিত ধুলিয়ানে নৌকা বিহারে গিয়ে কাঞ্চনগাছ বেষ্টিত কচ্ছপের পিঠের মত উঁচু মনোমুগ্ধকর অনেকটা জায়গা চোখে পড়ে। দেখেই তিনি মনস্থির করেন এখানেই স্থায়ী বাসভবন গড়বেন। ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ধুলিয়ানের কাঞ্চনতলায় তিনি এই প্রাসাদসম বাসভবনটি নির্মাণ করেন। বহু কাঞ্চনফুলের গাছ বেষ্টিত বিশাল স্থান বলে সম্ভবত জায়গাটির নামকরণ হয়েছে কাঞ্চনতলা। পরবর্তী সময়ে ১৮২৫ খ্রিষ্টাব্দে গঙ্গা ভাঙনের ফলে জগৎবন্ধু রায় মাণিকগঞ্জের মালুচি গ্রামের বাড়ি ছেড়ে এখানে চলে আসেন। এখানে এসে জমিদারি পরিচালনার সাথে জমিদারির পরিধি বাড়াতে থাকেন।

এখন জমিদার ভবনটি দুই শরিকের মালিকানা ভুক্ত। সামনের হলুদ রঙের ভবনটির দেওয়ালে বড়তরফ, অনুরূপ পিছনের ভবনে ছোটতরফ নেমপ্লেট রয়েছে। ভবনের মোট শরিক পাঁচজন। তাদের কেউ ছিলেন নিঃসন্তান, কেউ নিজের অংশ বেঁচে দিয়ে অন্যত্র স্থানান্তরিত হন। প্রায় ২০ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই বিশাল কারুকার্য বিশিষ্ট জমিদারভবনটি।

সামেনের বড় উঁচু গোল গোল থামগুলোর ও নীলটনের ওপরের ফুল ফল লতাপাতার নকশাকাটা কারুকার্য আজকের দিনে বিস্ময়কর। ইটের গাঁথুনির উপরে কাঠের তৈরি কড়িরবর্গার ওপর চুনসুরকির ছাদ দেখে বুঝতে অসুবিধা হয়না ভবনটি কতদিনের পুরানো। অন্দরমহলে প্রবেশ পথে রয়েছে আগের দিনের অন্যরকম নকশার কারুকার্যে নির্মিত বিশাল এক লোহার গেট। গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে চোখে পড়ে চারিদিকে বিশাল উঁচু রাজপ্রাসাদের মত দালানের মাঝে বড় এক দুর্গামন্দির। সামনে অনেকটা ফাঁকা জায়গা। বর্তমানের বড় ও ছোট তরফের উত্তরসুরি যথাক্রমে তমালকুমার রায় ও বাপীকুমার রায়ের যথোপযুক্ত ব্যবস্থায় ভবনটির প্রাচীন ঐতিহ্য আজও অক্ষুণ্ণ রয়েছে (Murshidabad)।

ভবনের সামনে সবুজ দূর্বাঘাসে আচ্ছাদিত বিশাল ফাঁকা জায়গায় প্রতিবছর ধূমধাম করে জগদ্ধাত্রী পুজো হতো। সপ্তাহ ব্যাপী মেলা বসতো। ভবন অভ্যন্তরের বিশাল দুর্গামন্দিরে, জৌলুসে ঘাটতি হলেও, ভবন নির্মাণের পর থেকে আজও প্রতিবছর ধূমধাম সহকারে দুর্গাপুজো হয়ে আসছে। এখানকার স্থায়ী পুরোহিত ও কেয়ারটেকার দিলীপ কুমার মিশ্র বলেন, মন্দিরের বাইশ পুতুলের দুর্গাপুজো হয়। দেবীর মাথার ওপর শোভমান শিব। তার ওপরে প্রবাহমান মা গঙ্গা। মায়ের বামে রয়েছেন বিজয়া।

নরসিংহ, শিবের ডানে ফিরিঙ্গি বামে নন্দী। ওপাশে সর্বোপরি রাম, লক্ষ্মণ, মকর বাহন, অপরদিকে বৃষবাহন। সঙ্গে অসুর, সিংহ, কার্তিক, গণেশ ও লক্ষ্মী-সরস্বতী। প্রাচীন প্রথা মেনে রথযাত্রার দিনে মন্দিরেই প্রতিবছর প্রতিমা গড়ার কাজের সূচনা হয়।বছরের দুটো উৎসবে সাধারণ মানুষদের জন্য জমিদার ভবনের দ্বার সর্বক্ষণ খোলা থাকে। অন্য সময়ে অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে বিশেষ অনুমতি লাগে। করোনা কোভিডের সময় বিশেষ সতর্কতায় নেট টাঙিয়ে পুজো সম্পন্ন হয়েছে। ভবন হতে বেরিয়ে সামান্য দূরে রয়েছে শোভমান একটি শিবমন্দির। শহরের ভেতরে কিছুটা দূরে সুন্দর মনোরম পরিবেশে হিন্দুমিলন মন্দির নামে আরও একটি মনোমুগ্ধকর মন্দির রয়েছে। মন্দিরের সামনে সবুজ পাতায় ঘেরা বড় বড় লম্বা সারিবদ্ধ অনেকগুলো পাঞ্চ, পাইন ও সুপারি বৃক্ষ রয়েছে (Murshidabad)।

মন্দিরের সামনে দুই ধারে, সিংহদুয়ার প্রহরারত দাঁড়িয়ে জয়-বিজয় বিগ্রহ মূর্তি। সদর রাস্তা হতে সমগ্র মন্দির প্রাঙ্গণ মার্বেল পাথরে মোড়া। অতি শোভনীয় এই মিলনমন্দিরে রয়েছেন লক্ষ্মী-নারায়ণ, গণেশ-কার্তিক, লক্ষ্মী-সরস্বতী, গজ্জননী দেবী জগদ্ধাত্রী, রাধামাধব ও জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলরাম।বিগ্রহমূর্তিগুলো পর পর সুন্দর করে সাজানো। যথারীতি প্রতিদিন পুজো অর্চনা হয়। ঝকঝকে সুন্দর মন্দিরের সামনে সবুজ বৃক্ষরাশির অতুলনীয় শোভা ধুলিয়ান-কাঞ্চনতলা শহরকে আরও মহিমান্বিত করেছে। সবই জমিদার রায় পরিবারের অবদান।

শেষ জমিদার জগৎবন্ধু রায় কাঞ্চনতলায় ভাগীরথীর পাড়ে, রাস্তার ধারে ১৮২৭ খ্রিষ্টাব্দে কাঞ্চনতলা জেডিজে ইন্সটিটিউশান (কাঞ্চনতলা জগৎবন্ধু ডাইমণ্ড জুবিলি ইন্সটিটুউশান) নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে এলাকার ছেলে মেয়েদের শিক্ষার পথ প্রশস্ত করে গেছেন। এমন অনেক জনহিত কল্যাণকর কাজ তিনি করে গেছেন। কাঞ্চনতলা জমিদার ভবনের সামনের প্রাকৃতিক পরিবেশের দৃশ্য অতি মনোরম। বিশ্বখ্যাত চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘জলসাঘর’ ও ‘দেবী’ ছায়াচিত্রের শুটিং নিমতিতার জমিদার ভবনে করলেও বেশ কয়েকটি দৃশ্যের শুটিং ধুলিয়ানের কাঞ্চনতলা জমিদারভবনে করেছেন।

রায় বংশের দুই উত্তরসুরি মাননীয় তমাল কুমার রায় ও মাননীয় বাপী রায় মহাশয়ের অতি আন্তরিক প্রচেষ্টায় ও পুরোহিত দিলিপ মিশ্র মহাশয়ের পূর্ণ সহযোগিতায় উপযুক্ত ব্যবস্থাপনায় সংরক্ষিত জমিদারভবনটির যৌবন আজও অটুট রয়েছে (Murshidabad)।