ad
ad

Breaking News

Chandannagar History

Chandannagar History: আলোর শহরের অজানা কথা, কবে স্বাধীন হল চন্দননগর? 

ইংরেজদের শংশ্রব থেকে শতযোজন দূরে। আধুনিকতায় চন্দননগর শিক্ষা সংস্কৃতিতে এক আলাদা স্থান অধিকার করেছে।

Chandannagar History: Little‑Known Journey into India

চিত্র: সংগৃহীত

বিকাশ ঘোষ: পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গা তীরবর্তী প্রাচীন শহর চন্দননগর (Chandannagar History)। এই চন্দননগরকে নিয়ে রয়েছে অনেক অজানায় ইতিহাস। তখন ভারতবর্ষ ইংরেজ শাসনাধীন। আর সেই ইংরেজ সাম্রাজ্যের মধ্যে চন্দননগর সমহিমায় উজ্জ্বল নিজস্বতায়। সম্পূর্ণ ভিন্ন শাসন, আলাদা পরিচালনা। ইংরেজদের শংশ্রব থেকে শতযোজন দূরে। আধুনিকতায় চন্দননগর শিক্ষা সংস্কৃতিতে এক আলাদা স্থান অধিকার করেছে। সেখানে নেই ইংরেজদের জুলুম, নেই ইংরেজদের হুকুমবাজি।

চন্দননগরের রাজধানী (Chandannagar History) তখন পন্ডিচেরি। আর শাসন পরিচালনা করছে ফরাসিরা। বঙ্গদেশের বুকে এক টুকরো ফরাসি উপনিবেশ। তবে এই উপনিবেশকে নিজেদের করায়াত্ব করার কম চেষ্টা করেনি ইংরেজরা। আক্রমণে ফরাসিদের এই স্বপ্নের শহরকে লন্ডভন্ড করে দিয়েছিল। তবে আবার মাথা তুলে দাঁড়ায় চন্দননগর। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে ইংরেজদের হাত থেকে। তখনও ভারতের মধ্যে বাংলার বুকে চন্দননগর স্বাধীন সত্তা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। চন্দননগর তখনও একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন দেশের অংশ। চন্দননগরবাসী সিদ্ধান্ত নেবেন তারা স্বাধীন থাকবেন না ভারতের অন্তর্ভুক্ত হবেন?

ফরাসি শাসকরা গণভোটের আয়োজন করে। সেই গণভোটে ভারত অন্তর্ভুক্তির পক্ষে ভোট দেন চন্দননগরের জনগণ। ১৯৫০ সালের ২ মে চন্দননগর ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলেও তখনও পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত ছিলনা চন্দননগর। সম্পূর্ণ স্বাধীন শহর হিসাবে চন্দননগরের পরিচিতি ছিল। এ শহরটি পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয় আরও কয়েক বছর পর।

কবে থেকে চন্দননগর (Chandannagar History) ফরাসিদের হাতে এল? সে ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় সেই মোগল যুগ থেকেই চন্দননগরে ফরাসিদের আধিপত্য কায়েম হয়। মুঘলদের হাত থেকে চন্দননগরের বেশ কিছু এলাকা কিনে নিয়েছিল ফরাসিরা। পরবর্তীতে সেই সীমানা তারা আরও বাড়িয়ে নেয়। ইংরেজদের সঙ্গে এই নিয়ে মাঝেমধ্যেই টক্কর বাঁধতো ফরাসিদের। সেই লড়াইয়ের মাঝেও নিজেদের অস্তিত্ব হাত ছাড়া হয়নি ফরাসিদের। ভারতবর্ষের মধ্যে ফরাসীদের অধ্যুষিত যে সমস্ত জায়গা গুলি ছিল, তার মধ্যে অন্যতম একটি ফরাসি উপনিবেশ ছিল হুগলির চন্দননগর।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ইংরেজদের হাত থেকে স্বাধীনতা লাভ করে ভারত। তবে চন্দননগরের অবস্থান কি হবে তখনও তা স্পষ্ট হয়নি। ফরাসি শাসকরা চন্দননগরের মানুষের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার ছেড়ে দেন। সেইমতো গণভোটের বন্দোবস্ত করেন তৎকালীন ফরাসি সরকার। ১৯৪৯ সালে ১৯ জুন শহরের মানুষদের একটি গণভোট বা রেফারেনড্রামের আয়োজন করা হয়েছিল। তৎকালীন চন্দননগরের ৯৭ শতাংশ মানুষ ভোটদানে অংশগ্রহণ করেন। অধিকাংশ মানুষ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পক্ষে ভোট দেন। ভারতের একটি স্বাধীন শহর হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে চন্দননগর।

১৯৫১ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি প্যারিসে ভারত ও ফ্রান্সের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার মাধ্যমে চন্দননগরের ফরাসি শাসন সমাপ্ত হয় এবং শহরটিকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ১৯৫৪ সালে চন্দননগর পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়। হুগলি জেলার একটি শহর হিসেবে আত্মপরিচয় ঘটে চন্দননগরের। এই চন্দননগর ফরাসিদের উপনিবেশ থাকলেও ইংরেজদের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বহু বিপ্লবী এই চন্দননগর থেকেই নেতৃত্বে উঠে এসেছিলেন।

স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে চন্দননগরের (Chandannagar History) সঙ্গে। স্বাধীনতার সংগ্রামীদের আত্মগোপনের অন্যতম আশ্রয়স্থল ছিল চন্দননগর। আলিপুর বোমার মামলায় অভিযুক্ত হয়ে অরবিন্দ ঘোষ ও অন্যান্য বিপ্লবী এখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের বিপ্লবীরা, বিপ্লবী গনেশ ঘোষ, অনন্ত সিংহ, শহিদ জীবন ঘোষালরাও এখানে আত্মগোপন করে ছিলেন। বিপ্লবীদের আত্মগোপন করার অন্যতম কারণ ছিল পুলিশি হয়রানি থেকে অনেকটা রেহায় মেলা। কারণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বাইরের একটি শহরে ইংরেজ পুলিশ ইচ্ছে করলেই ঢুকতে পারত না।

ফরাসি উপনিবেশ, তাই ব্রিটিশ পুলিশকে অনুমতি নিয়ে এখানে ঢুকতে হতো। সেই সুযোগে বিপ্লবীরা পালানোর সুযোগ পেতেন, ইংরেজ বিরোধী লড়াইকে শক্তিশালী করার সুযোগ পেতেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম যোদ্ধা শহিদ কানাইলাল বসুর শৈশব কেটেছে চন্দননগর শহরে। এই বীর বিপ্লবীর ভিটে, নামাঙ্কিত একটি বিদ্যালয় ও ক্রীড়াঙ্গন এই শহরে রয়েছে। বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর পৈতৃক ভিটেও এই শহরে। চন্দননগরের ফটোকগোড়া এলাকায় এই বীর বিপ্লবীর পৈতৃক ভিটে রয়েছে।

হুগলী নদীর তীরে গড়ে ওঠা চন্দননগর শহরের (Chandannagar History) স্ট্র্যান্ড আজো ফরাসী স্থাপত্যের বার্তা বহন করে। এছাড়াও শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ফরাসি স্থাপত্য। অসাধারণ শিল্প কারুকার্যে গড়ে তোলা চার্চসহ আরও নানা নিদর্শন ফরাসি উপনিবেশের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।