চিত্রঃ নিজস্ব
বিশ্বদীপ নন্দী, বালুরঘাট: আজ মঙ্গলবার ১৬ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনেই ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধের পরাজয় স্বীকার করে আত্মসমর্পণ করেছিল পাকিস্তান সেনা। সেই ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়েই জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান অনস্বীকার্য, তেমনই ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল অপরিসীম।সময়ের সঙ্গে ইতিহাসের স্মৃতি অনেকের মন থেকেই মুছে যেতে বসেছে। আজকের বাংলাদেশের একাংশ মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের আত্মবলিদান কিংবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান ভুলে ধীরে ধীরে পাকিস্তানপন্থী মনোভাবের দিকে ঝুঁকছে—এমন অভিযোগও উঠছে। সম্প্রতি হাসিনা সরকার পতনের সময় বঙ্গবন্ধুর মূর্তি ভাঙচুর থেকে শুরু করে পোস্টার ছেঁড়ার ঘটনায় সেই প্রবণতারই প্রকাশ দেখা গিয়েছে।
তবে সীমান্ত লাগোয়া ভারতের মানুষ, বিশেষ করে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বাসিন্দারা আজও ভোলেননি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনার বর্বরতা কিংবা ভারতীয় সেনার বীরত্ব।বালুরঘাট শহরের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্যাঙ্ক আজও সেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। একাত্তরের ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধের স্মারক হিসেবে এই ট্যাঙ্ক বহন করে চলেছে ভারতীয় সেনার সৌর্য ও গরিমার কথা। যুদ্ধের সময় বালুরঘাট ও আশপাশের এলাকার মানুষ নানাভাবে ভারতীয় সেনাকে সাহায্য করেছিলেন। সেই যুদ্ধে এই অঞ্চলের মেজর জেনারেল ছিলেন লেফটেন্যান্ট লাছমান সিং লাহেল। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় তিনি ছিলেন বিশেষভাবে সন্তুষ্ট।যুদ্ধজয়ের পর এবং স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরে এই এলাকা ছাড়ার সময় পাকিস্তানি সেনার কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া একটি ট্যাঙ্ক উপহার হিসেবে বালুরঘাটবাসীর হাতে তুলে দেন লেফটেন্যান্ট লাহেল। গর্বের সঙ্গে সেই ট্যাঙ্কটি শহরের প্রবেশপথে স্থাপন করেন স্থানীয় মানুষ। ধীরে ধীরে সেই জায়গাই পরিচিতি পায় ‘ট্যাঙ্ক মোড়’ নামে। পরবর্তীকালে বালুরঘাট পৌরসভার উদ্যোগে এলাকাটি আরও সাজিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে ‘৭১ স্মারক উদ্যান’ হিসেবে।
এই প্রসঙ্গে বালুরঘাটের বিশিষ্ট সাংবাদিক শঙ্কর দাস জানান, “ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নিয়ে যে গর্ব আমরা অনুভব করি, তার অন্যতম কারণ একাত্তরের ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধ। সেই যুদ্ধেই ভারতীয় সেনা পাকিস্তানকে পরাভূত করে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন বাংলাদেশে রূপান্তরিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। হিলি ব্যাটেলে লেফটেন্যান্ট লাছমান সিং লাহেলের নেতৃত্বে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাস্ত করা হয়।”তিনি আরও বলেন, “এই ট্যাঙ্ক শুধু শত্রুপক্ষের একটি যুদ্ধযান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতীয় সেনার বীরত্ব, আত্মত্যাগ ও গৌরবের ইতিহাস। ট্যাঙ্কটির দিকে তাকালেই আমরা আজও গর্বে গরিমান্বিত হই।”একাত্তরের স্মৃতি বয়ে নিয়ে আজও ট্যাঙ্ক মোড় দাঁড়িয়ে আছে—ইতিহাস মনে করিয়ে দিতে, আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানাতে স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য।